২০১৭ সাল হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে দৃপ্তিময়

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ৩১, ২০১৬

ফারুক আহমাদ আরিফ-
বাংলাদেশ। সন্তান জন্মের সাথে যেমন মায়ের নাড়ি জড়িত তেমনি বাংলাদেশটির জন্মের সাথেও শিক্ষার্থীদের রক্ত জড়িত। কিন্তু যুগে যুগে শিক্ষার্থীরাই নির্যাতিত, নিষ্পেশিত, অধিকার বঞ্চিত।

প্রতিটিকালেই শিক্ষার্থীদের মেধা, প্রেম, শ্রম, ঘামের বিনিময়ে রাষ্ট্রক্ষমতার পট-পরিবর্তিত হয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে জড়িত করে ফেলেছে নিজেদের সব চিন্তা-ভাবনাকে। কিন্তু কখনো নিজে ক্ষমতা হাতে তুলে নেননি। দিয়েছেন রাষ্ট্রনায়কদের হাতে।

অধিকার আদায়ে নিজেদের প্রাণ দিতেও কখনো পিছপা হয়নি তারা। মানুষের ওপর অবিচার কখনই মেনে নেয়নি। বাবা-মার সাথে সন্তানের, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের, বোনের সাথে বোনের যুক্তিতর্ক এমনকি বিরুদ্ধাচরণও হয়েছে। প্রশাসন লোভের সাগরে ডুবাতে চেয়েছে। শক্তিপ্রয়োগে দমাতে চেয়েছে। উল্টো নিজেরাই দমে গেছে শিক্ষার্থীরা আপোষ করেনি। উন্নত মম শির রেখেছে।

আজ শিক্ষার্থী সমাজ দলীয় দৃষ্টিকোণে শৃঙ্খলিত। দলের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি-সাহস কোনটিই নেই। ইতিহাস-ঐতিহ্য সব হারাতে বসেছে। যদিও কিছু কিছু শিক্ষার্থী নিজেদের মেধাকে বিক্রি করছে না। বিবেককে ক্রীতদাস বানাচ্ছে না। তবে নীরবতার সাগরে ডুবে আছে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী। তারা হ্যাঁ বা না কোন দিকেই নেই। এই শ্রেণিটি সমাজের জন্যে, দেশের জন্যে, প্রতিষ্ঠানের জন্যে সবচেয়ে বিপদজনক। কারণ তারা ঝোপ বোঝে কোপ মারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা স্বার্থের পথে পা বাড়ায়। ন্যায়-অন্যায় বাছ-বিচার তারা কখনো করে না।

যেখানে নিজের স্বার্থ আছে সেটি আপন ভাইয়ের জীবন কেড়ে হলেও নিজের ঝুলিতে ভরতে কার্পণ্য করে না। বন্ধুর বুকে ছুরি মারা, ঢুস মেরে নাক ফাঁটানো থেকে শুরু করে যাবতীয় অসৎপথে সেটি পেতে মরিয়া হয়ে যান।

বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে নেতৃত্বশূন্যতা সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা যায়। প্রভাতের সূর্য দিয়েই দিনের শুরু হলেও ছাত্রদের দিন শুরু হচ্ছে নেতৃত্বহীনতায়। ১৯৯০ এর জুনের পর থেকে বাংলাদেশের কোন বিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নেই। অথচ এই ছাত্র সংসদই এনে দিয়েছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা, ৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে বিজয়, ৬২ শিক্ষা আন্দোলনের বিজয়, ৭৯ এর গণঅভুত্থান, ৭০ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা। স্বাধীন বাংলাদেশ। নতুন পতাকা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই ২৬ বছর যাবত। একটি দেশের বিনিময়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, বিনিময়ে ৩টি দেশের জন্ম দিয়েছে শিক্ষার্থীরাই।

আজ ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কথা বলার মানুষ খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মাইক্রোস্কোপ দিয়ে। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকার নিয়ে সকলের মুখে কুলুপ। যারাই সামান্য স্বরে কিছুটা কথা বলতে চায় তাদেরও আছে রাজনৈতিক চরিতার্থ করার অপকৌশল। নিজের দলভারী করার অপচেষ্টা। নতুন অভিশাপ তৈরি হয়েছে ‘জঙ্গিবাদ’ নামে। প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও দেশকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ধর্মকে কলুষিত করছে।

দল-মত নির্বিশেষে শুধু শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে কমতে তলানিতে পড়ে গেছে। স্বার্থের জালে আটকে গেছে তারা।

একটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রথম সমস্যাটি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের আবাসন। সেই আবাসনের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী কষ্টে দিনানিপাত করলেও তাদের সমস্যা সমাধানে কেউ এগিয়ে আসছে না। ফ্লোর, বারান্দায় বিছানা পেতে বা বসে রাত কাটাতে হয় অনেককে। অথচ অছাত্র বা ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সেসব ছাত্রাবাসের আবাসনগুলো দখল করে রেখেছে বছরের পর বছর। কেউ কেউ প্রতিষ্ঠানটি থেকে পড়ালেখা শেষ করলেও সেই রুমটি ছাড়ছেন না। নিজের দখলে রেখে চাকরি করছেন সেখানে থেকেই। এদিকে আবু বকর, হাফিজদের মত শিক্ষার্থীদের প্রাণ যাচ্ছে অসুস্থ বা গুলি খেয়ে।

ক্লাস রুমের স্বল্পতা, চাহিদামতো যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব। শিক্ষা সামগ্রী তথা বইপত্র, খাতা-কলম, ইন্টারনেট, কম্পিউটারসহ যাবতীয় সামগ্রী চলে যাচ্ছে হাতের নাগালে। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোন সমন্বিত সিলেবাস। যে যেভাবে পারছে সেভাবেই সিলেবাস তৈরি করছে। বইপত্রের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। শিক্ষকরা নিজেদের মেধা দিয়ে বই লেখা বা অনুবাদ করার চেয়ে এনজিওতে খ্যাপ মারতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, মারছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে নখ-দন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। নিজে না পারে কিছু বলতে, না পারে কোন ধরনের উন্নত প্রকল্প হাতে নিতে। খয়ের খা হয়ে জী হুজুর জী হুজুর করতে করতে দিন পার করছে। এই দায়-দায়িত্বহীন ইউজিসি না পারবে নিজের সম্মান ধরে রাখতে, না পারবে শিক্ষাখাতে কোন অবদান রাখতে।

শিক্ষার্থীরা মধ্যসাগরে ডুবে হাবুডুবু খাচ্ছে। তাদের হাত ধরে নৌকায় তোলার কেউ নেই। অসহায় হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি বাড়ছে বন্যার পানির মতো। সেই ফি অনুযায়ী ৩০ শতাংশ অধিকারও তারা পাচ্ছে কিনা সন্দেহ আছে। শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো শিক্ষকমণ্ডলী নিহায়েত কম। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে? দেশের জন্যে তারা কীভাবে গড়ে উঠবে? জাতির উন্নয়নে তারা কি অবদান রাখবে?

জাতির ভবিষ্যৎ তৈরি হয় ক্লাস রুমে অথচ এখন ক্লাস রুম শিক্ষার্থীদের জন্যে বেদনার স্থানে পরিণত হচ্ছে। কোন কোন শিক্ষকের পক্ষপাত দুষ্ট আচরণ, নাম্বার দেয়ায় কারো কারো জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে এখনই রুখে দাঁড়ানোর সময়। মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করার সময় ‘২০১৭ সাল হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে দৃপ্তিময়’ বছর। সকল প্রকার লোভ-লালসা, অসত্য আর অন্যায়ের মস্তক ছিন্ন করে সুন্দর বাংলাদেশ নির্মাণ। সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: শিক্ষার্থী- জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

মুখপাত্র: নো ভ্যাট অন এডুকেশন

৩১ ডিসেম্বর-২০১৬, রাত: ১১টা, ধানমন্ডি ৮/ডি, ঢাকা-১২০৫

কমেন্টস