চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১০ অস্ত্র কিনতে ১০ কোটি টাকার দুর্নীতি

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৬

বিডিমর্নিং ডেস্ক-
চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লাস্থ জেনারেল হাসপাতালের এমএসআর (ভারী যন্ত্রপাতি) ১০টি অস্ত্র কিনতে প্রায় ১০ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন হাসপাতালটির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জন ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী।

তিনি হাসপাতালের জন্য দুটি লটে ২টি পালস মনিটর, ২টি পালস অক্সিমিটার, ৩টি কালার ডপলার, একটি অ্যানেসথেসিয়া মেশিন ও দুটি এয়ারকুলার ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার যন্ত্রপাতির স্থলে কেনা হয়েছে ১২ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। এর মাধ্যমে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেশি ব্যয় দেখিয়ছেন।

চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লাস্থ জেনারেল হাসপাতালের এমএসআর (ভারী যন্ত্রপাতি) ক্রয়ে অনিয়মের তদন্তে বিষয়টি শনাক্ত করেছেন তদন্ত কমিটি। এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল্‌স-২০০৮ এবং বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) লঙ্ঘন ও অথরাইজড ডিলার কর্তৃক মালামাল সরবরাহ না করাসহ সার্বিক ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও দশটি যন্ত্র কিনতে অন্তত ১০ কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে হাসপাতালটির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ও সিভিল সার্জন ডা. সরফরাজ খান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। আর এ তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নিতে/অধিকতর তদন্তের স্বার্থে দুদকে মামলা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় তদন্তের জন্য অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল পরিচালনা কমিটি।

বুধবার দুপুরে জেনারেল হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশকালে এসব তথ্য জানানো হয়। এ সময় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর হাতে তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় কমিটির সদস্য সচিব ও সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী এবং কমিটির সদস্য বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

তদন্ত কমিটির আহবায়ক জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন প্রতিবেদককে বলেন, আমরা দীর্ঘ ৫ মাস এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন হাসপাতাল পরিচালনা কমিটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চাহিদা, পিপিআর-২০০৮ অনুসরণ কিংবা অসদুপায় অবলম্বন (ফ্রডুলেন্ট প্র্যাকটিস) করা হয়েছে কিনা এসব বিষয় যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরি করেছি। এখন তদন্ত কমিটির মতামতের ৬ টি সারাংশ হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেবে। এদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) লিখিতভাবে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কোতোয়ালী আসনের সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু।

অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সরফরাজ খান বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে জানাতে চাই সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রয়বিধি ও নীতিমালা মেনে এবং জনস্বার্থে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এখানে কোন ধরনের অনিয়ম করা হয়নি। আর তদন্ত হবে ভাল কথা কিন্তু তদন্তকালে কমিটির সদস্যরা আমার সাথে কোন ধরণের যোগাযোগ করেননি। আমাকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

ডা. সরফরাজ খান বলেন, সবচেয়ে অবাক করার বিষয় যিনি দীর্ঘ দেড় বছর পরে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, তিনিই আবার তদন্ত কমিটির সদস্য হন কেমনে? আর এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বিভিন্ন হাসপাতালের বিভাগের অনেকে ছিলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট করে আমার বিরুদ্ধে কেন অভিযোগ আনা হল? বিষয়টি খুব পরিষ্কার।

তিন পৃষ্ঠার এই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কোনো বাজেট বরাদ্দ ছাড়াই ক্রয় সংক্রান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি এমআরআই (বিটিআই-.০৩৫, এমআরআই সিস্টেম) ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। কিন্তু ওই মেশিনের ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (বিএএসডিএ অব চায়না) দাম চেয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে এএসএল থেকে কেনা কালার ডপলার চারটি, হিটাচি কালার ডপলার ২ডি অলোকা (মডেল এফ-৩১) জাপান প্রতিটি ৬৫ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে। কিন্তু ম্যানুফেকচারিং প্রতিষ্ঠানের দেশি এজেন্টের কাছ থেকে প্রাপ্ত কোটেশনে ওই আইটেমের প্রতিটির মূল্য ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী প্রকিউরিং এনটাইটি (পিই) এর প্রধান ছিলেন। একই ব্যক্তি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) এবং টেকনিক্যাল সাব কমিটির (টিএসসি) সভাপতি ছিলেন। যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০০৮ দ্বারা অসমর্থিত এবং প্রতারণার (উমণরডধশণ/এরটলঢলফণর্ভ রেটর্ডধডণ) পর্যায়ভুক্ত। ২০১৪ সালের ২৫ মে টিএসসির সভায় চার সদস্যের কমিটির মধ্যে কেবল সভাপতি ডা. সরফরাজের সই ছিল।

এছাড়া ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল সিএসসি/হিসাব/২০১৪-২০১৫/১০৭৭৪/১ নম্বর স্মারকে ঢাকার মিরপুরের মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজকে আটটি আইসিইউ ভেন্টিলেটর, আটটি আইসিইউ বেড ও একটি কার্ডিয়াক পেসেন্ট মনিটর চাহিদা বহির্ভূতভাবে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কার্যাদেশ দিয়েছেন। অফিসের মেমো রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, উক্ত স্মারক নম্বরটি চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন অফিস থেকে জারি করা হয়নি। তবে ১০৭৭৪ (৬) স্মারকমূলে মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজকে অন্য ১০টি আইটেম সরবরাহের জন্যে ২ কোটি ৯৮ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কার্যাদেশ নম্বর ১০৭৭৪ (৬) মূলে মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ থেকে সিসিইউ এবং অপারেশন থিয়েটারের যে ১০টি আইটেমের যন্ত্রপাতি কেনা হয় তার একটিও দাখিলকৃত টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশান, ক্যাটালগ, কান্ট্রি অব অরজিন বা গুণগতমান অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়নি।

সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বিএমএ সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান, প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুরশিদ আরা বেগম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার মো. সাহাব উদ্দিন, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী, কাউন্সিলর জহর লাল হাজারী, আনজুমান আরা বেগম, নারীনেত্রী জেসমিন সুলতানা পারু, হাসপাতালের মেট্রন নীলিমা ধর, মোহাম্মদ শাহজাহান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

 

Advertisement

কমেন্টস