ভারতের ‘দলিতেরা: অতীত থেকে বর্তমান

প্রকাশঃ জুলাই ২, ২০১৮

সোহানুজ্জামান-

‘দলিত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দলন করা হয়েছে এমন দমিত, উৎপীড়িত শাসিত ইত্যাদি। কিন্তু উপমহাদেশে দলিত শব্দটি প্রচলিত আছে, দু’টি দেশের সামাজকাঠামোর মধ্যে ভারত ও নেপালে। অর্থাৎ, এ দু’টি দেশের সমাজে সমাজ-বিভাজনের মধ্যে দলিত শব্দটি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ দলিত বলতে ভারত ও নেপালে নিপীড়িত, অচ্ছুৎ সম্প্রদায়কেই বুঝিয়ে থাকে। ভারতে প্রায় ৪৫ লাখ দলিত রয়েছে। এরা সাধারণত মুচি, ঝাড়–দার, মেথর, কামার, দরজি কসাই ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত। ভারত ও নেপালে দু’টি দেশেই দলিতদের প্রতি উচ্চবর্ণের মানুষের ব্যবহার অত্যন্ত নৃশংস।

দলিতরা কোনো উচ্চবর্ণের মানুষের গৃহে ঢুকতে পারে না, তাদেরকে কেউ ঘর ভাড়া দেয় না। তারা পানির উৎসে যেতে পারে না! ছোঁয়াছুঁয়ির তো প্রশ্নই ওঠে না। এই দুই দেশের জনগণের গড় আয়ু থেকে দলিতদের গড় আয়ু প্রায় দশ বছর কম! ১৯৯৭ সালের এক সেন্সাসে জানা গেছে ভারতের প্রায় ২২ লাখ দলিত নারীর মধ্যে মাত্র ২০-২৫ জনের কলেজ ডিগ্রি আছে! এবং একই সাথে অন্যান্য সকল ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে দলিতরা বঞ্চিত। এটা বলছি ভারতের মতো একটি লিবারেল দেশ, যা কেবল নামেই, কাজের বেলায় নয়, সেই দেশে নিম্ম-বর্গের মানুষ তথা দলিতদের অবস্থান নির্দেশ করার জন্য। উভয় দেশেই বিভিন্ন সময়ে দলিতরা তাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, করছে। এবং বারবারই তারা নানাভাবে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকে নি। আর নেপালের চেয়ে ভারতে দলিতদের আন্দোলনের ইতিহাস বৃহৎ, নানাদিক থেকে।

স্বাধীনতার পর থেকেই নানাভাবে ভারত এগিয়ে গেলেও পিছিয়ে রয়েছে দলিতরা। ভারত ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলা-ধুলা, রাজনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সিনেমায় যে অগ্রগতি সাধন করেছে তা ঈর্ষণীয়! কিন্তু সেই ব্রিটিশ আমল থেকে ভারতে দলিতরা যেমন ছিল তেমনই আছে আর্থ-সামাজিক-রাজনীতিক দিক থেকে, কিন্তু এটা কখনই কাম্য ছিল না। সামরিক খাতে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে ভারত, কিন্তু দলিতদের পেছনে তার একশ ভাগের একভাগও ব্যয় করা হয় না। কিন্তু যে দেশের সংবিধানে দেশের সকল নাগরিকদের জন্য সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে, সেখানে দলিতরা প্রায় সকল মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকে অমানবোচিতভাবে জীবনযাপন করে। কিন্তুভারতের সংবিধান অনুসারে তাদের অধিকার ছিল মৌলিক অধিকারেই মানোবচিতভাবে জীবনযাপন করার।কিন্তু কেন তারা মানবোচিতভাবে জীবনযাপন করতে পারে না? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া অ্যাবসার্ডিটি। কারণ, জানা উত্তর কি খুঁজলে মিলে!

এ বছর ২০ মার্চ ১৯৮৩ সালের তপশিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার বিরোধী) আইনে হঠাৎ করেই কিছু সংশোধন করে বসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এমনআদেশের পর সমগ্র ভারতের দলিত সম্প্রদায় খেপে উঠেছে, তারা বনধ্রে ডাক দিয়েছে সমগ্র ভারতে। আন্দোলন হয়ে পড়েছে সহিংস, সহিংসতার ফলে মৃত্যু হয়েছে অন্তত দশজনের। ধ্বংস হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি। স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়ে পড়েছে। কিন্তু একটি আদালতের রায় নিয়ে কেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে সমগ্র দলিত সম্প্রদায়, প্রশ্ন আসতেই পারে।

১৯৮৩ সালের আইন অনুসারে দলিতদের উপর যে কোনো অত্যাচারের অভিযোগ এলেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা বাধ্যতামূলক ছিল।এই অভিযোগের আগাম জামিন দেওয়ার বিধান ছিল না। কিন্তু নতুন আইনের মাধ্যমে সেটা আর সম্ভব হবে না। কারণ, নতুন নিয়ম অনুসারে, অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথেই কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না, এর আগে পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করাতে হবে। তা ছাড়া কোনো সরকারি কর্মীকে গ্রেপ্তার করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর নিয়োগ কর্তার অনুমতি নিতে হবে।ফলে ভারতের দলিত সম্প্রদায় এই আইনের মাধ্যমে আরো কোণঠাসা হয়ে পড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাথে আরো বলতে হবে যে, এই আইনের মাধ্যমে দলিত শ্রেণি উপনীত হবে নিজেদের অস্তিত্বের চরম সংকটে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, যে দেশের সংবিধান বলছে দেশের সকল নাগরিক সমান অধিকার পাবে, আদৌ তা পায় না, সেখানে দলিতরা নানাভাবে শোষণের শিকার হচ্ছে। আর এই নতুন আইন দলিতদের শোষণের মাত্রা বহগুণ বাড়িয়ে তুলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভারতের রাজনীতির সাথে দলিতদের শোষণ-নির্যাতনের সম্পর্ক কোথায়? ভারতের মোট জনসংখ্যার তুলনায় দলিতদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। সারা ভারতে দলিতদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশও নয়।ফলে ভোটের রাজনীতিতে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে, অন্যতম ভারত। যে সংখ্যক দলিত ভারতে আছে তারা নরেন্দ্র মোদিকে ভোট না দিলেও মোদির কিছু যায় আসে না। কিন্তু যারা দলিতদের বিপক্ষে, ১৯৮৩ সালের দলিত আইনের বিরুদ্ধে তাদের ভোট মোদির খুবই জরুরী, ক্ষমতা দখলের জন্য।

পূর্বে দলিতদের জন্য যে ধরনের আইন ছিল, সেই আইনে অনেক উচু বর্ণের হিন্দুও ফেঁসেছে বহুবার। তাই তারা সহ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিও চাচ্ছে দলিত আইন বদলাক। আরমোদি যেহেতু ক্ষমতায় আসবে এই শ্রেণির উপর নির্ভর করেই, তাই শুনে ও মেনে চলছে এদের কথা।সুপ্রিম কোর্ট আইন বদলালো, বিপক্ষে গিয়ে দলিতরা আন্দোলন করে যদি সে আইন বদলাতে বলে তাতে মোদি সরকার কোনো কানই দিবে না, সমর্থন দিবে না। ফলে ভোটের রাজনীতির দিক থেকে দলিতরা সমর্থন পাচ্ছে না ক্ষমতাসীন দলের। এমনকীকারো কোনো ধরনের সহানুভূতির ব্যাপারও আমরা দেখছি না দলিতদের প্রতি!

এরকম একটি আন্দোলন নিয়ে মিডিয়া সরব থাকবে এটাই স্বাভাবিক। হলুদ সাংবাদিকতার বদৌলতে কয়েকটি ভুল এবং অসত্য সংবাদও প্রচারিত হবে মিডিয়াতে এমনটাই হয়েছে ভারতীয় মিডিয়াতে, দলিতদেরনিয়ে সংবাদ প্রচারের সময়। কিন্তু এটাও ভারতের কেন্দ্র সরকার ভাল চোখে দেখে নি। ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি সোমবার এক নির্দেশ জারি করেছেন। তিনি বলেছেন ‘ভুয়া খবর’ লিখলে এবং তা প্রচারিত হলে সাংবাদিকদের সরকারি স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়া হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাথে সাথে আন্দোলনে নেমেছে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন। এবং চাপের মুখে কেন্দ্র সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে জারি করা নির্দেশ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু যে বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নির্দেশ জারি হল সে বিষয় নিয়ে সরকার এখনো নিশ্চুপ কী করতে চাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দলিতদের নিয়ে? বুঝে উঠতে মনে হয় আরো একটু সময় লাগবে। কিন্তু সরকার ইচ্ছা করলে অবশ্যই এই সমস্যার সহজ সমাধান হবে, কিন্তু কেন হচ্ছে না এটিই বড় প্রশ্ন। তবে এটা যে রাজনীতির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য পাওয়ার’ গ্রন্থ থেকে একটি উক্তি দিয়ে বোঝানো যেতে পারে ভারতের রাজনীতিতে কিভাবে নগ্ন ক্ষমতার বিষয়টি জেঁকে বসেছে। রাসেল বলছেন, “নগ্ন ক্ষমতার সংজ্ঞাটি মনস্তাত্তি¡ক। কোনো দেশের সরকার তার কিছুসংখ্যক প্রজার নিকট নগ্ন, কিন্তু অন্যদের কাছে নগ্ন নয়।” যে কিছু সংখ্যক প্রজাকে রাসেল চিহ্নিত করেছেন ভারতে দলিতরাই মূলত তারা। এবং দলিতদের সাথেই সেই নগ্ন ক্ষমতার চর্চা করছে ভারতের ক্ষমতার অধিকর্তারা, যা আসলেই ঘৃণ্যকর, বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই আলোচনা আরেকটু দীর্ঘ করা যাক। শুরুর দিকে ‘প্রজাপীড়ক’ বলতে শাসকদের মধ্যে কোনো খারাপ গুণাবলির সমাহার  বুঝাতো না। এটি কেবল শাসকদের ক্ষমতার আরোহণের আইনসঙ্গত বা প্রচলিত স্বত্ব না থাকার বিষয়টিকেই নির্দেশ করত। ইতিহাসের শুরুতে উৎপীড়ক শাসকদের অনেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রজার সমর্থন নিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে রাজ্য শাসন করেছে। কেবল অভিজাতগনই ছিল তাদের নির্দয় প্রতিপক্ষ।

কিন্তু বর্তমানে সেই অভিজাত শ্রেণিই আর্থিক ক্ষমতাকাঠামোর নিয়ন্তা হয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। আর ভারতের দলিতদের নির্যাতন-শোষণের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে এই উচ্চবিত্ত ও মধ্যবর্তী শ্রেণি। দলিতদের বিরুদ্ধে যে আইন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করেছে তার পেছনের অনুঘটক হয়েছে একটি শ্রেণি। আর ভোটের রাজনীতিতে মোদি তাঁরসহায়ক এই শ্রেণির বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্তই নিবেন না, হলফ করে বলা যায়।এতো কথা বলার কারণ এই যে নতুন আইন বাতিল করা এবং পুরোনো আইন বলবৎ রাখার ব্যাপারে অনেকেই প্রধান মনে করেন মোদিকে তাদের বুঝতে হবে মোদিও চেয়ে আরো একটি শ্রেণি ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে বেশি প্রভাবশালী। কিন্তু মোদির কি উচিৎ হচ্ছে একটি লিবারেল দেশে নগ্ন ক্ষমতার অপব্যবহার করা? মোটেও না।

তাই ভারতের কেন্দ্র সরকারের উচিৎ রাজ্য সরকারগুলোকে সাথে নিয়ে দলিতদের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন ব্যবস্থা করা। সরকারের উচিৎ লিবারেল হিসেবে পরিচিত ভারতে অন্যান্য নাগরিকরা যে সকল মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থেকে, দলিতদের জন্যও তার ব্যবস্থা করা। দলিতরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময় নির্যাতনের শিকার হয়। হুট করে পরিবর্তন কখনই ভাল ফল বয়ে আনে না, ইতিহাস তেমনটাই সাক্ষ্য দেয়। ফলে ১৯৮৩ সালের ‘দলিত আইন’ বর্তমানে বলবৎ রাখায় উচিৎ, ভবিষ্যতে দলিতদের অবস্থা বিবেচনা করে পরিবর্তন করা যেতে পারে। এবং এর ফলে একটি সামগ্রিক উন্নয়নের দিকেই যাবে ভারত, সাম্প্রদায়িকতা বা অন্তর্দ্ব›দ্ব বাদ দিয়েই।‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-এই বিষয়ও মনে রাখা  উচিৎ ভারতকে, সামগ্রিক উন্নয়ন সাধনে, সাম্প্রদায়িকতার দ্বন্দ্ব এড়াতে। জয় হোক মানবতার, জয় হোক দলিতদের।

কমেন্টস