শিক্ষার বয়সে ভিক্ষা!

প্রকাশঃ জুন ২০, ২০১৮

ফয়সাল হাবিব সানি।।

শিশুটির বয়স ছয়-সাত বছর হবে হয়তো। এই বয়সের একজন শিশুর যখন ব্যাগ কাঁধে স্কুলে যাবার কথা, তখন শিশুটির কাঁধে ভিক্ষার ভার! উদয়াস্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে শিশুটি! `স্যার, টাহা দিন’ বলে হাত বাড়িয়ে করুণ চোখে শিশুটির চেয়ে থাকা দেখে বড্ড মায়া হলো।

শিশুটির সাথে পরিচয় `কুষ্টিয়া রেণউইক বাধ’- এর কোনো এক শান্ত অপরাহ্নে। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায় এসেছি সপ্তাহ খানিক হলো। তার মধ্যেই `কুষ্টিয়া রেণউইক বাধ’- এর স্নিগ্ধ এক গোধূলিতে দেখা মিললো শিশুটির। খালি গায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে সে মায়া মাখানো নীরব চোখে দৃষ্টিপাত করে তার ডান হাত বাড়িয়ে দিলো অামার দিকে। শিশুটি হাত বাড়িয়ে দিতেই অামি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, `কি করো তুমি?’ শিশুটি উত্তর দিলো, `ভিক্ষা করি’। অামি বললাম, `বাবা, মা কি করেন?’ বললো, `বাপ নাই, মা অহনও বাইঁচ্যা অাছেন।’ শিশুটির খোলা শরীরে দৃষ্টিপাত করতেই দেখলাম, তার পিঠজুড়ে অাগুনের অসংখ্য দগদগে পোড়া দাগ! অামি বললাম, `তোমার পিঠে ওই দাগগুলো কিসের? কি হয়েছে?’ সে বলে উঠলো, `অাগুনে পুইড়্যা গিছে, স্যার!’ অামার মনে হলো, কেউ হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই শিশুটির পিঠে জোর করে অাগুনের ছেঁকা দিয়ে দিয়েছে!’ যাই হোক, পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে সেই শিশুটির হাতে দিলাম। শিশুটি মহানন্দে একফালি মিষ্টি হাসি ছড়ালো তার মুখাবয়ব থেকে। মনে হলো যেন অপরাহ্নের রাঙা অাবিরে অারও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে সেই হাসি। কিন্তু বুঝতে পারলাম, তাদের জীবনে কেবল অপরাহ্ন অাসে সন্ধ্যার অাবছা অন্ধকারে বিলীন হবার জন্য! অার গহীন তমসাচ্ছন্ন নিশীথ তাদের কাছে অাজন্ম সহোদরের মতোই! তারা যেন কেবল অপরাহ্ন দেখতে দেখতে বেড়ে ওঠে! প্রভাতের রক্তিম অালো দেখাবার অাগেই পরিসমাপ্তি ঘটে তাদের `জীবন’ নামক অধ্যায়ের! ধূসর গোধূলিতেই ঢাকা পড়ে যায় তাদের জীবনের শত-সহস্র গল্পের খাতা! তাই ভেবে অামার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো! শিশুটি চলে যেতেই পেছন ফিরে ডেকে বললাম, `শোনো, এইখানে এসো।’ তারপর অামার সামনে এসে দাঁড়াতেই তার একটি ছবি তুলে রাখলাম। হয়তো ছবি হয়েই বেঁচে থাকে তারা বাস্তবের অবাস্তব ফ্রেমে! হয়তো জীবন সংগ্রামে হেরে গিয়ে তারা অাজ ছবির মতোই নিষ্প্রাণ, নির্জীব ও নির্বাক!

এবার নিজের থমকে যাওয়া বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম, `শিক্ষার বয়সে ভিক্ষুক এ সকল শিশুর দায়ভার নেবে কে? কি দোষ করেছিলো তারা? যখন তারই বয়সের অন্যান্য শিশুরা বাবা-মায়ের অাদরে-অাহ্লাদে টইটুম্বুর, বাবা-মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসার চোখের মণি- তখন জারজ সন্তানের পরিচয়েই বেড়ে উঠতে হয় বঞ্চিত, অবহেলিত ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লাথি খেয়ে বেড়ে ওঠা লাঞ্চিত এই সকল শিশুর।’ তারা তাদের বাবা-মায়ের পরিচয় পর্যন্তও দিতে পারে না। সত্যিই তো, কি পরিচয়ে বেড়ে উঠছে তারা? তাদের পরিচয় কি তবে, তারা জারজ সন্তান? অবৈধ সন্তান? সমাজের চোখে এই ঘৃণ্য অভিশাপ ও শত জুলুম, অবিচার সহ্য করেই কুকুরের মতো একদিন ঠিকই বড়ো হয়ে ওঠে তারা। অার কুকুরের মতো বেড়ে ওঠা এই সকল শিশু বড়ো হয়ে কুকুরের মতোই কামড়িয়ে গিলে খেতে চায় পুরো সমাজটাকে! দেশটাকে! এর বেশি কি-ই বা অাশা করা যেতে পারে তাদের কাছ থেকে! কিন্তু অাজকের এই শিশুদের মধ্যেই লুকিয়ে ছিলো অপার সম্ভাবনা। সমাজ তাদের সেই সম্ভাবনা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, নিয়তি তাদের নিয়ে খেলা করেছে শুধু! `শিক্ষার বয়সে ভিক্ষা’ মানুষ থেকে একদিন নিশ্চয়ই অমানুষ করে তুলবে তাদের; হয়তো ভিক্ষার মতো ছোট কাজ থেকেই একদিন তারা মানুষের প্রাণ ফেরি করে বেড়াবে… এরাই হয়ে উঠবে একসময়ের নামকরা কোনো সন্ত্রাসী! গডফাদার! শিশুদের অধিকারের বিষয়ে অামাদের সকলেরই এগিয়ে অাসা অতীব জরুরি; কেননা, একটি শিশুর মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভবিষ্যতের `সোনার বাংলাদেশ’ নামের কাঙ্খিত শব্দটি।

কমেন্টস