লজ্জার অহংকার

প্রকাশঃ এপ্রিল ৮, ২০১৮

বঙ্গবন্ধু এক সময় ক্রোধে বলেছিলেন সবাই পায় সোনার খনি আমি পেয়েছি চোরের খনি। বর্তমানে আমরা সেই চোর থেকে পদোন্নতি পেয়ে ডাকাতে স্থান নিয়েছি। তাই ত্রাণের কম্বল ছেড়ে এবার ব্যাংক লুটপাট করে সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়ে নিজেকে জ্যাক প্যারর বলে ঘোষণা দিচ্ছি। সমুদ্রের রাজা আমি আমায় ধরবে কে ! আমি মহান নেতার মত দুঃখ ভরাক্রান্ত মনে বলতে চাই লজ্জা লজ্জা লজ্জা ।

এ জাতির মধ্যে কিছু নোংরামী ও অসভ্য বৃদ্ধি পেলেও তার গঠনের পিছনে যে অহংকার করার মত ইতিহাস রয়েছে তা বিশ্ববাসী জানে এবং  শ্রদ্ধাও করেন বটে। এখন বুঝি অহংকারের সাথে লজ্জা শব্দটি যোগ করতে হয়। যেমন ভাষা আন্দোলনের অহংকার, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পাওয়ার অহংকার, স্বাধীনতা অর্জনের অহংকার, ৭ মার্চের ভাষণের মতো অহংকার, সবুজ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার অহংকার তার সাথে যোগ করা হোক  লজ্জার অহংকার ।

প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই চোখে এসে পরে সড়ক দুর্ঘটনা, রাস্তার পাশে পরে থাকে রক্তমাখা লাশ। কারো  হাত নেই কারো দু পা নেই কারো বা মাথার খুলি নেই। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে দিন দুপুরে কোন শিক্ষার্থীর ছেঁড়া হাত দুই বাসের মধ্যে আটকে থাকে। কবিতা পড়েছি আসাদের লাল শার্ট এখন কি বলবো রাজীবের ছেড়া হাত ! অনেকে হয়তো বলবে এসব খবর দেখে দেখে আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে কিন্তু তার সাথে অর্জন করেছি দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় স্থান তাও আবার খারাপ রাস্তা কাঠামোতে। ভাগ্যিস দ্বিতীয় নয়তো উদযাপন করতে অনেক টাকা খর্চা করতে হতো!

আব্দুল হাই তার বিলেতে সাড়ে  সাতশ দিন বইয়ে বিলেতের অভিজ্ঞতা ভাগ করেছিলেন।  তিনি একটা কথা খুব শক্ত করে বলেছিলেন জাতি কত ভদ্র হতে পারে তা এখানে না এলে বোঝা যাবেনা। তার বই থেকে একটি  অভিজ্ঞতা ভাগ করতে চাই। একবার তিনি ছুটির দিনে তার বিলেতি সহপাঠীর বাড়ি বেড়তে গেছেন। তিনি দেখেন তার রুমে একটি রেডিও খুব কম শব্দে বাজছে শুধু সেই কক্ষেই শোনা যায় এমন। তিনি তার সহপাঠিকে জিজ্ঞেস করেন রেডিও এত আস্তে বাজছে যে? উত্তরে তার বন্ধু বললেন আমাকে কেউ রিকোয়েস্ট করেনি ভলিউম বাড়িয়ে  দিতে এখন আমি উচ্চস্বরে শুনলে অন্যদের সমস্যা হতে পারে। লেখক উত্তরে লজ্জা পেয়েছিলেন। ঘটনাটি ১৯৫০ সালের দিকের আমারা ২০১৮ তে এসেও পাড়া প্রতিবেশীকে জনান দেই আমার বাড়িতে এই যন্ত্রটি কেনা হয়েছে। আবার নতুন করে যানবাহনে যোগ হয়েছে হাইড্রলিক হর্ন।

সব শব্দ শিল্পীরা যেন বসেই থাকে বাজাবার জন্য। প্রতিবেশীর বাড়িতে বাজা শব্দ বিরক্তি ভাবে নিলেও রাস্তায় কিন্তু শান্ত ভাবেই নিতে হয় বিষাক্ত বীণের সুর।

এবার আলোচনা করা যাক একটু নদী নালা বন জঙ্গল নিয়ে, গাছ কাটা আর নদী ভরাটে আমরা ওস্তাদ এ কাজে যতো আইনি বিধান থাকুক না কেন নিজের কিছু বিধান দিয়ে তা চালিয়ে নেয়া যায়। আবার একপক্ষে বলে এসব করলে পরিবেশের বিপর্যয় হবে দূষিত হবে কিন্তু যারা কাজগুলো করে তারা অনেক সৃজনশীল। তারা চিন্তা করেই নিয়েছে যে যদি নাই থাকে নদী বন তবে কিসের পরিবেশ দূষণ। ব্যাপারট এমন যে আমি বাঘের মহল্লায় যেয়ে যদি বলি বাঘ আমার মহল্লায় চলে এসেছে, আপনি বলেন আমরা কোথায় যাচ্ছি ?

কোথাও যাওয়ার জায়গা না হলে একটা পুরস্কার পাওয়ার জায়গাতো আছে। সমাজে শুরু হয়েছে পুরুস্কার পাওয়ার মেলা তাতে সাংবাদিক আর বুদ্ধিজীবীদের মাঠ ভালোই চলছে। তারা এখন রাষ্ট্রের মন্ত্রীদের সঙ্গে চেয়ার ভাগাভাগী  করে বসে দিবারাত্রি স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে কেউ বলে ফেলে আমারা এ দেশ থেকে শিক্ষা রপ্তানি করবো। খুব সুন্দর কথা, দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ী গুলো রাস্তার উল্টো পথে যাওয়ার শিক্ষা অর্জন করে, পাবলিক পরীক্ষার ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা দেয়ার শিক্ষা যে কোন পথে রপ্তানি হবে তা অবশ্য ভেবে দেখার বিষয়।

এবার যদি নিজেরদের নিরাপত্তার বিষয়ে ভাবি তাতেও সমস্যা। জনবহুল এদেশে নিরাপত্তা কর্মীদের এই কাজটি করা সত্যি অনেক কঠিন  হয়ে পড়েছে মেনে নিলাম তাদের একজন কর্মী আমাদের এগারশ  জনকে সামলাতে হয়। কিন্তু তাদের একজন কর্মী যদি ১১০০ জনকে (কথার কথা ) হয়রানি করিয়ে নেয় তা সত্যি লজ্জাজনক।

স্টিফেন হকিংস বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে সতর্ক থাকতে তা নাহলে আমারা এক সময় এসবের মাসল গুণতে হবে।  বর্তমানে আমাদের পোশাক ধারি রোবট গুলোকে যদি নিয়ন্ত্রণ না করি তাহলে সত্যি অনেক মাসুল আমাদের গুনতে হবে।

ব্যাংক কেলেংকারি, বেপরোয়া সন্ত্রাস, শব্দসন্ত্রাস, যৌনসন্ত্রাস, জোরদারী , দখলদার, অন্যায়-অবিচার এসব শব্দের সাথে আমরা প্রতিদিন এতোটা পরিচিত হচ্ছি যে আমাদের মধ্যে থেকে লজ্জাবোধের মনুষ্যত্বটুকুও  হারিয়ে যাচ্ছে।

বাঙালী লেখক শওকত ওসমান বলেছিলেন যে শূন্যগর্ভে দাড়িয়ে উজ্জল অতীতের অহংকার করে সে নিঃসন্দেহে নির্বোধ।

মেহেদী হাসান উদয়

কমেন্টস