‘আমি সেক্স চাই’

প্রকাশঃ মার্চ ২৯, ২০১৮

তসলিমা নাসরিন।।

বেলজিয়ামে ধর্ষিতা মেয়েদের পোশাকের প্রদর্শনী হয়েছে। ধর্ষণের সময় যে পোশাক তারা পরেছিল, সেই পোশাকগুলো টাঙানো ছিল দেয়ালে। একেবারেই সাধারণ পোশাক। সাধারণ শার্ট প্যান্টস, সাধারণ জামা পাজামা, সাধারণ স্কার্ট টপ। যেসব পোশাক পরে মেয়েরা ইস্কুল কলেজে যায়, দোকান পাটে, অফিস আদালতে যায়, রাস্তা ঘাটে বেরোয়, ক্যাফে রেস্তোরাঁয় বসে। মেয়েদের পোশাক যে দায়ী নয় ধর্ষণের জন্য, তা ধর্ষণের কারণ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন, তাঁরা বহু বছর যাবৎ বলছেন। যারা শুনতে চায় না, বা মানতে চায় না, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েইছে যে তারা শুনবে না, বা মানবে না।

তারা বেশ দেখছে যে ৪ বছরের শিশু ধর্ষিতা হচ্ছে, দেখছে আপাদমস্তক শরীর ঢেকে রাখা মেয়েরাও হচ্ছে ধর্ষিতা। এ থেকেও কি স্পষ্ট নয় যে পোশাকের কারণে কেউ ধর্ষিতা হয় না? পুরুষ ধর্ষণ করে, কারণ পুরুষ মনে করে মেয়েদের ধর্ষণ করা এমন কোনও অন্যায় নয়। পুরুষ চিরকাল তাদের ধর্ষণ করে আসছে। পুরুষেরা শক্তিমান, পুরুষেরা মহান, পুরুষেরা পরিবারের-সমাজের কর্তা। পুরুষের চাহিদা বেশি, চাহিদা মেটানোর দায় তো মেয়েমানুষকেই নিতে হবে। পুরুষ বিশ্বাস করে, মেয়েরা যৌন বস্তু ছাড়া কিছু নয়, পুরুষকে যৌনানন্দ দিতেই মেয়ে মানুষের জন্ম। তা ছাড়া মেয়েরা অবলা, শক্তিহীনা, মেয়েদের ঘটে বুদ্ধি কম, মেয়েরা ভীতু, পরনির্ভর। এই মেয়েদের আবার ইচ্ছে অনিচ্ছে কী! পুরুষের ইচ্ছেই তাদের ইচ্ছে। এই ধারণা পুরুষের ভেতরে একা একা গজায়নি। পুরুষকে জন্মের পর এই ধারণা দিয়েছে তার পরিবার, তার সমাজ, তার ধর্ম, তার রাষ্ট্র। রাষ্ট্র আইন করেছে, যে আইনে উত্তরাধিকার থেকে মেয়েরা বঞ্চিত হয়, যে আইনে না বিবাহে, না তালাকে সমানাধিকার পায় মেয়েরা। সমাজ চলে পুরুষতান্ত্রিক নিয়মে, যে নিয়মে পুরুষ কর্তা, মেয়েরা পুরুষের দাসি।

ধর্ম শিখিয়েছে পুরুষের অধিকার মেয়েদের অধিকারের চেয়ে বেশি। শিখিয়েছে পুরুষ ইচ্ছে করলে অবাধ্য মেয়েদের মারতেও পারে। পুরুষেরা অবাধ্য হলে কি মেয়েদের অধিকার দেওয়া হয়েছে পুরুষকে মারার? অবশ্যই দেওয়া হয়নি। এসবই পুরুষকে শেখায় মেয়েদের হেয় করতে, অবজ্ঞা করতে, অবহেলা করতে, হেনস্থা করতে, নির্যাতন করতে, ঘৃণা করতে, ধর্ষণ করতে। ছোটবেলা থেকে মেয়েরা পুরুষের এই দুনিয়াকে চিনে যায়। যখন আমার বয়স বারো তেরো, মা বলেছিলেন, এখন থেকে আর হাফপ্যান্ট পরা চলবে না, পাজামা পরতে হবে। বয়স যখন পনেরো ষোলো, মা বলেছিলেন, এখন থেকে ওড়না পরতে হবে। বলেছিলেন, একা একা রাস্তায় বেরোনো নিষেধ। মা কিন্তু আমার ভাইদের ওসব বলেননি।

তখন থেকেই মা কি আমাকে বুঝিয়ে দেননি, তুমি মেয়ে, তোমার শরীরে খুঁত আছে, শরীরে তোমার সমস্যা আছে, ঝামেলা আছে, গণ্ডগোল আছে। এই শরীরে তোমার যা খুশি পোশাক পরলে চলবে না, এই শরীরে এই সমাজ যা বলে তা পরতে হবে। ওই অল্প বয়সেই মেয়েদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় মেয়েদের শরীরে গণ্ডগোল আছে। মেয়েদের চুল থেকে শুরু করে পায়ের নখ অবধি থিকথিক করছে লজ্জা। শরীর নিয়ে লজ্জা পেতে হবে মেয়েদের। শরীর নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কথা পুরুষদের কেউ বলে না। পুরুষেরা এই ধারণা নিয়েই বড় হয় যে তাদের শরীর ঠিক থাকলেও, মেয়েদের শরীর ঠিক নয়। তারা শরীর নিয়ে লজ্জা না পেলেও মেয়েরা যেন শরীর নিয়ে লজ্জা পায়, ভয় পায়। একটি মেয়ে যখন নিজের শরীরের কারণে লজ্জা, শরম, ভয়, ভীতি নিয়ে বড় হয়ে ওঠে, এ কি কোনও সুস্থ ভাবে বড় হয়ে ওঠা?

যে পুরুষেরা সত্যিকার শিক্ষিত, সত্যিকার সভ্য, যারা মেয়েদের নিজের মতোই আরো এক মানুষ বলে মনে করে, যে মানুষের অধিকার আছে স্বাধীনতার, যে মানুষের অধিকার আছে যেমন ইচ্ছে তেমন ভাবে বাঁচার, গভীর রাতে একা রাস্তায় হেঁটে গেলেও তারা মেয়েটিকে বিরক্ত করবে না। আর যে পুরুষ মেয়েদের যৌন নির্যাতন করার বস্তু বলে ভাবতে শিখেছে, সে পুরুষ মেয়েরা দিনের বেলায় ভিড়ের রাস্তায় হেঁটে গেলেও তার বুক খামচে ধরবে, তার নিতম্বে হাত দেবে, ভিড়ের বাসে বা ট্রেনে দাঁড়ালেও তাকে যৌন হেনস্থা করবে। রাত, নির্জনতা, মেয়েদের ছোট পোশাক, মেয়েদের মধুর চাহনী, বাঁকা হাসি, মেয়েদের নেশাগ্রস্ততা, এসব কোনও কারণ নয় ধর্ষণ ঘটার। ধর্ষণ ঘটে পুরুষের কারণে, পুরুষ যদি বিশ্বাস করে নারীকে ধর্ষণ করার অধিকার আছে তার, নারীকে অপদস্থ করার, অত্যাচার করার সব রকম অধিকার তার আছে, যেহেতু সে পুরুষ। নারীবিদ্বেষ ধর্ষণ ঘটায়, নারীর প্রতি ঘৃণা ধর্ষণ ঘটায়।

ধর্ষণ কোনও দিন মেয়েরা বন্ধ করতে পারবে না, মাথা থেকে পা পর্যন্ত বোরখায় ঢেকে চলাফেরা করলেও ধর্ষণ বন্ধ হবে না। পুরুষেরা যেদিন মেয়েদের সম-মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখবে, সেদিন বন্ধ হবে ধর্ষণ। যেদিন পুরুষ বুঝবে মেয়েরা যে পোশাকই পরুক, কোনও পোশাকের অনুবাদই ‘আমি সেক্স চাই’ নয়, সেহেতু মেয়েরা সেক্স চাইছে এই ভেবে বা এই ছুতোয় মেয়েদের ওপর ঝাঁপিয়ে পরার কোনও অধিকার তাদের নেই, সেদিন বন্ধ হবে ধর্ষণ। সেক্স চাইলে মেয়েরা বলবে সেক্স চাই, পোশাক বলবে না। পোশাক কথা বলতে পারে না। পুরুষেরা পোশাকের ভাষা অনুবাদ না করে বরং মেয়েদের মনের কথা জানার চেষ্টা করলেই ভালো। আর, মেয়েদের ‘না’ মানে কিন্তু না-ই। এ কথাটি কতকাল থেকে মেয়েরা বলছে, আমরা যখন সেক্সের আহ্বানে উত্তরে ‘না’ বলি, তখন পুরুষেরা আমাদের ‘না’ টাকে নিজে নিজে হ্যাঁ অনুবাদ করে নেয়। পুরুষ যদি তাদের চরিত্রের এই দিকটাকে শুধরে নেয়, যদি যৌনতার ইচ্ছে, নির্যাতনের ইচ্ছে, পিষে মারার ইচ্ছে, পেশির জোর দেখাবার ইচ্ছেকে সামাল দেয়, যদি সভ্য হয়, তাহলেই বন্ধ হবে ধর্ষণ।

টিভি তারকা মোশাররফ করিম সেদিন ঠিক বলেছিলেন, পুরুষের চরিত্র সংশোধন করতে হবে, তা না হলে ধর্ষণ বন্ধ হবে না। অমনি খেপে উঠেছে ধর্মান্ধ মৌলবাদী আর নারীবিদ্বেষীরা। তারা ধর্ষণের দায় দিতে চায় ধর্ষিতাকে। তারা বলতে চায়, মেয়েরা ধর্ষিতা হয় নিজেদের দোষে। উল্টোপাল্টা পোশাক পরেছিল, চুল ঢাকেনি, বুক ঢাকেনি, বাহু ঢাকেনি, পা ঢাকেনি সে কারণে ধর্ষিতা হয়েছে। ধর্ষণের দায় তারা ধর্ষককে দিতে চায় না। মোশাররফ করিমের উচিত হয়নি নিজের সত্য কথনের জন্য ক্ষমা চেয়ে নারীবিদ্বেষী ধর্ষকদের আস্কারা দেওয়ার। উচিত হয়নি ধর্ষকদের পক্ষের লোকদের উল্লাস করার সুযোগ দেওয়ার, উচিত হয়নি ধর্ষকদের মাথায় বিজয়ের মুকুট পরানোর। অত বড় তারকাই যদি ভয় পান, তাহলে দেশের সাধারণ মানুষেরা কী রকম তটস্থ থাকে, অনুমান করে আঁতকে উঠি।

সত্য তবে সত্যিই নির্বাসনে!  এই অসম সমাজে,  এই চরম মিথ্যের মধ্যে মেয়েরা কী করে বেঁচে আছে,  ভেবে কূল পাই না।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

কমেন্টস