‘আমরা উন্নয়শীল দেশ হলেও মনটা উন্নত করতে পারিনি’

প্রকাশঃ মার্চ ২০, ২০১৮

নজরুল বিক্রমপুরী।।

আমিও বাসে চড়ি অনেকের মত। তবে সব সময় না। যখন আমার গাড়ি থাকে না, কিংবা কোন বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না। আজও বাসে চড়তে হল আমাকে। পুরাতন বিমানবন্দর থেকে মিরপুর-১৩ তে যাব। ট্রাস্ট পরিবহনে উঠেছি। সেবা মন্দ না। কিন্তু আসার পথে সীট পাওয়া যায় না। মিরপুরে মানুষ বেশি, তাই যাত্রীও বেশী। অনেক বেশি। মনে হয় মধ্যম আয়ের মানুষদের বসবাসই এখানে বেশি। আমার মতো বাসই যাদের চলার বিকল্প পথ।

একসময় ঢাকার রাজপথে বাদুরের মত বাসে ঝুলেছি, কিন্তু এখন আর পারি না। এখন ঝুলার বয়স ও শক্তিও কোনটাই নাই। শরীরেও কুলায় না। মনের জোরটাও পাই না। বাসে উঠেই এখন সীট খুঁজি বসার জন্যে। দাঁড়িয়ে হাঁটুতে হাঁটুতে গুতোগুতিও অার ভালো লাগে না। বাসের সীটে বসলেও গুতো খেতে হয়। সীট এত ছোট যে হাঁটু ঠেকে সামনের সীটে। বাসগুলোতে লেখা থাকে মিনি বাস কিন্তু এ বাসগুলোর যন্ত্রণা অনেক বেশি রাজধানীতে।

একবার ইয়োকোহামা থেকে কানাগাওয়াতে যাওয়ার জন্যে বাসে উঠেছি। ২০০১ সালের কথা এটি। সামনে বেশ কয়েকটা সীট খালি দেখে আমি বসে পড়লাম। তখন বয়স এতোটা বাড়েনি। পরপর আরো লোক উঠল। তারা কেউ আমার পাশে বসলেন না। আমি অবাক। সীট খালি। তারপরও অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু পর খেয়াল করলাম। অনেকেই আমার দিকে অন্যরকম ভাবে তাকাচ্ছেন।

দেখলাম আমার বসার সীট রঙ ধুসর। আর অন্যদের মেরুন। এরপর ডানে বামে তাকালাম। উপরে দেখলাম তিন ধরনের ছবি। আমার বসা সিট গুলো বাচ্চাসহ মহিলা, বয়স্ক মানুষ, আর অসুস্থদের জন্য আলাদা করে রাখা। তারা ছাড়া অন্য কেহ বসেন না এই সীটে। আমি উঠে গেলাম। নিজেকে অপরাধী মনে হল। বোকাও ভাবলাম।

আমাদের বাসে সীট থাকে। এক সময় মহিলাদের জন্য আলাদা সীট থাকত। এখন নেই। সবাই এখন সব সীটে বসেন। ইচ্ছা স্বাধীন। হয়তো ভাড়া সমান বলে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে? তারাওতো স্বাধীন। ভাড়া সমান দেন। তবুও বিশেষ শ্রেণির মানুষকে তারা সন্মান করেন। বসতে দেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। আমরা কেন  জানি পারি না। আমাদের অভ্যাস নেই। অভ্যাস করলে নিজেকেই ছোট মনে হয়।

বাস ততক্ষণে মিরপুর-১৪ নম্বর এসে দাঁড়াল। একজন যাত্রী তার সহযাত্রীকে অন্য জায়গায় বসার ইশারা করলেন। আমাকে বসানোর জন্য। ভাল লাগল। আমি বসতে চাইলাম না। যদিও আমার কাধে একটা ঝোলা ব্যাগ। ওমা, ড্রাইভারের পাশ থেকে অন্য একজন উঠে এলেন। অই সীটে বসে গেলেন আমি বসার আগেই। বয়স তার কত হবে ২৫-৩০।  আমার আর্ধেক ।

পরে অবশ্যই আমাকে বসার জায়গা ছেড়ে দিলেন অন্যজনের কথায়। কিন্তু এমন কেন হবে। আমরা উন্নয়শীল দেশ হলেও মনটা উন্নত করতে পারিনি। সিটের রং আলাদা করতে পারিনি। সেবার মানসিকতা আমাদের নেই। নেই সভ্য হবার মানসিকতাটাও। গায়ের জামা, ঘরের আদল আমাদের বদলেছে। কিন্তু মনকে বদলাতে পারিনি। হয়তো পারবোও না কোন দিন। মাঝে মাঝে মনে হয় আধুনিকতা আর ইংরেজী স্কুলের দরকার নেই। আবার “আদরশলিপি” পড়ি। সবাই মিলে আবারো পড়ি আরো একবার। তখন যদি পারি। যদি বেঁচে থাকি ততদিন।

প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ফিরে ১৯ মার্চ, ২০১৮।

লেখক- উপ-সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার । সাবেক পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র।

কমেন্টস