আজ সেই ঐতিহিসিক ৭ই মার্চ

প্রকাশঃ মার্চ ৭, ২০১৮

মো. শাহজাহান মিয়া-

সে দিনের ঢাকা শহরের কেন্দ্র বিন্দু রেসকোর্স ময়দান। হোটেল শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরি, বাংলা একাডেমি, কালী মন্দির শেরে বাংলা এ,কে ফজলুল হক ও শহীদ সৌরাওর্দীর মাজার, সুপ্রিম কোর্ট, হাই কোর্ট, রমনা পার্ক ও ঢাকা ক্লাব বেস্টুনির ভিতর এই ময়দান।

এই ময়দানে এক কালে ঘোড়া দৌড়ের মাধ্যমে প্রকাশ্যে জুয়া খেলা হত। ব্রিটিশ শাসন আমল থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তান শাসন আমলে এই জুয়ার প্রচলন ছিল। ঐ মাঠের চতুর দিক ঘুরে এলে চার কিলোমিটার পরিদি হবে সন্দেহ নেই সেই মাঠের নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। এই ময়দানের উত্তর/পূর্ব দিকে নৌকা আকারে গড়া হয়েছিল এক বিশাল মঞ্চ। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ লক্ষ লক্ষ জনতায় পরিণত হয়েছিল জনতার সমাবেশে পরিণত হয়েছিল মহা জনসমুদ্রের মাঠ। অনেকের হাতে লগি, বৈটা। এদেশের একমাত্র জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান আসবেন সেই মহা জনসমুদ্রে। তিনি ভাষণ দিবেন জাতির উদ্দেশ্যে, দিক নির্দেশনা দিবেন মহান মুক্তিযুদ্ধের। প্রখর রৌদ্র ভেদ করে ঢাকাসহ দূর দূরান্ত থেকে ট্রেন, বাস, স্টিমার ও লঞ্চ যোগে লোক এসেছে কেবল সেই মহান নেতার কন্ঠে ভাষণ শ্রবণের জন্য।

সকলের একটি চিন্তা একটি ভাবনা কখন নেতা আসবেন ভাষণ দিবেন। আমি মঞ্চের অদূরে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সামনে একটি পিকআপ ভ্যানে ওয়ারলেস সেটের পাশে বসে সব কিছু অবলোকন করছি। বেলা ৩ টা ২০ মিনিট বেজে গেল। নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এলেন। সিড়িঁ বেয়ে ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠলেন লক্ষ লক্ষ জনতা কর তালা আর জয় বাংলার ধ্বনির ও লগি-বৈটা উচিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানানো হল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বলিষ্ঠ ২ হাত নাড়িয়ে সম্মানের জবাব দিয়ে মাইক্রো ফোন হাতে নিয়ে এক মহা কবির ভাষায় বজ্রকণ্ঠে তার মহা মূল্যবান ভাষণ দিতে আরম্ভ করলেন। জাতীয় ৪ নেতাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সকল নেত্রীবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর পাশে দনড়ায়মান।

বঙ্গবন্ধু তার ভষণে বলতে আরম্ভ কনলেন, ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ ভরাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়ছি। আপনারা সবাই জানেন এবং বুঝেন আমরা আমাদের জীবন দিয় চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্চিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে, বাংলার মানুষ তাদের অধিকার চায়। ভাইয়েরা আমার ২৫ তারিখে এসেম্লী কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নায়। আমি বলে দিয়েছি যে, ওই শহীদদের রক্তের উপর পারা দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই তোমরা ব্যারাকে থাক, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না, কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না, ৭ কোটি মানুষকে দাবিয়ে রাকতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি। তখন কেউ আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবা না। প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবা। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিবো এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।

ববঙ্গবন্ধুর সেই ভষণের আলোকে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আমরা অর্জন করি মহান স্বাধীনতা। যে দেশের নাম বাংলাদেশ। আজ বঙ্গবন্ধু সেই ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি গত ৩০ অক্টোবর ২০১৭ খ্রিঃ ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশানাল রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যম বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের এক শ্রেষ্ঠ দলিল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। যার ফলে আজ গর্বিত বাংলাদেশ, গর্বিত বাঙালি জাতি। তাই আজ কবি অন্নদা সঙ্করের ভাষায় বলতে হয়
যত দিন রবে পদ্মা, যমুনা,
গৌরি, মেঘনা বহমান
তত দিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।
দিকে দিকে আজ রক্ত গঙ্গা
অশ্রু গঙ্গা বহমান
তবু নাহি ভয়
হবে হবে জয়
জয় মুজিবুর রহমান।।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টর

কমেন্টস