ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যদি এমন হতো…!

প্রকাশঃ মার্চ ১, ২০১৮

হাকিম মাহি।।

ব্যস্ত নগরী। উন্নয়নের মহাসড়কের পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। শত বাঁধা উপেক্ষা করে নারী, পুরুষ সবাই সমান তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে-ঘাটে, অফিস আদালতে কাজ করছেন। অফিসে কাজের চাপ আগের চেয়ে অনেক বেশি। একটু শারীরিক ও মানসিক অবসর চান সামিরা। সময় পেলেই সাগরের টানে ছুটে চলেন তিনি। শৈশব থেকেই সাগরের সাথে তাঁর এক গভীর মিতালি। তাই রাতের শহরের ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলোতে রিকশায় চেপে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে পৌঁছলেন সামিরা। সাথে তাঁর প্রিয় নীল রঙ্গের ট্রলি ব্যাগ। আর গলায় ঝুলানো ভালোবাসার ক্যামেরা।

টিকিট সংগ্রহ করে জানালার পাশে বসলেন সামিরা। খানিকক্ষণ যেতেই বাস ছেড়ে দিলো। গাড়ি চলছে শো শো করে। কিন্তু মনে হচ্ছে অন্যদিনের তুলনায় বাস চলছে ধীর গতিতে। কারণ মনের গতি যে গাড়ির গতির চেয়ে অনেক বেশি! কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ভ্রমণ এটা ভাবতেই সামিরার মন চলে গেছে গন্তব্যে। শুধু বাসের সিটে পড়ে আছে তাঁর দেহ। সময় যেন বড় নিষ্ঠুরভাবে মিলনের পথে বাঁধা হয়ে আছে তাঁর।

দীর্ঘ ভ্রমণে নিয়মানুযায়ী প্রত্যেকটি বাস মাঝ পথে পানীয় বিরতির জন্য থামে। সামিরাদের বাসও ঢাকা ও কক্সবাজারের মাঝ পথ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে থামলো। সবাই বাস থেকে নেমে যান। কিন্তু সামিরার নামতে একটু দেরি হচ্ছে। হয়তো বা সে মনে মনে সমুদ্রের দখিনা হাওয়ায় মিলে গেছে। বাসের সুপারভাইজার, আপা নামবেন না? বের হয়ে একটু ঘুরে আসেন। নাস্তা করে আসেন। দেখবেন, বড্ড বেশি ভালো লাগবে আপা! সামিরা ভাবনার রাজ্য থেকে বের হয়ে সুপারভাইজারকে ধন্যবাদ দিয়ে রেস্তোরাঁয় চলে গেলেন।

ফ্রেস হয়ে পছন্দের কিছু খাবার নিয়ে তিনি খেতে বসলেন। সবাই খুব তৃপ্তি নিয়েই খাচ্ছেন। আর প্রিয় মানুষদের সাথে গল্প করছেন। সবাই এক প্রকারের খন্ডকালীন আনন্দে মেতে আছেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। রেস্তোরাঁর বাহির থেকে বন্দুকের গুলির শব্দ আসে। ক্ষণিকের জন্য সবাই চুপ হয়ে যান। একদল ডাকাত বন্দুক তাক করে রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে সবাইকে হাত উপর দিকে উঠাতে বলে। নিরুপায় সবাই। দূর থেকে একটা টর্চের আলো রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে। তাতে ঘরের মধ্যে কিছুটা হলেও দেখা যায়। সকলেই যার যা আছে টাকা, গহনা সবকিছু ডাকাতের হাতে তুলে দেন।

এক পর্যায়ে সামিরার সামনে আসে দু’জন ডাকাত। সামিরা একে একে খুলে দেন তাঁর সকল গহনা ও হাতে পড়া ভালোবাসার মানুষের দেয়া সখের ঘড়ি। সামিরার কোন প্রতিবাদ নেই। মুখ দিয়ে টু শব্দটিও করলেন না। কারণ বন্দুকের সামনে বনের রাজা সিংহও বাড়ির শান্ত বিড়াল ছানা হয়ে যায়। এদিকে একজন ডাকাতের চোখ পড়ে সামিরার দেহের উপর। ডাকাতি ছেড়ে দু’তিন জন ডাকাত সামিরার শরীর স্পর্শ করে। তখনই সামিরা গর্জে ওঠেন। কোমর থেকে সরকারের দেয়া পিস্তলটা আজ কাজে লাগান। ডাকাতদের দিকে গুলি করেন। গুলি লেগে দুজন ডাকাত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রেস্তোরাঁর ভেতরে ও বাহিরে থাকা অন্যসব ডাকাতরা ভয়ে, আতঙ্কে রেস্তোরাঁ থেকে পালিয়ে যায়।

ডাকাতের দল পালিয়ে চলে গেলে উৎসুক যাত্রীরা সামিরার সাহসী কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। অনেকেই সামিরাকে পেশাগত কারণে চিনেন। আবার অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন কে এই সামিরা! কোথায় পেলেন নিরাপত্তার এই অস্ত্র?

সামিরা বলতে থাকেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ নতুন করে বাস্তবায়ন করেছে আমাদের সরকার। এখানে প্রত্যেকটি আইনই সংবাদ এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে, নিরাপদভাবে কাজ করার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনগুলোর মধ্যে তিনটি আইন উল্লেখযোগ্য। ৩. গণমাধ্যম নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে গিয়ে বাঁধাগ্রস্ত হলে জান, মালের নিরাপত্তা দিবে সরকার। ক. প্রশাসন দিয়ে। খ. অস্ত্র দিয়ে(পিস্তল)। ৪. সংবাদপত্র বিনা বাঁধায় সকল সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারবেন। ৫. সংবাদপত্র স্বাধীন। তবে তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনৈতিকতার জন্য আদালতের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে’। সেখান থেকে এই পিস্তল পাওয়া সামিরার।

সামিরা দেশের একটি নামীদামী মিডিয়ার ক্রাইম রিপোর্টার। ছাত্রজীবন থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন তিনি। ইচ্ছা ছিলো লেখাপড়া শেষ করে ব্যবসা করার। কিন্তু তিনি দেখলেন মিডিয়া পেশায় এখনও নারীরা বহু পিছিয়ে। তাই তিনি ইচ্ছা করে মিডিয়া পেশার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজে নিজের নাম লেখান। তিনি চান দেশের পিছিয়ে পড়া নারী সমাজ এগিয়ে আসুক এই মহান পেশায়। তারা প্রমাণ করুক নারীরা জন্মগতই সমান অধিকার নিয়ে জন্মেছে। কিন্তু অন্ধ সমাজ তাদের স্বার্থে নারীদের অবলা ও দুর্বল ভাবছে।

একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক সে শুধু তাঁর পেশাগত কাজ করেই ক্ষান্ত থাকেন না, বরং সে সবসময় কাজ করে সমাজের অন্যায়, অবিচার ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। বিশ্বের দরবারে ফুটিয়ে তোলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ড। যুগে যুগে এই দর্পণ স্বরূপ সাংবাদিক সমাজ নিপীড়িত হচ্ছে রক্ষণশীল সরকারের হাতে। একটা ভালো আয়নার সামনে গেলে যেমন একজন মানুষের সকল খুঁৎ ধরা পড়ে, তেমনি একজন সাংবাদিকের সামনে ধরা পড়ে একটি দেশের সকল অনিয়ম ও দোষ ত্রুটি। আর সাংবাদিকেরা এই দোষ ত্রুটির গঠনমূলক সমালোচনা করে এবং এর একটি সঠিক সমাধান খুঁজে বের করে সরকার এবং দেশবাসীর সামনে তা হাজির করেন।

সুতরাং সরকারকে বলবো, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যেন সংবাদ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্যই হয়। এটা যেন মিডিয়ার জন্য নব্য কোন ফাঁদ তৈরি না হয়। তাহলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অন্ধকার কূপে হারিয়ে যাবে। বাতিতে তেল যতই থাক, দিয়াশলাই ছাড়া যেমন আলো জ্বালানো সম্ভব নয়, তেমনি সাংবাদিক এবং মিডিয়া ছাড়া উন্নয়নের আলো জ্বালানো সম্ভব নয়। অতএব, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনর্বিবেচনা  করুন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বান্ধব আইন বাস্তবায়ন করুন। কারণ, মিডিয়া বাঁচলে বাঁচবে দেশ, গড়ে উঠবে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

কমেন্টস