একুশে ফ্রেব্রুয়ারি এক দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮

নুরুল হাসান চৌধুরীঃ

মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে ভাষার মাধ্যমে৷ ইশারা বা ইঙ্গিতের মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারে না৷ একটা শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে তার মায়ের ভাষায় কথা বলবে এটাইতো নবজাতক শিশুর অধিকার। কিন্তু বাঙালি শিশু, কিশোর বাংলার আপামর জনসাধারণ তাদের মাতৃভাষায় কথা বলার সে অধিকারটুকু হারায়৷

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর পূর্ব বাংলা অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের মাতৃভাষা বাংলার উপর আঘাত হানে পশ্চিম পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী৷ ৫৪.৬০% জনগণের ভাষা বাংলাকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে মাত্র ৭.২% লোকের ভাষা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে বাংলার জনগণ তার তীব্র বিরোধীতা করে৷ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয় রাজ পথে৷ নিজের মায়ের ভাষার সম্মান রক্ষা করতে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দেয় বাংলার অকুতোভয় সন্তানেরা৷ অান্দোলন শুরু করে অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া গুটিকয়েক লোকের ভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে৷

১৯৪৭ সালের ১৭ই মে হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত এক উর্দু সম্মেলনে চৌধুরী খালেকুজ্জামান বলেন, ‘উর্দু হল পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা’৷ কিছুদিন পরে জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার স্বপক্ষে অভিমত পেশ করেন৷ এ দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পাকিস্তানর ‘রাষ্ট্রভাষা সমস্যা শীর্ষক’ এক প্রবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন৷

এভাবে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এগুতে থাকলে ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়৷ তমদ্দুন মজলিস বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে৷ কিছুদিন পর করাচিতে পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলন হয়৷ ঐখানে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়৷ এর বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এক বিরাট প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়৷ মুনীর চৌধুরী, আব্দুর রহমান, কল্যাণ দাস গুপ্ত প্রমুখ উক্ত সভায় বক্তব্য প্রদান করেন৷

আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ৷ পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু, ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে রাখার প্রস্তাব করেন৷ কিন্তু পাকিস্তানি শাসক চক্র তাদের হীন মানসিকতা পরিহার করেনি৷ এমনকি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে নির্লজ্জভাবে বলেন, Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan।

তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রভাষা উর্দুর ব্যাপারে কেউ বিভ্রান্ত করলে বুঝতে হবে সে রাষ্ট্রের শত্রু’৷ এভাবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দিন ও নুরুল আমীনরা বাঙালির উপর সম্পুর্ণ অপরিচিত একটি ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইলে এবং বাঙালির প্রাণের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করার পায়তারা করলে বাংলার ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক-শ্রমীকসহ আপামর জনসাধারণ মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে নেমে আসে৷ পাকিস্তানি শাসক চক্র নীতি বিবর্জিত সিদ্বান্তের বিরুদ্ধে  তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে৷

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের চুড়ান্ত পরিণতি লাভ করে৷ সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে ঢাকা বিশ্বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে ছাত্ররা সামনে এগুতে থাকলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ শুরু করে এক পর্যায়ে পুলিশ সমবেত জনতার উপর গুলি বর্ষণ করে৷ সে সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরো অনেক বাঙালি বীর সন্তান৷ তাদের আত্মত্যাগে আমরা পেয়েছি ভাষার জন্য জীবন দানের এক গৌরবময় ইতিহাস৷ পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী সেদিন বুঝতে পেরেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত করার জাতি বাঙালি নয়৷

এরই স্বীকৃতিসরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে৷ ফলশ্রুতিতে ২০০০ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পালন করছে বিশ্বের প্রায় সকল স্বাধীন দেশ৷ সুতরাং একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির এক দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল৷ নিজেদর অধিকারের প্রশ্নে একুশে ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বের কাছে একটি প্রেরণা৷

কমেন্টস