আবুল কাশেমের লেখা ‘আমাদের প্রস্তাব’ প্রবন্ধটিই ভাষা আন্দোলনের সুস্পষ্ট গাইড লাইন (পর্ব-২)

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৮

আরিফুল ইসলাম, ঢাবি প্রতিনিধিঃ

ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা, যা বাঙ্গালি জাতিকে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে আসছে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে মাসব্যাপী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের মধ্যে আজ থাকছে ২য় পর্ব।

‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকাটিতে ৩টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছিলো। তমদ্দুন মজলিসের পক্ষে ‘আমাদের প্রস্তাব’ প্রবন্ধটি লেখেন অধ্যাপক আবুল কাশেম। উক্ত নিবন্ধে ভাষা-আন্দোলনের সুস্পষ্ট গাইড লাইন বা নীতিমালা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিলো। নীতিমালাসমূহ হলো-

১। পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, আদালতের ভাষা এবং অফিসাদির ভাষা হবে বাংলা।

২। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দু’টি- উর্দু ও বাংলা।

৩। বাংলাই হবে পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রথম ভাষা। ইহা পূর্ব-পাকিস্তানের শতকরা একশ জনই শিক্ষা করবেন। উর্দু হবে দ্বিতীয় ভাষা বা আন্তঃপ্রাদেশিক ভাষা। যারা পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে চাকুরী ইত্যাদি কাজে লিপ্ত হবেন, তারাই শুধু উর্দু ভাষা শিক্ষা করবেন। মাধ্যমিক স্কুলের উচ্চতর শ্রেণীতে উর্দু ভাষা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিক্ষা দেয়া যাবে। আর ইংরেজী হবে  পূর্ব-পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা। পাকিস্তানের কর্মচারী হিসেবে যারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকুরী করবেন বা যারা উচ্চতর বিজ্ঞান-শিক্ষায় নিয়োজিত হবেন, তারাই শুধু ইংরেজী শিক্ষা করবেন।

অধ্যাপক আবুল কাশেম তার প্রস্তাব-নিবন্ধে আরও বলেন, ‘কায়েদে আজম জিন্না প্রত্যেক প্রদেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করে নিয়েছেন। এমন কি লাহোর প্রস্তাবেও পাকিস্তানের প্রত্যেক ইউনিটকে সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার অধিকার দেয়া হয়েছে। কাজেই প্রত্যেক ইউনিটকে তাদের স্ব স্ব প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা কি হবে, তা নির্ধারণ করাবার স্বাধীনতা দিতে হবে।’

রাষ্ট্রভাষার দাবিটি যুক্তিসঙ্গতভাবে মীমাংসার সূত্র দেয়ার পরও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জোর করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে, অধ্যাপক আবুল কাশেম তাদের সেই প্রচেস্টায় বাধাদান ও দেশবাসীকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একে সর্বপ্রকারে বাঁধা দিতে হবে। এর বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এরই সূচনা হিসেবে আমরা কয়েকজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিকের প্রবন্ধ প্রকাশ করছি এবং সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তানের প্রত্যেককে এই আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’

অধ্যাপক আবুল কাশেম ভাষা আন্দোলন প্রাথমিকভাবে শুরু করার জন্য দেশের মানুষের করণীয় কিছু কর্মসূচি স্থির করে দেন।

কর্মসূচিগুলো ছিলোঃ

প্রত্যেক স্কুল, কলেজে এবং প্রত্যেক শহরে সভা করে অপর ভাষাকে আমাদের উপর চাপিয়ে দেবার বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ করে কায়েদে আজম ও অন্যান্য নেতাদের নিকট পাঠাতে হবে। গণ-পরিষদের প্রত্যেক সদস্যের নিকট ডেপুটেশন গিয়ে তারা যেন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে মত দিয়ে বাঙ্গালীর আত্মহত্যার পথ সুগম না করেন, তা স্পষ্ট করে বুঝাতে হবে।

অধ্যাপক আবুল কাশেমের দেয়া এসব কর্মসূচিই ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে জনগণকে একত্রিত করার পথ প্রশস্ত করে।

তথ্যসূত্রঃ (পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু, তমদ্দুন মজলিস, সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭, পৃঃ ৩)

কমেন্টস