‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’- ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপন করে (পর্ব ১)

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৮

আরিফুল ইসলাম, ঢাবি প্রতিনিধিঃ

ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি আজ থেকে শুরু হয়েছে। ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা, যা বাঙ্গালি জাতিকে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে আসছে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে মাসব্যাপী ধারাবাহিক প্রতিবেদনের মধ্যে আজ থাকছে ১ম পর্ব।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের (পূর্ব বাংলা হিসেবেও পরিচিত) বাংলাভাষী ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ ৬ কোটি ৯০ লাখ জনসংখ্যাবিশিষ্ট নবগঠিত পাকিস্তানের নাগরিকে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্রে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশসহ প্রচারমাধ্যম ও বিদ্যালয়ে কেবলমাত্র উর্দু ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। ওই সমাবেশে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রবল দাবি উত্থাপন করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান পাবলিক বাংলাকে তাদের অনুমোদিত বিষয়তালিকা থেকে বাদ দেয় ও সাথে সাথে মুদ্রা এবং ডাকটিকেট থেকেও বাংলা অক্ষর বিলুপ্ত করে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান মানিক উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বানানোর জন্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মায়ের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের তৎকালীন প্রভাষক জনাব আবুল কাশেম তমদ্দুন মজলিস গঠন করেন। ভাষা আন্দোলনের ডাক এবং দিক নির্দেশনা দিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ তারিখে তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে অধ্যাপক আবুল কাশেমের সম্পাদনায় ১৮ পৃষ্ঠার ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক ঘোষণাপত্র পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। সেজন্য অধ্যাপক আবুল কাশেমকে ভাষা আন্দোলনের স্থপতি বলা হয়। সেদিনই  ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক ঘোষণাপত্রের উপর একটি সেমিনার করা হয়। সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক আবুল কাশেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, কবি জসিম উদ্দীন, অধ্যাপক কাজী আকরম হোসেন, অধ্যাপক শামসুল হক, শাহেদ আলী, সানাউল্লাহ নূরী।

লাল ও সবুজ রং এর প্রচ্ছদে ছাপা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে পুস্তিকাটির মূল্য ছিলো তিন আনা। প্রিন্টার্স লাইনে লেখা ছিলোঃ অধ্যাপক এম এ কাশেম, তমদ্দুন মজলিস, রমনা ঢাকা। ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকাটিতে ৩ টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছিলো। তমদ্দুন মজলিসের পক্ষে ‘আমাদের প্রস্তাব’ প্রবন্ধটি লেখেন অধ্যাপক আবুল কাশেম, ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষা-সমস্যা’ প্রবন্ধটি লেখেন অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন এবং ‘বাংলা ভাষাই হইবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি লেখেন তৎকালীন দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা এবং এই আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা ও ঘোষণাপত্র প্রকাশের পটভূমি সম্পর্কে ভাষা সৈনিক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আবুল কাশেম, একেএম আহসান দুজন ১৯ আজিমপুরে একসাথে থাকতেন। তাঁরাই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে প্রথম উদ্যোগ নেন। আমাদের সাথে এসএম হলের ওয়েস্ট হাউসের একটা কামরায় একদিন তারা এ নিয়ে আলাপ করেন। আমরা এরপর ১৯ আজিমপুরে একটি বৈঠকে মিলিত হই। শামসুল আলম, আমি, মতিন চৌধুরী, আহসান, কাসেম, নূরুল হুদা সেখানে ঠিক করলাম যে, এর প্রতিবাদ করতে হবে। তবে এটাও ঠিক করলাম যে, সেই প্রতিবাদের পূর্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা দিয়ে একটি পুস্তিকা বের করা উচিত। কাসেম সাহেব নিজে লিখতে সম্মত হলেন। এছাড়া কাজী মোতাহার হোসেনকে বলা হলে তিনিও রাজি হলেন। আবুল মনসুর সাহেবকে চিঠি দেয়া হলে তিনিও একটা লেখা দিলেন। ওটা ছাপা হলো।’

তথ্যসূত্রঃ আমি যখন সাংবাদিক ছিলাম- বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি ২০০২, ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গঃ কতিপয় দলিল- বাংলা একাডেমি।

বিঃদ্রঃ ২য় পর্বে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকাটিতে যে ৩ টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছিলো, সেগুলো সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য প্রদান করা হবে।

কমেন্টস