কেন এই হামলা-অবরুদ্ধ-বঞ্চিত, প্রকৃত দায়ী কারা?

প্রকাশঃ জানুয়ারি ২৬, ২০১৮

একি ভয়ানক চিত্র! নারী হয়েও আরেক নারীর জামা ছেঁড়াছেড়ি। আন্দোলনে এসে পুরুষের তোপের মুখে নারীদের আর্তনাদ। লাঞ্চিতের সংখ্যাও দীর্ঘ। ভিসির গায়ে হাত! ছাত্র সংগঠনের ভয়ানক রুপ। তাদের হাতেই এখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব! কেউ মারে; কেউ খায়! আবার কেউ খোলেও! গণমাধ্যমের উপর হামলা। নিরাপদ স্থানে যেতে কর্মকর্তা কর্মচারীদের চোখেমুখে আতংকের ছাপচিত্র। মিডিয়ার কল্যাণে প্রচার-প্রকাশে এটি দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠে ছাত্র-শিক্ষকের ভয়াল দৃশ্যত রুপ। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে একটি অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে ঝুলন্ত লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। যার ফলে রাস্তায় থাকে শিক্ষার্থীরা। সংসদ থাকে উত্তপ্ত! তবুও প্রকৃত দায়ীরা চিহ্নিত হয়না। হচ্ছে না চলমান উত্তপ্ত পরিস্থির সমাধান।

আমাদের সবারই জানা, গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ। তখন থেকেই চলছে নানা আন্দোলন। তারই ভয়াল রুপ হিসেবে এবার দেখা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়ে নেতাদের নির্দেশে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও লাঞ্চনার দৃশ্য।

যারা এই আন্দোলন করছেন তাদের আন্দোলনও যৌক্তিক। গত ১৫ ই জানুয়ারী অধিভুক্ত সাত কলেজকে বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সেটি আমাদের জানা আছে। এরপরই বিচার চাওয়া ব্যাক্তিদের নামে অজ্ঞাত মামলা। ওদিনের ঘটনায় আন্দোলনরত ছাত্রীদের নিপীড়নকারী ছাত্রলীগ নেতাদের বহিষ্কার, প্রক্টরের পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের নামে দেয়া মামলা প্রত্যাহার এবং তদন্ত কমিটিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি রাখা এ দাবী তারা করতেই পারে। এরজন্য নিরাপত্তা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের রড দিয়ে পিটিয়ে, নারীর পোষাক খোলা এটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক নেতাদের কাজ হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের দাবীর কাছে একজন ভিসি অবরুদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ার কল্যাণে এ দৃশ্য বিশ্বব্যাপি সচেতন মানুষ দেখেছেন। একজন ভিসিকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের। নিছক কোনো দলীয় নেতাদের নয়।

ছাত্রলীগকে জানতে হবে ভিসিকে নিরাপত্তা দেয়া কী ছাত্রলীগের কাজ? জানতে হবে ছাত্রলীগ ভিসির পাহারাদার না। তারা ভিসির লাঠিয়াল বাহিনী না। তাদের এই গুণ্ডামী করা কোনো যৌক্তিকতার কাতারে যে পড়েনা এখনই তাদের তা বুঝতে হবে।

ছাত্ররা আন্দোলন করবে তা যৌক্তিক হতে পারে; নাও হতে পারে। এ জন্য নারীদের উপর যৌন-হামলা এটা তাদের দায়িত্ব হতে পারে না। যদি তাদের রাজনৈতিক দর্শন অন্য কিছু বলে সেটা তাদের একান্তই আদর্শ তবে প্রকাশ্য হতে পারে না। আবার এ-ও বলতে হচ্ছে একজন ভিসি এতটাই দুর্বল যে নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনকে বিশ্বাস করে না। নির্ভর করে ছাত্রলীগের উপর। আস্থা থাকে ছাত্র নামক পেটুয়া বাহিনীর উপর। আবার ঘৃণা থাকে কিছু শিক্ষার্থীর উপর! শিক্ষার্থীরা যখন তার সাথে দেখা করতে গেলো তখন তিনি উপস্থিত হতে অস্বীকার করে তালা মেরে ভেতরে বসে থাকা এটা যে বড় ধরণের ক্ষমতার অপব্যবহার তাকে তা স্বীকার করতেই হবে। তাই একজন ভিসির জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবের ইতিহাসে এ ঘটনা কলঙ্কের ইতিহাস হয়ে রয়ে যাবে।

এমন দৃশ্যে আমরা লজ্জা পাচ্ছি,  মনে হয় ভিসিরও পাওয়া উচিৎ।

যাই হোক এ পরিস্থিতি তৈরীর শেকড়ে আসি। ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা প্রায় দুই হাজার ১৫০টি অধীনস্থ সরকারি কলেজগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়ার পরামর্শ দেন। সরকারি কলেজ পৃথক করার এই সিদ্ধান্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আপত্তির পরও গত বছরের ২৮ অক্টোবর এক সভায় অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৮৪টি কলেজকে ভাগ করে দিতেও সুপারিশ করে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি। কিন্তু ১৭৭টি কলেজ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভাগ করা না হলেও গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই কোনো এক অদৃশ্য শক্তিতে রাজধানীর সাত কলেজ দেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।

এরপর থেকেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলে আসছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর সাত কলেজ অধিভুক্ত হয়েছে। তাই পুরো কাজটা তাদেরই, এখানে তাদের কোনো দায়িত্ব নেই। আর ঢাবি বলছে, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে একটু দেরি হলেও শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পাবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। শুধুমাত্র দায়িত্বভারের অক্ষমে প্রায় দুই লক্ষ শিক্ষার্থী এখন অভিশপ্ত! আর অদৃশ্য কারা এই অভিশাপকারী তাদেরও মুখোশ উন্মোচন হচ্ছে না। প্রশ্নের দাবী রাখে ১ বছর কেন প্রহসন করে একটি শিক্ষার্থীর জীবন থেকে এক বছর কেড়ে নেয়া হলো? তাহলে কি আমরা ধরে নেবো এটি একশ্রেণীর ষড়যন্ত্র এই সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্য করতে অথবা কাউকে ব্যর্থতার তালিকায় আনতে পূর্ব পরিকল্পিত। যেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট সময়ে সব কলেজের পরীক্ষা নিতে ও ফলাফল দিতে সুনাম অর্জন করছেন সেখানে ঢাবি ব্যর্থ কেন? এখনই সময় এসব প্রশ্নের সুষ্ঠু তদন্ত করা।

অধিভুক্ত হওয়ার আগে তখন সচেতন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছিলো ঢাকা কলেজসহ মান সম্মত কিছু কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান দিতে। তখন ঢাবি থেকেই এর আপত্তি উঠেছিলো, পাশাপাশি দুটি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে না। তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাত কলেজকে নিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে তার অদৃশ্য সিদ্ধান্ত ও প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে বলা চলে আজকের এই সাত কলেজ। গভীরের এই ইতিহাস অভিজ্ঞরাও জানেন।

যাই হোক এখন সহজ আলোচনায় আসি, সাত কলেজে কেন এখনো আগের সিলেবাস চলছে? তাহলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি দোষ করেছিল? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তো তাদের সন্তানের মত দেখেছিলো। আলাদা করে এ অপপরিবেশ কেন? কারা এর জন্মদাতা ছিলো তাদের জামা এখনোইকি টেনে ধরার সময় নয়।

সাতটি কলেজ ঢাবির পরিচয় দিয়ে চলতে হবে এটি খুব একটা রহস্যময় কথা। আমাদের সবারই জানা এ সাত কলেজের প্রত্যকেরই আলাদা পরিচয় আছে, সম্মান আছে, আছে একটি উন্নত মান । এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সাত কলেজকে কেন বলতে হবে তারা ঢাবির ছাত্র? এ সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পাবে ঢাবির সার্টিফিকেট,  তাহলে পরিচয় দিলে দোষইবা কিসের! পরিক্ষার খাতায় যদি ঢাবি লেখা থাকে। তাহলে পরিচয় দিলে গাঁ জ্বলবে কেন? আরে বাবা! মন্ত্রী, ডাক্তার কিংবা সম্মানিত হলে বুক ফুলিয়ে পরিচয় দিতে কোন সন্তানেরইবা খারাপ লাগে! সাথে এই প্রশ্নও জুড়ে দিই এ সাত কলেজ কি অধিভুক্ত হওয়ার জন্য কোন আন্দোলন বা মিটিং-মিছিল আগে করছিলো? এখন সন্তান জন্ম দিয়ে লালন করতে পারবেন না কেন? ওদের কষ্টটা একটু বুঝুন। পাশের বন্দুরা যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে ফেলতেছে আর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা তখনো ইন্টারমিডিয়েট পাশ!

লেখক: আবদুর রহিম।

গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থী ঢাকা কলেজ।

[email protected]

কমেন্টস