শিল্পী থেকে হিংস্রের পতাকায় নারী

প্রকাশঃ জানুয়ারি ২৪, ২০১৮

ফারুক আহমাদ আরিফ-

ব্যক্তি শ্রাবণী শায়লার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি। কথা-বার্তাও হয়নি। কিন্তু সেই শ্রাবণী শায়লার মতো কয়েকজন নারীকে নিয়েই আজ আমার লেখা।

(তার আগে একটি কথা বলে নেয়া প্রয়োজন যে, আমার কাছে নারী-পুরুষ মানুষ হিসেবে কোন পার্থক্য নেই। সৃষ্টিকর্তা মানুষের বংশধারা অব্যাহত রাখতে আদম আ. এর দেহের একটি অংশ থেকেই (তাঁর সঙ্গী ‘হাওয়া আ.’কে) নারীকে সৃষ্টি করেছেন।
অতএব এখানে নারী-পুরুষ অামার কাছে কোন পার্থক্য নয় উভয় মানুষ, সকলি সমান।)

২৩ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান স্যারকে আন্দোলনকারী কিছু শিক্ষার্থী তাঁর কার্যালয়ে ঘেরাও করে রেখেছিল। সেখানে উপাচার্যকে উদ্ধারে ছাত্রলীগের সভাপতি জাকির হোসেনের নেতৃত্ব একটি গ্রুপ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে। এতে বেশ অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের মত-পথ থাকে। তাদের দাবি-দাওয়া থাকে। এগুলো শান্তিপূর্ণভাবে আদায় করা প্রয়োজন।

যাই হোক সবকিছু ছাড়িয়ে যে বিষয়টি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আলোচিত হচ্ছে, নিন্দার ঝড় তুলছে সেটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল শাখার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লার আক্রমন নিয়ে। তিনি একজন নারী হয়ে অপর নারীর পোশাক খুলে নিতে আক্রমন করছেন। তার এই আক্রমনে অপর শিক্ষার্থীর লজ্জার আবরণ কেন খুলে নিতে হবে? তিনি কি তার আপন বোন হলে এই কাজ করতে পারতেন?

ফেসবুকে এক বন্ধুর মারফতে শ্রাবণী শায়লার ফেসবুক আইডিটি পেলাম। সেখানে পরখ করে যা দেখলাম শ্রাবণী শায়লা একজন শিল্পী মানুষ। সাংস্কৃতিক জগতে তার পদচারণা। একজন সাংস্কৃতিবান ব্যক্তি কখনো অপরকে আঘাত করতে পারে না। কিন্তু শ্রাবণী শায়লা তার শিল্পীজীবন বাদ দিয়ে হিংস্রের পতাকার নেতৃত্ব দিচ্ছে কেন?

সে মুসলিম ঘরে জন্ম নিয়েও স্বরসতী পূজায় অংশ নিয়ে অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান দেখিয়ে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন এটি ভালো দিক। ২২ জানুয়ারি স্বরসতী পূজা নিয়ে তার পোস্ট ছিল ‘শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও/জননী এসেছে দ্বারে/সরস্বতী পূজার শুভেচ্ছা’। কিন্তু যিনি সনাতনধর্ম মতে বিদ্যার দেবীর কাছে গেলেন তিনিই কি করে বিদ্যালয়ের বন্ধুদের গায়ে হাত দিলেন?

৬ জানুয়ারি সোপার্জিত স্বাধীনতারসামনে ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার চিত্রটি নি:সন্দেহে ভালো হলেও তার খারাপ কাজ সমালোচনার ঝড় তুলছে।

সেইদিন ছাত্রলীগের শোভাযাত্রায় কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল ইসলাম সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকিরের সাথে প্রথম কাতারেও তিনি ছিলেন। যে লোক প্রথম কাতারে থেকে ছাত্রলীগের পতাকা নিয়ে মিছিল করে সে কি করে অন্ধকারের জগতে পা বাড়ায়?

তার আগে ৫ জানুয়ারি গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া দাওয়াতেও তিনি সামনের কাতারেই ছিলেন?

২০১৭ সালের ১৮ নভেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেবের সাথেও তো তাকে হাসিমুখেই দেখা গেল। সেই হাসি কি করে হিংস্রতায়রুপ নেয়?

সেই বছরের ১৯ নভেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিকে ফুল দেয়ার সময়ও তিনি সামনেই ছিলেন।

একি বছরের ২৭ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের কাছ থেকে পুরস্কার নেয়ার সময়ত হাস্যজ্জ্বল দেখা গেল তাকে।

এখন ফিরে যাচ্ছি ২০১০ সালে ২৩ শে মে ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানে মূল অভিযোগটি ছিল যৌন হয়রানী। ছাত্রীদের একটি অংশকে দীর্ঘদিন ধরেই জোরপূর্বক ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের বাসায় নেয়া ছাড়াও রাজধানীর কাকরাইল, গুলিস্তান, এলিফেন্ট রোড, মালিবাগ, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, মীরপুরের আবাসিক হোটেলগুলোতে সংগঠনের জুনিয়র কর্মী ছাড়াও প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদের বাধ্য করে নিয়ে যাওয়া হতো।

এমন অন্যায়ের প্রতিবাদে এক সময় ছাত্রীরা ফুসে উঠে শুরু হয় আন্দোলন। তখন এক পক্ষ অপর পক্ষকে হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত করে। কোন কোন ছাত্রীর চুল ধরে টানা-হেচড়া করা হয়। এতে ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছিল।

ছাত্র-ছাত্রীরা কেন একে অপরের গায়ে হাত দিবে। কেন অন্যের পোশাক খুলে নিবে? ঢাবির এই হিংস্রতা কি শিক্ষা দিচ্ছে জাতিকে? ঢাবিতে পড়াশোনা বদলে হিংস্রতা শিখানো হচ্ছে? যে বিদ্যাপীঠটির সাথে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের মত তিনটি দেশ সৃষ্টির ইতিহাস জড়িত সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জাতিকে কি শিখাচ্ছেন।

গণমাধ্যমগুলোতে একচেটিয়া ছাত্রলীগের সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু সর্বপ্রথম হামলাটি বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছ থেকেই শুরু হয়েছিল এটি অার আলোচিত হচ্ছে না। কারণ বাম সংগঠনগুলো সব সময় ফাঁদ পেতে চলে। তারা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে অনেক কিছুই করে থাকে।

আমি যখন ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলনটি পরিচালনা করেছি তখন তাদেরকে খুব কাছ থেকে দেখিছি। এরা থাকে সুযোগের অপেক্ষায়। যখন সুযোগ আসে তখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করতে মোটেই সময় নেয় না।

ঢাবির এই আন্দোলনে বামরা ফাঁদ পেতেছে আর ছাত্রলীগ সেই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের ক্ষতির সম্মুখিন করেছে। কারণ কোনকালেই বামদের কার্যক্রম প্রশ্নের উর্ধ্বে ছিল না। নিজেদের হাইলাইট করতে যা খুশি তাই করে তারা।

কিছু ছবি পেলাম যেখানে দেখা যাচ্ছে শ্রাবণী শায়লাসহ অসংখ্য ছাত্রী আহত হয়েছে বামদের আক্রমণে। এদের কথাও তো গণমাধ্যমকে বলতে হবে।

আর পুরুষরাই বা কেন নারীদের গায়ে হাত দিবেন? এসব বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। নারীকে নম্রতার প্রতীক হিসেবেই মূল্যায়ন করা হয় তারা প্রতিবাদ করবে অন্যায়ের তবে নিজেই অন্যায় করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

শ্রাবণী শায়লারা নিজেদের সম্মান যেমন বাঁচাবেন তেমনি অন্যদের অসম্মান করা থেকে বিরত থাকবেন। একজন নারী আমাদের মা, বোন, সন্তান বা স্ত্রী যাই হোক না কেন অন্যকে আঘাত করা থেকে বিরত থাকবেন। যে অন্যায় ঢাবিতে হয়ে গেল তার সুষ্ঠু বিচার হওয়া প্রয়োজন।

কমেন্টস