বিচারপতির পদত্যাগ নিয়ে রাষ্ট্রের একটা আবর্তন এবং নানা প্রশ্ন

প্রকাশঃ নভেম্বর ১১, ২০১৭

আবু ওবায়দা টিপু-

কাল রাতেই ঘটলো ঘটনাটা। নিউজ রুমে কর্মরত তখন আমি। টেলিভিশন মিডিয়ার চাকরির সুবাদে স্ক্রলটা দিলাম নিজ হাতেই। আইনমন্ত্রীকে কোড করেই লিখলাম ‘প্রধান বিচারপতি ছুটি বাড়ানোর আবেদন করেননি, কাল থেকে অনুপস্থিত বলে গণ্য হবেন, দায়িত্বে থাকবেন আবদুল ওয়াহাব মিঞা’ই’। রাত সাড়ে ১২ টার টপ টেন নিউজেও ফাস্ট টপের জায়গা করে নিলো এ খবরই।

রোস্টারের কল্যাণে নিউজরুমে আজ ডিউটি সকাল থেকেই। টেলিভিশন মিডিয়াতে স্ক্রল বিষয়টি আমাকে চমকিত করে বেশ। মনে হয় তাৎক্ষণিক ঘটনা দর্শকের নজরে আনতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু শুধুই কি চমকে পড়েন দর্শক! স্ক্রলদাতাও কি পড়েন না চমকে! পড়েনইতো।

তথ্য পেলাম, রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। যদিও নিশ্চিত হওয়া গেল না সে পত্র আদৌ রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছেছে কিনা। তাই শব্দের সামাল রেখেই স্ক্রল চালালাম, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা’। পেলাম চমকও।

খানিক বাদেই চমক মিললো আরো।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খবর এলো। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা পদত্যাগ করেছেন কিনা নিশ্চিত নন বলে জানালেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এদিকে তাঁর পদত্যাগপত্র এখনো রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছায়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে সময় আর সময়ের ঘটনার আবর্তনে, ঘটনার রাজনীতিকীকরণের আবর্তে ঘুরপাক খেতে শুরু করে ভাষা।

ভাষা রাজনীতিকীকরণের ঘুরপাকে কার ক্ষতি কতটা আর লাভই বা কতটা তা না জেনেও বলা যায় তথ্যের এমন অবাধ বাধ্যবাধকতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বোধ।

ব্যক্তিবোধের হাত ধরেই বিকাশ ঘটে রাজনীতির। আর সেই রাজনীতিবিদরা কখনো কখনো অতি রাজনীতির আবর্তে ফেলে দেন আমাদের। সূত্রপাত ঘটে ছন্দপতনের। সে ঘটনার ভবিতব্যতা সম্পর্কে কতটা চিন্তাশীল থাকেন তারা (?)-সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

এটাও প্রশ্ন ওঠতে পারে রাষ্ট্র্রের সব থেকে বড় যন্ত্রটির নাম কি? বলা যেতেই পারে, রাষ্ট্রই রাষ্ট্রের সব থেকে বড় যন্ত্রের নাম। তবে পরম্পরায় প্রশ্ন অাসতেই পারে এ যন্ত্রের চালিকায় সব চেয়ে বড় সহায়ক শক্তি কে? পুঁথির পাতায় যাই থাক না কেন এটা বলার অপেক্ষা রাখেই না যে, যুগে যুগে এ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত রাজনীতি। আজকের বাংলাদেশেও এর ব্যত্যয় নেই এতটুকু।

নানাদলের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে রাজনীতি-গণতন্ত্রের কাম্য এটাই। আর রাজনীতির খেলায় দলগুলো সু-কৌশল আর সু-নীতি দেখাবে এমন প্রত্যাশাই থাকে জনতার। আশা থাকে, রাষ্ট্র আর জনগণের জন্য কাজ করে এসব দলগুলোই গড়ে তুলবে জাতির ভাগ্য।

কিন্তু জাতির ভাগ্য গঠনে নিজ নিজ অবস্থানে কতটা কৌশলী দলগুলো? প্রশ্ন ওঠতে পারে সে বিষয়েও। আরো প্রশ্ন উঠতেই পারে, কৌশল মানেই নোংরা রাজনীতি? তথ্যের যথাযথ প্রবাহ রোধ করা?

যথাযথ স্থানে যথাযথ ব্যক্তির হাতে বিচারপতির পদত্যাগপত্র পৌঁছালে জাতি জানতেই পারবে, তাই এ ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করার কোন মানে হয় না-এভাবেই বলতে পারতেন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ওবায়দুল কাদের । কি এমন কারণ থাকতে পারে, কথা বলার অদ্ভুত কৌশলাবলম্বনে। হয়তো অভ্যেস।

যাক দিনের আধাবেলা গুঞ্জরন শেষে রাষ্ট্রপতির তথ্য সচিব ইতি টানলেন বিচারপতি নাটকের। ঘোষণা দিলেন পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। তবে, জনাব তথ্য জন্মদাতারা দিনের আধা বেলা কেন উদ্বিগ্ন রাখলেন ব্যক্তি আমাদের?

এবার আমিও স্ক্রল বারে চালিযে দিলাম, ‘এস কে সিনহার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি, নিশ্চিত করেছেন তাঁর প্রেস সচিব, বঙ্গভবনে যাচ্ছেন আইনমন্ত্রী ’।
এতো গেল শুধু আজকের দিনের বিচারপতি বিষয়ক ঘটনা প্রবাহের প্রকাশ ধারাবাহিকতার গল্প। কিন্তু প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ বিষয় বৈচিত্রে বাঙালি কতটা ঢুকেছে গভীরতায়? কতটা মোচড় খেয়েছে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম মনন? প্রকাশই বা কি তার?

এমন প্রশ্নও যেন কম নয়।

বিষয়টিকে ক্ষমতাসীনের এক তরফা সিদ্ধান্ত যে নয়, এমন কথা কি আদৌ মেনে নিতে পেরেছে দেশের জনগণ। বিচারপতি অপসারণের নিয়ম আছে সংবিধানে। ক্ষমতাসীনরা বলতেই পারেন অপসারণের প্রশ্নইতো নেই এখানে, বরং প্রতিভাত পদত্যাগ।

বাংলাদেশে কোর্ট চত্বরে বিভিন্ন মামলায় দু’পক্ষের কোন না কোন পক্ষের মামলা সাজানোর একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়। অপরপক্ষের কৌশলী মামলার অসারতা প্রমাণ করেই মামলার সত্যতা বের করে আনেন। কিন্তু বিচারপতির পদত্যাগের মত এসব ঘটনার সত্য কথন বের করবে কে?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে যে দলগুলো থাকে তাদের ভূমিকা অনেক। দেশের একমাত্র বড় দলটিই হলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ‘বিএনপি’। তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠে জনমনে। দলটির সঠিক কৌশল নির্ধারণ আর তার প্রয়োগই পারতো বিচারপতি নাটকের যথার্থতা উন্মোচন করতে। কিন্তু শেষ মেশ ব্যর্থই বলা যাবে দলটিকে। বড় এ দলটি বরাবরই বলে আসছে, ষড়যন্ত্রমূলক তাদের কোণঠাসা করে রেখেছে সরকার। আসলে সত্যিকারভাবে কোন রাজনৈতিক কৌশল তৈরি করতে পারে নি দলটি। অন্যভাবে রাজনীতির নামে বিগত দিনের সহিংসতার দায়ও কাঁধে চেপেছে দলটির।

শেষ মেশ বঙ্গভবন ঘুরে এসে সংবাদ সম্মেলন করলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানালেন সংবিধানের ৯৭ ধারার কথা। সেই সাথে শেষ হলো দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকা বিচারপতি নাটকের। আর জন্ম দিয়ে গেল নানা প্রশ্নের।

রেখে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর হয়তো জনমন খুঁজে নিচ্ছে নিজের মত করেই। অথবা এসবের সঠিক উত্তর দিতে যথার্থ ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকেই। আর যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী, সময়ই বলে দেবে সঠিকতা।

লেখক: সাংবাদিক

কমেন্টস