আন্দার মানিকে আলো, জ্বালিয়ে রাখার আনুরোধ প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে!

প্রকাশঃ অক্টোবর ৩০, ২০১৭

‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয়, এখানে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়। এখানে জ্ঞানের আলোর মশাল জ্বেলে হয়রে সূর্যদয়’- আন্দার মানিক গ্রামে প্রত্যাহ প্রকৃতির সূর্যদয় হয় ঠিকই, কিন্তু জ্ঞানের আলোর সূর্য উঠে মাত্র এক জায়গায়। সেই জায়গাটির নাম ‘আন্দার মানিক এ জামান বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এক সময়ে নদীর গর্ভে দীর্ঘযুগ তলিয়ে থাকার পর জেগে উঠা ভূতুড়ে চরের নাম ‘আন্দার মানিক গ্রাম’।

গতমাসের শেষ সপ্তাহের কোন এক সাকালে আমি স্কুলটি আবিষ্কার করি পায়ে হেঁটে। যেখানে একটি মোটরসাইকেল যাওয়ার ব্যবস্থা নেই সেখানে কচিকাচা ভরপুর এমন একটি স্কুল সত্যি ভাবনার বিষয়। বিদ্যালয়ের চারপাশে বিস্তর ধানক্ষেত। মাঝে মাঝে ফাঁক ফাঁক দূরুত্বে বসতবাড়ি। একটু উৎসাহী হয়ে কথা বলি এলাকাবাসী ও বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের সাথে।

অনেক বড় এই গ্রামে এখনো নেই বিদ্যুত, নেই কোন হাটবাজার কিংবা ভালো যাতায়ত ব্যবস্থা। কৃষি নির্ভর এই গ্রামের মানুষ এখনো সরকারি সাস্থসেবা থেকে বঞ্চিত। তবুও এই আন্দার মানিকে আলো জ্বালানোর নিরন্তর চেষ্টা করা হচ্ছে ১৯৯১ সাল থেকে এই একটি বিদ্যালয়ে। আন্দার মানিকের একমাত্র নিভু নিভু আলোটি এখনো জ্বলে আছে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই। দ্রুত জাতয়ীকরণ না হলে যেকোন সময় এই আলোটিও নিভে যেতে পারে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে স্কুলটির কার্যক্রম। তাই এলাকাবাসির অনুরোধ প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর নিকট তাঁরা যেন আন্দারমানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণ করেন।

এই উদ্যোগের সষ্ট্রা আন্দার মানিক গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার জন্যে যে কৃষক জমি দান করেছেন, তার নামেই বিদ্যালয়টির নামাকরণ করা হয়েছে আক্তারুজামান বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে তিনশত। শিক্ষক আছেন ৫ জন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিদ্যালয়টিতে চারকক্ষ বিশিষ্ট টিনের ভবন করা হলেও আজ পর্যন্ত মেলেনি সরকারি কোন বরাদ্ধ। বিভিন্ন উদ্যোগে নামে মাত্র শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা পান না কোন উপবৃত্তি। তবুও তারা ক্লান্ত নন পাঠদান ও গ্রহনে। অথচ জাতীয়করণভুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক মাসের পর মাস না গিয়েও ভোগ করেন সরকারি সুযোগ সুবিধা। বিভিন্ন পত্রিকার এই সব নিউজ এই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আক্ষেপ আরো বাড়িয়ে দেয়। বছর যায় কিন্তু তাদের ভাগ্য বদলায় না। তাই তাদের এই আক্ষেপের এখন একটাই সমাধান, তা হলো বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণ করা।

লক্ষীপুর জেলার ১৯ নং তেয়ারীগঞ্জ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম আন্দার মানিকে এই স্কুলটি অবস্থিত। প্রত্যন্ত গ্রামে বিদ্যালয়টি অবস্থিত হওয়ায় এখনো আর্শীবাদ বঞ্চিত সরকারের দৃষ্টি থেকে। বার বার জাতীয়করণের সুপারিশ ও চেষ্টা করেও ব্যর্থ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবুও আলো জা¡লিয়ে রেখেছেন গ্রামবাসি। তাদের আশা বিদ্যালয়টি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টিতে একদিন ঠিকই পড়বে। তারাই উদ্যোগ নেবেন বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করার।

বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্যে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সব শর্ত ও প্রস্তুতি অনেক আগেই সম্পন্ন করলেও অপেক্ষা যেন ফুরায় না।লক্ষীপুর জেলা শিক্ষা অফিস, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসক, সংসদ সদস্যের তদন্তের একাধিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়া এই বিদ্যালয়টি ১৫/০১/৯৮ ইং তারিখে স্মারক নং ২৯ রেজি:/৯৩/২৩৭/১০ এর মূলে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসাবে চালু ও পাঠদানের অনুমতি লাভ করে। মাঝখানে কিছুদিন পাঠদান বন্ধ থাকলেও ২০১০ সালের পর থেকে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে বিদ্যালয়টিতে। বিদ্যালয়টির নামে সরকারি বিধি মোতাবেক ৫০ শতাংশ জমির বাংলাদেশ শিক্ষা সচিবের নামে ছাপ কবলা দলিল রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব-৭৩৩২ চালু আছে। কেউ চাইলে এই হিসাবে সহযোগিতা করতে পারেন।

২০১২ সালের পর থেকে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে আসছে। তবে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের জন্যে এখন পর্যন্ত কোন উপবৃত্তি ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। ফলে সরকারের অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা কার্যক্রম থেকেও বঞ্চিত এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে লক্ষীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শাহজাহান কামাল প্রাথমিক ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিদ্যালয়টি জাজীয়করণের জন্যে সুপারিশ করেন। ২০১৫ সালের ২৩ আগষ্ট সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের জন্যে জেলা যাচাই বাচাই কমিটির কাছে সুপারিশ করা হয়। জেলা যাচাই বাচাই কমিটি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্যে সুপারিশ করলে ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিদ্যালয়টির নামে একটি সুপারিশ প্রেরণ করেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল আজিজ।

২০১৫ সালে ল²ীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা উপসচিব নুজহাত ইয়াসমিন সাক্ষরিত আরো একটি চিঠিতে ২০১৩ সালের প্রকাশিত বিজ্ঞাপন অনুযায়ী আন্দার মানিক এ জামান বিদ্যালয়কে জাতীয় করণের জন্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সচিব মহোদয়ের নিকট সুপারিশ করা হয়েছে।

কিন্তু সুপারিশের প্রায় ৪ বছর পরেও বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়নি। অপেক্ষা যেন আরো দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পাঠদান দেওয়া শিক্ষক ও এলাকাবাসীর আপেক্ষ সরকার অনেক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করলেও তাদের বিদ্যালয় এখনো জাতীয়করণ করেননি। কিন্তু কেন বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হচ্ছে না তার সঠিক কোন জবাব ল²ীপুর শিক্ষা অফিস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দিতে পারেন না। তাই এলাকাবাসীর বিশ্বাস, এই জটিলতার সমাধান কেবল প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীই দিতে পারবেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের অনুরোধ প্রধানমন্ত্রী যেন বিদ্যালয়টি দ্রুত জাতীয়করণ করার উদ্যোগ নেন।

লেখক-

আরিফ চৌধুরী শুভ

কমেন্টস