পারভীনের ফুটপাতে সন্তান প্রসব ও সুবোধ তুই পালিয়ে যা!

প্রকাশঃ অক্টোবর ২১, ২০১৭

আরিফ চৌধুরী শুভ-

সত্যি দুঃখ হয় যখন এমন সংবাদ পড়ি ও দেখি। আরো দুঃখ হয় যখন ভাবি এটা মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে কেনা এই স্বাধীন বাংলাদেশেরই খবর। তিন হাসপাতাল (ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, আজিমপুর মাতৃসনদ) ঘুরে দরিদ্র প্রসূতির রাস্তায় সন্তান প্রসব। আয়াদের মাত্র ১৫ টাকা ঘুষ ও চিকিৎসককে ১০০০ টাকা চিকিৎসা খরচ দিতে না পারায় প্রসূতির ভাগ্যে জোটেনি হাসপাতালের নরম বিছানা ও ডাক্তারের কোমল হাতের স্পর্শ। অথচ এই সকল হাসপাতালে পারভীনরা বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাওয়ার কথা। একটা নয় দুটো নয়, তিনটা হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে রাস্তায় সন্তান জন্ম দিল পারভীন নামের এক প্রসূতি মা। নকুল কুমার কি এজন্যই গেয়েছেন তার ব্যঙ্গাত্বক অমর গানখানি, ‘ও ডাক্তার’?

আদালত এখন সংবাদ মাধ্যমের সূত্র ধরে এমন ঘটনার ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন হাসপাতালগুলোর কাছে। কি ব্যাখ্যা দিবেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা আমার লেখার বিষয় নয়, কিন্তু যে শিশুটি বিনাচিকিৎসায় বিদায় নিল পৃথিবী থেকে, যে মা প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছিল রাস্তায় পড়ে, সে মায়ের কাছে এই চিকিৎসকদের নিষ্ঠুরতার ক্ষমা কীভাবে চাইবো আমরা? তোমরা আমাদের ক্ষমা করো। আমরা এই বাংলাদেশকে এখনো তোমাদের স্বপ্নের মতো বাসযোগ্য করে তুলতে পারিনি। সত্যি এই বাংলাদেশ আমি দেখতে চাইনি। এই পৃথিবী এখনো তোমাদের জন্যে প্রস্তুত না। পারলে আমাদের ক্ষমা করো মা।

দেশের ৯৯% হাসপাতালের বাস্তবচিত্রের সহস্রাংশের বিন্দুমাত্র নমুনা এটি। এ জন্যই হাসপাতাল আমাদের কাছে সেফহোম না হয়ে কসাইখানা হয়েছে। আদালত কি পারবে ৯৯% কসাইখানার এমন অবস্থার ব্যাখ্যা জানতে? জেনেই বা হবে কি? এ যেন নিত্য করা সরল সুদকষার অংক।

যে হাসপাতালগুলো এমন নিষ্ঠুর ঘটনার জন্ম দিল সেগুলো প্রত্যেকটিই সরকারি হাসপাতাল। যে হাসপাতালের সামনে পারভীন আক্তার সন্তান প্রসব করেছেন, সে হাসপাতাল শুধু বিনা পয়সায় প্রসূতিদের সেবা দেওয়ার জন্যেই তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পারভীনের ভাগ্যে ঘটেছে বিপরীত। এই দৃশ্য এই সমাজে হাজারো পারভীনের। সরকারি হাসপাতালের এই প্রতিযোগিতা অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালেও। এই চিত্র দেশের চিকিৎসকদের ও সামগ্রিক চিকিৎসা সেবার। ব্যতিক্রমতার সংখ্যা হাতেগোনা। ব্যতিক্রমকে দিয়ে বড়জোর উদাহরণ দেওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবতার সাথে তুলনা করা যায় না। আমরা বাস্তবতার মুখোমুখি সত্য খুঁজি। রাষ্ট্র প্রধানদের সামান্য হাঁচি হলেই তারা যান মাউন্টেন্ট, মাদ্রাজে, উত্তরে, কিন্তু পারভীনরা যান ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, বঙ্গবন্ধুতে কিংবা অাজিমপুর মাতৃসেবায়। পারভীনদের পকেট থাকে না। টাকাও থাকে না। তাই পারভীনদের সন্তান জন্ম হয় রাস্তায়। পারভীনরা মা হতে হতেই হন সন্তানহারা। এটাই পারভীনদের ভাগ্য। আজ এটাই পারভীনদের চোখে বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রের এমন চিত্র পারভীনদের শুধু অবাক করে না। মানবতার যে মৃত্যু হয়েছে সেটাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। রাস্তায় প্রসব যন্ত্রণায় ছটপট করলেও মাতৃসনদ হাসপাতালের পরিচালক একজন নারী হয়েও এগিয়ে এলেন না। সিসি ক্যামেরায় সবই তিনি বসে বসে দেখছেন তার অফিসে। পাশে দায়িত্বরত পুলিশের একজন এসআইও ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস পারভীনের প্রসব যন্ত্রণায় যারা এগিয়ে এসেছেন তারাও পারভীনের মতোই। রাষ্ট্রের উপর তলাদের চোখ সব সময় উপরেই তাকায়। পারভীনরা পথের ধুলোর মতোই পড়ে থাকে তাদের পায়ের পথে। পারভীনদের প্রসব যন্ত্রণা আজ রাষ্ট্রের নিজের। নানাবিধি সমস্যায় রাষ্ট্র আজ প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। জানি না কবে খালাস হয় রাষ্ট্রের প্রসব যন্ত্রণা। প্রতিপক্ষ নির্মূলে যে রাষ্ট্র ব্যস্ত সবসময়, সে রাষ্ট্রে পারভীনদের সন্তান বেঁচে থেকে লাভ কি। তাই মরে যাওয়াটাই রাষ্ট্রের জন্যে যেমন সুবিধে তেমনি পারভীনদের জন্যেও আশীর্বাদ।

যে শিশুটি স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখবে বলে পারভীনদের গর্ভে আসে, তাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখার বদলে ঠেলে দিই ফুটপাতে। আমাদের চোখ যায় পারভীনদের পকেটে, পেটে নয়। পারভীনরা আমাদের কাছে হয়তো মানুষ, কিন্তু তাদের মানুষ নামের পদবীর চেয়ে বড় পরিচয় তারা গরিব। এ নামেই রাষ্ট্র তাদের লিখে দেয় অলিখিত ভাগ্য। যে মেডিকেলে পারভীনদের জন্যে তৈরি হয়েও তাদের স্থান হয় ফুটপাতে, সে মেডিকেলে গরিবদের চিকিৎসা বাবদ রাষ্ট্রের ভুতুর্কি যায় কোথায়? এই প্রশ্ন আমার। এই প্রশ্ন আজ পারভীনদের। গরিবরা প্রশ্ন করতে পারে না বলেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন কেন? তারা নিজ দেশেই নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন কেন? যারা বঞ্চিত করেছে তাদের উপযুক্ত বিচার হওয়া উচিত।

বাঁচার আকুতি করতে করতে মরে যায় পারভীনদের স্বপ্ন। তাই পারভীনদের কথা বলে দেয়ালের গ্রাফিতি ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’, তোর ভাগ্যে কিছু নেই। পারভীনদের ঘটনায় রাষ্ট্রকি সত্যি প্রমাণ করলো এবার সুবোধের ভাগ্যে কিছু নেই। পারভীনদের ভাগ্য বলে কিছু নেই।

কদিন আগেই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দিল। পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া বহু অস্বচ্ছল হবু ডাক্তারের স্বপ্ন পূরণের জন্যে সাহায্য চেয়ে আবেদন চোখে পড়লো। এটা স্বাভাবিক। এটা আমি নিজের ক্ষেত্রে আবেদন করিনি বলে আমি ডাক্তার হতে পারিনি। কিন্তু নিজেকে সান্ত্বনা দেই এই বলে, আমিওতো তাদের মতো যোগ্য ছিলাম। আজ এমন ডাক্তাদের মানসিকতা দেখলে নিজে ডাক্তার হতে না পারাটাকে দুঃখ মনে করি না। স্বচ্ছলদের অনুরোধ জানাই হবু ডাক্তারদের পাশে দাঁড়ান। তাদের ডাক্তার হতে দিন। কিন্তু মনের কোণে অপ্রিয় প্রশ্নটি প্রথমে নিজেকেই করলাম, এরাও কি ডাক্তার হয়ে টাকার জন্যে মুখ ফিরিয়ে নেবে পারভীনদের থেকে?

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উচিত ছিল তাদের পেশার প্রতি সম্মান জানিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ করা। কিন্তু কোথাও তাদের একটু দুঃখ করতে দেখিনি। এমন হাজারো ঘটনার উদাহরণে বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার্থী কিংবা ডাক্তাররা অন্তত একটি উদাহরণও দেখাতে পারেনি আজ পর্যন্ত। অন্যের জন্যে শুধু ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করলেই মানবতা দেখানো হয় না। প্রশ্নো ফাঁসের প্রতিবাদে সোচ্চার যে হবু ডাক্তার, এমন ঘটনার প্রতিবাদী না হওয়ায় কর্মজীবনে তার আদর্শ ও নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। সত্যি প্রশ্নবিদ্ধ। তারা রাস্তায় নামে ইন্টার্ন ভাতা বাড়ানোর দাবিতে, তারা রাস্তায় নামে বিশেষ কোটা চালুর দাবিতে, ডিগ্রি পোক্ত করার দাবিতে, তারা রাস্তায় নামে চাকুরি জাতীয়করণের দাবিতে, কিন্তু তারা কখনো রাস্তায় নামে না পারভীনদের হাসপাতালে কেন জায়গা হয় না, কেন তারা ফুটপাতে সন্তান প্রসব করে, তার প্রতিবাদে। এই প্রশ্ন আমাদের অশ্রুসিক্ত করলেও তাদের নৈতিকতাকে নাড়া দিয়েছে বলে মনে হয় না। আমরা মিয়ানমার ফেরত রোহিঙ্গাদের চিকিৎসায় মানবিক হলেও নিজ দেশে হাজারো পারভীনদের ফুটপাতে সন্তান জন্ম দিতে দেখেও নিশ্চুপ। আমরা বেঁচে থাকি, কিন্তু মরে যায় আমাদের আদর্শ। আমরা বেঁচে আছি জীবন্ত মানব লাশ হয়ে। দুঃখ দুঃখ দুঃখ।

২.

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২ অক্টোবরের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভর্তিইচ্ছুক আগত পরীক্ষার্থীকে রাজশাহীর বড়ভাইদের মেসে থাকতে দৈনিক গুনতে হবে ১০০ টাকা। পুলিশ প্রসাশন ও মেস মালিকদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটা একটা হটকারী সিদ্ধান্ত। পরীক্ষার্থীদের সহযোগিতার বদলে তাদের কাছে চাঁদা দাবি করা কতটুকু মানবিক প্রশ্ন রইল। রাজশাহীর হোটেলগুলো আগে থেকেই কয়েকগুণ ভাড়া বাড়িয়ে দিল পরীক্ষার্থীরা আসবে বলে। ঝোঁপের মুখে তারা ঠিক মতো কোপ মেরেছেন। কে মরলো কে বাঁচলো এটা তাদের দেখার বিষয় নয়। এই পরীক্ষায় পারভীনদের সন্তানরাও যে পরীক্ষা দিবে তার চিন্তা তারা একবারও করেন নাই।

মধ্যম আয়ের এই দেশে উচ্চশিক্ষা শুধু স্বপ্নই নয়, দিনকে দিন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই যেখানে আমরা উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখাবো শিক্ষার্থীদের, সেখানে শুরুতেই একজন পরীক্ষার্থীকে স্বাগত জানানো হচ্ছে ১০০ টাকায় থাকতে দেওয়ার বিনিময়ে। তাও আবার বড় ভাইয়ের মেসে। আমার ছোট ভাইটিও আমার মেসে থেকে পরীক্ষা দিতে হলে আমাকে ১০০ টাকা বাড়তি দিতে হবে। এলাকার ছোটভাই আর আমার সাহায্য নিবে না পরীক্ষা দিতে এসে। আমি তাদের চোখে বনে গেলাম স্বার্থপর।

বাহ! কি উন্নত মানসিকতা আমাদের। জন্ম থেকে মৃত্যু, মস্তিষ্কে শুধু টাকা আর টাকার ধান্দা। পঁচে গেছে আমাদের বিবেক। মরে গেছে রাষ্ট্র মস্তিষ্ক। আমরা বেঁচে আছি বিবেকহীন শোষকের মাঝে। এরা রাষ্ট্রকে স্বার্থপর বানায় আমাদের চোখে। আগামীর চোখে। এরা অঙ্কুরেই আমাদের শোষণ করতে চায়। এদের হাতে জিম্মি জীবন। জিম্মি শিক্ষাব্যবস্থা। বাদ নেই রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটিও। মুক্তি কি মিলবে?

২০১৫-১৬ অর্থবছরে এদের ভ্রুণ থেকেই বেরিয়েছে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় সাড়ে ৭ শতাংশ কর বসানোর সিদ্ধান্ত। আমি আওয়াজ তুলেছি প্রথমে। এ আওয়াজ উচ্চারিত হয়েছে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কণ্ঠে। আমরা শিক্ষাঙ্গণে অবরোধ ডেকে প্রতিহত করেছি সে অন্যায়। উচ্চশিক্ষা মুক্ত হলো কর নামক অভিশাপ থেকে। কিন্তু আজও মুক্তি মিলেনি উচ্চশিক্ষার মান, আমাদের মন ও মননের। এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে আশাবাদী হবো আমরা। কিভাবে আশাবাদী হবে পারভীনদের সন্তানরা। এদের হাতে আমাদের আরো মার খেতেই হবে। এদের হাতে মানুষকে মার খেতেই হবে।

তাই গ্রাফিতির লেখা ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নাই’। কিন্তু সুবোধ কেনই বা পালাবে, কে তাকে দৌড়ায় কিংবা কতদিন সে পালিয়ে বাঁচবে এসবের অদৃশ্য চিত্র আমরা পরাবাস্তবে অনুভব করলেও পারভীনের রাস্তায় সন্তান প্রসব করা, হাসপাতাল থেকে টাকা না থাকায় বের করে দেওয়া, পরীক্ষা দিতে আসা পরীক্ষার্থীদের থেকে ১০০ টাকা চাঁদা ধরার ঘটনায় সুবোধ গ্রাফিতির সত্যতা ও পালানোর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। সত্যি সময় সুবোধের পক্ষে না। কিন্তু পালাতে পালাতে সুবোধ হয়তো এতদিনে পৌঁছে গেছে কাঁটাতারের কাছে। তার সামনে কাঁটাতার আর পিছনে সীমান্ত পিলারের ওয়াল। চারপাশে শোষকশ্রেণির নখদ বসানো থাবা। এবার কি সুবোধ ঘুরে দাঁড়াবে? দাঁড়াতে কি পারবে?

সুবোধ কি সাহস করে বলবে শিক্ষা অধিকারের কথা। সুবোধ কি উচ্চস্বরে দাবি জানাবে পারভীনদের রাস্তায় সন্তান প্রসবের বেদনার কথা। রাষ্ট্রের প্রসব যন্ত্রণার মুক্তির কথা। সুবোধ কি দেখাবে হতাশাগ্রস্থ লাখ লাখ বেকার তরুণদের স্বপ্ন পূরণের কথা। কে এই সুবোধ? তা ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সেটির সুফল জনগণের দরজায় কে পৌঁছে দিবে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন
তারিখঃ ২০/১০/২০১৭, ঢাকা

কমেন্টস