গুরু দক্ষিণা দেয়ার মত কিছু নেই!

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৭, ২০১৭

খাইরুল ইসলাম বাশার-

শিক্ষক! ছোটবেলায় আমার বড় বোনের শিক্ষক ছিলেন কামাল স্যার । আমি ছোট ছিলাম তাই তার ঘাড়ে উঠতাম। আম্মু -আব্বু বকা দিলেও স্যার তেমন  কিছু বলতেন না, বেশ আদরই করতো। এই হল তখনকার অনুভূতি। আর যখন স্কুলে যাওয়া শুরু হল তখন দুষ্টামির কারণে মাঝে মধ্যে মার খেতাম তখন শিক্ষক মানেই  ভয় শিক্ষক মানেই আতঙ্ক। 

স্কুলের শেষের দিকে এসে শিক্ষক মানে বন্ধু হওয়া যায় এই অভিজ্ঞতা অর্জন করি বাংলার শিক্ষক সুজিত সরকার আর জহির ভাই এর কাছ থেকে। তবে কলেজে ঠিকমত ক্লাশ করতাম না । যার ফলে তেমন গভীর সম্পর্ক হয়ে উঠেনি তবে তাও মন্দ ছিল না। জাহাঙ্গীর স্যারের কথা বলতেই হয়। এর বাইরেও হারুন স্যার । সব মিলিয়ে ‘আমার যে চরিত্র তাতে আমি শিক্ষকবান্ধব ছিলাম না’।

পড়ালেখার যে অবস্থা সেই সময়ে হয়েছে তা শোচনীয় ছিল। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার জন্য সবার পিছনের যাত্রী ছিলাম । তবে উল্লেখ্য সবসময় আমি মাঝারি মানের চেয়েও বাইরে অবস্থান করতাম। সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল তাই ভর্তি হলাম স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। সদ্য জন্ম নেয়া একটি  বিভাগ। সেই বিভাগটির পিতা হিসেবে ছিল ‘সজীব সরকার’ ।

অর্থাৎ সন্তানকে পিতা যে মমতায় আগলে রাখে ঠিক তেমনি  সব কিছুতে তার ভালোবাসা ছিল দৃশ্যমান। আজ ১৭  অক্টোবর । আমার কাছে যিনি ‘মানবের চেয়ে মহান আর অসাধারণদের ভিড়ে অনেক সাধারণ’। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে বুঝলাম শিক্ষক শুধু পিতা নয় , বড় ভাই , বন্ধুবর অথবা তার চেয়ে আরও বেশি আত্মিক সম্পর্ক হতে পারে সেই অভিজ্ঞতার জন্ম যিনি আমার জীবনে এনে দিয়েছেন তিনি সজীব সরকার।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধু সাকিরকে বলেছিলাম সজীব স্যার হচ্ছে গুরু । তারপর আমি জনসম্মুখে বলতে লজ্জা  পেলেও সাকির সেই প্রথম বর্ষ থেকেই বলে আসলো বাশারের গুরু হচ্ছে সজীব সরকার। তারপর দিন গেল তাকে গুরু ডাকার সংখ্যা বাড়তে লাগলো। তার সাথে যে পথচলা তা এক লেখায় কিংবা এক রাতে বলা সম্ভব না।

একটি ঘটনা উল্লেখ করা উচিত মনে হচ্ছে। তার চিন্তা কোথায় আর আমরা কই ? স্যার একদিন জিজ্ঞেস করল হাতে কাজ অথবা ক্লাশ না থাকলে চলেন ময়মনসিংহ থেকে ঘুরে আসি। তারপর শুরু হল যাত্রা আমি চিন্তা করতে পারেনি আমি শিক্ষক এর সাথে আছি। মনে হয়েছে আমার পরিবারের আপন কেউ যার সাথে সারাজীবন পথচলা যায়।

ময়মনসিংহ আমরা মূলত স্যারের শ্বশুর বাড়িতে গেলাম। তাদের ভালোবাসায় পৃথিবীর যে কোন ব্যক্তি মুগ্ধ হতে বাধ্য। রাতে ঘুমানোর পালা স্যার এক কক্ষে আর আমি অন্য কক্ষে। দুজনেই শুয়ে পড়লাম। বাড়িতে আর সদস্য ছিল দুজন স্যার এর শ্বশুর আর শাশুড়ি । তখনও পুরোপুরি ঘুম আসেনি , একটু পর দেখি আমার শিক্ষক এক গ্লাস পানি হাতে এসে আমার বিছানার পাশে রাখল। আমি লাফ দিয়ে উঠলাম স্যার আপনি কি করলেন! আপনি তো উল্টা কাজ করলেন? আমার যে কাজ করার কথা আপনার জন্য আপনি সেই কাজ করলেন আমার জন্য। তিনি বললেন না, না তা কেন  হবে আপনি তো এখানে নতুন আপনার রাতে যদি পানির প্রয়োজন হয় , তাই আর কি ।

বায়েজিদ বোস্তামি তার মায়ের জন্য পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মায়ের ঘুম ভাঙলে তারপর মাকে পানি পান করাবে। কিন্তু সজীব সরকার তার অধম ছাত্রের কথা মনে করে পানি এনে রাখলেন ।

আসলে কোন বিশেষণে অথবা কোন কথায় কিংবা লেখায় তাকে  প্রকাশ করা যাবে না । তার জন্য শুধু বলতে হয় তুমি রবে নীরবে।  গুরুকে জন্মদিনে দেয়ার মত কিছুই এই  নেইঅধমের ।  ‘হাজারও সালাম তার চরণে যদি কোনদিন সে গ্রহণ করে মোরে’   তার মঙ্গল হোক । পৃথিবীতে এই রকম মানুষ সৃষ্টি হয় পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য। সবশেষে বলি গুরু দক্ষিণা দেয়ার মত কিছু নেই! আর ইতি টানার আগে সেই পুরানো কথা শুভ জন্মদিন গুরু।

কমেন্টস