একজন আবদুল মোনাফের গল্প

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৭

আশরাফুল ইসলাম রবি-

আবদুল মোনাফ একজন রোহিঙ্গা। তবে সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মানুষ। বাংলাদেশে ঢুকেছেন গতকাল সকালে অর্থাৎ শুক্রবার। আমার সাথে যখন দেখা হলো তখন কেমন জানি বিভ্রান্ত আর কিছুক্ষণ পর পর কান্না করছিলেন।
নিজের সব কিছু হারিয়ে, নিজের জন্মভূমি পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন প্রাণ বাঁচাতে।

মিয়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা নিধনে বলি হয়েছেন তার দুই ছেলে সন্তান। একজনকে তার চোখের সামনে গুলি এবং জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। আরেকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যার হদিস তিনি পাননি আর।

ছেলেকে কবর দেয়ার আগে জানাজা পড়ানোর সুযোগ পাননি। কোনমতে মাটি খুড়ে কবরস্থ করে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে।
এক মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এর পর ছোট আরেক মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে।

মিয়ানমারের ভুসিদং এলাকার একটি গ্রামে এই আবদুল মোনাফের বাড়ি। বাড়ি থেকে সীমান্ত পর্যন্ত হেটে আসতে সময় লেগেছে ১২ দিন। দিনে হেটেছেন আর রাতে জঙ্গলে লুকিয়েছিলেন আর্মির ভয়ে। বৃদ্ধ মানুষ তাই হাটতে অনেক কষ্ট হয়েছে। তিনটা বড় পাহাড় পেরিয়ে আসতে হয়। পথে অসংখ্য ঝিরি আর পিচ্ছিল সব পাথরে পরিপূর্ণ। এই পথে আসতে অনেকের হাত-পা ভেঙে যায়।

বাড়িতে ফেলে এসেছেন ১৪ টি গরু আর গোলাভর্তি ধান। আসার সময় সামান্য চাল ছাড়া আর কিছুই আনতে পারেননি। দূর থেকে দেখেছেন মিয়ানমার আর্মির দেয়া আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যাচ্ছে তার অনেক কষ্টে গড়ে তোলা বাড়িটি।
যখন মোনাফ আমার সাথে কথা বলছিলেন তখনও দেখা যাচ্ছিল ঠিক সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার বাহিনীর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া আগুনের লেলিহান শিখা ও কালো ধোয়া।

বৃদ্ধ হওয়াতে প্রাণে মারেনি আর্মিরা কিন্তু বলে দিয়েছে দেশ ছেড়ে চলে যেতে।
আবদুল মোনাফ শুধু একা নয়। এরকম হাজার মোনাফ এখন প্রাণ বাঁচানোর দায়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। নৃশংতার এক চরম বলির শিকার এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এরা বিশ্ব রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝে না। সু চির নোবেল বুঝে না। শুধু চায় নিজভূমে ফিরে যেতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে। কে চাইবে নিজের সব কিছু ছেড়ে অন্যের বোঝা হয়ে থাকতে।
যে লোকের বাড়ি ছিল, গোলা ভর্তি ধান ছিল সে আজ খোলা আকাশের নীচে বা সামান্য পলিথিন দিয়ে তৈরি করা ঘরে বসবাস করছে।

বাংলাদেশে আসা অনেকে আছেন যারা মিয়ানমারে থাকতে অটেল সম্পদের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সব হারিয়ে এখন শুন্য হাতে দিন গুনছেন। লজ্জায় ত্রাণের আশায়ও ছুটে যেতে পারছেন না।

এদের কোন অপরাধ নেই। এদের “রোহিঙ্গা হিসেবে জন্মটাই” সবচেয়ে বড় অপরাধ।
যারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বড় বড় কথা বলছেন তারা নিজেকে আবদুল মোনাফের জায়গায় একটু ভেবে দেখুন। চিন্তা করুন যদি আপনার ছেলেকে বা আপনার পরিবারের কোন সদস্যকে সামনে গুলি এবং জবাই করে হত্যা করা হয় তখন কেমন লাগবে!!!..
ভেবে দেখুন যদি আপনার সবকিছু ছেড়ে অন্য একটি দেশে চলে যেতে বাধ্য করা হয় তাহলে আপনার মানসিক অবস্থাটা কেমন হবে।

১৯৭১ সালে পাকিস্থানীরা আমাদের উপর যেভাবে নৃশংসতা চালিয়েছিল তার কোন অংশে কম নয় রোহিঙ্গাদের উপর চালানো মিয়ানমারের এই নৃশংসতা।
আবদুল মোনাফ চায় শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজ দেশে ফিরে যেতে। তার ভাষায় ” নিজর দেশত নূন দি ভাত হাইলেও ভালা” ( নিজ দেশে লবণ দিয়ে ভাত খেতে পারলেও ভালো)।

জানি না এই আবদুল মোনাফের স্বপ্ন সত্যি হবে কিনা। কিন্তু এটা বলতে পারি যতদিন রোহিঙ্গাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাও সেতুং, মার্টিন লুথার কিংবা মাহাথিরের মত যোগ্য নেতা আসবেন না ততদিন হয়ত এই সপ্ন পূরণ হবে না।

কমেন্টস