পশু কোরবানি করে পশু হয়ে গেলাম!

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৭

বিডি মর্নিং ডেস্ক:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরবানির পশুর মাথা কেটে ছবি তুলে তা পোস্ট করেছেন এক ব্যক্তি। তিনি কুরবানির পশুর মাথাটি হাতে নিয়ে সেলফি পোস্ট করেছেন। এতে জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে তিনি ধর্মীয় বিধানকে হেয় করেছেন। পশুদের প্রতি অমানবিক ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন নবীজি। কুরবানীর পশুদের হাট থেকে ঘরে এনে আমরা খেতে দেই। তাকে গোসল করাই। শিশুরা লবন, ভুষি, ভাতের মাড় বালতিতে ভরে পশুটিকে খেতে দেয়। কাঁঠালের পাতা সংগ্রহ করে বালকরা কুরবানির পশুকে খাওয়ায়। দুই চারদিন ওই পশুকে যত্ন করে কুরবানির পর সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। কারণ পশুটির সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক হয়ে যায়। হৃদ্যতার একটা ব্যাপার হয়ে যায়। আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের জন্যে নিজের প্রিয় পশুটিকে কুবরানি করতে মুসলমানরা যেমন পিছপা হয় না তেমনি পশুটির জন্যে তার মায়া চোখে জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে পোষা পশুকে কুরবানি দিলে অনেকে স্বজন হারানোর বেদনার মত মুষড়ে পড়েন।

এমনকি পশু কুরবানির ক্ষেত্রে যত্নের সঙ্গে তা করার কথা বলা হয়েছে। এমনভাবে পশুটিকে দড়ি দিয়ে বাঁধতে মানা করা হয়েছে যেন তার কষ্ট না হয়। গ্রামে ঈদের দিন পশুদের গোসল করানো ও ভাল খাবার দেওয়া একটা ঐতিহ্য ও রীতি হয়ে আসছে। ইদানিং সেলফি অপসংস্কৃতিতে আমরা তা ভুলে যাচ্ছি। আমাদের দৃষ্টিতে এই বিশ্ব সেরা আবাল তার প্রিয় পশুটির মস্তক নিয়ে সেলফি তুলেছেন। পাশে একটি শিশু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। মৃত পশুটির মস্তক নিয়ে সেলফি তোলার এক বিকৃত অনুভূতি তাকে পেয়ে বসেছে। এজন্যে সে এধরনের আচরণ করছে।

এমন ছবিও দেখা গেছে। কুরবানির পর গরুর দেহের ওপর শুয়ে বসে ছবি তুলেছে। গরুটির নিচে রক্ত বয়ে যাচ্ছে। পশু কুরবানির পর যত দ্রুত বেঁধে ফেলা রশি খুলে ফেলা হয়। রক্ত পানি দিয়ে ধুয়ে দেই। প্রতিটি ধাপ সযত্বে করা হয়। আর তারা কুরবানির পশুর ওপর বসে সেলফি তুলছে। এদের বাবা মা ও স্বজনরা কি শিক্ষা দিয়েছে? এরা কোন স্কুলে পড়েছে, পশুর প্রতি এদের ব্যবহার সামাজিকভাবে অন্যের প্রতি তাদের আচরণ ভবিষ্যত বা বর্তমানে কি ধরনের হতে পারে? এদের দেখে আরো আবাল সেলফি তুলতে উৎসাহীত হতে পারে। কারণ ইংরেজরা দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করত যা আমরা সহজে ও দ্রুত শিখলেও তারা যে প্রযুক্তি করায়ত্ত করেছে তাতে আমাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের আগ্রহ দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতিতে বেশি। ধর্ষণের প্রতি আমাদের আকর্ষণ আরো বাড়ছে। পশু থেকে নারী কিংবা মানুষের প্রতি আমাদের নির্দয় আচরণ বাড়ছেই। এবং এ নির্দয় আচরণ ছড়িয়ে যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি তরুণদের মাঝে। ইরাক যুদ্ধে নিরীহ নাগরিকদের নগ্ন করে আমেরিকান সেনারা এধরনের ছবি তুলে সেলফি করতেন।

পশুদের প্রতি আমাদের আচরণ কি রকম হওয়া উচিত এবং এ সম্পর্কে নবীজী কি বলেছেন তাঁর একাধিক হাদিস আছে-

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একবার এক পিপাসাকাতর কুকুর কূপের পাশে ঘোরাঘুরি করছিল। পিপাসায় তার প্রাণ বের হওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ বনি ইসরাইলের এক ব্যভিচারী নারী তা দেখতে পায়। সে নিজের পায়ের মোজা খুলে পানিতে ভিজিয়ে কুকুরটিকে সে পানি পান করায়। এ কারণে তার অতীত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’’ (বুখারি : ৩৪৬৭)

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘একজন মহিলা একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। সে তাকে খাবার দিত না আবার ভূখ-ে বিচরণ করে খাবার সংগ্রহের সুযোগও দিত না। এ কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ’ (বুখারি : ৩৩১৮)
অন্যত্র এসেছে : ‘ যেকোনো প্রাণীর ওপর দয়া করার মধ্যেও সওয়াব আছে। ’ (বুখারি : ৬০০৯)

পশু-পাখির যেহেতু বোধশক্তি নেই, ভালো-মন্দ পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই, তাই পশু-পাখির মাধ্যমে মানুষ বা সম্পদের কোনো ক্ষতি হলে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হয় না। তবে এগুলোর সঙ্গে মালিক বা রাখাল থাকলে জরিমানা দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘চতুষ্পদ জন্তুর অনিষ্ট ক্ষমাযোগ্য।’ (বুখারি শরিফ : ৬৯১২)

যেসব প্রাণী প্রতিপালন করা হয়, সেগুলোর সুস্থতা ও খাবার দাবারের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ওয়াজিব। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘এসব বাক্শক্তিহীন প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এগুলোতে আরোহণ করো, সুস্থ অবস্থায় আহার করো।’ (আবু দাউদ : ২৫৪৮)

হাজারো প্রাণীর মধ্যে ইসলাম সীমিত কিছু পশু-পাখি খাদ্য হিসেবে গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো জবাই করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অনুকম্পা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমরা জবাই করবে, সর্বোত্তম পন্থায় করবে। জবাইয়ের বস্তু ভালোভাবে ধার দিয়ে নেবে আর পশুটিকে স্বাভাবিকভাবে প্রাণ বের হওয়ার সুযোগ দেবে।’ (মুসলিম : ১৯৫৫

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘একদা কোনো এক নবি একটি গাছের নিচে অবতরণ করলেন। অতঃপর একটি পিঁপড়া তাঁকে কামড় দিল। তখন তিনি গাছের নিচ থেকে তার গচ্ছিত মালামাল বের করে পিঁপড়ার আবাসস্থল শনাক্ত করে তাতে আগুন দিয়ে পিঁপড়াগুলোকে পুড়ে মারলেন। ফলে আল্লাহ তাঁকে ওহির মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলেন, হে নবি! আপনাকে তো একটি পিঁপড়া কামড় দিয়েছে; আপনি কেন সব পিঁপড়া মেরে ফেললেন, (বুখারি)।

হজরত ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে সফরে ছিলাম। তিনি তাঁর হাজত মেটানোর জন্য গেলে আমরা একটি পাখিকে দুটি ছানাসহ দেখতে পেলাম এবং আমরা পাখির বাচ্চা দুটি নিয়ে এলাম। এ অবস্থায় পাখিটি বাচ্চা দুটির মায়ায় আমাদের পিছু নিল এবং ডাকাডাকি করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাজত থেকে ফিরে এ দৃশ্য দেখে বললেন, ‘কে এদেরকে পিতা-মাতা থেকে ছিন্ন করে ভীতির মধ্যে ফেলে দিল, যাও বাচ্চা দুটিকে তাদের পিতা-মাতার কাছে ফিরিয়ে দাও।’

হাদিসে এসেছে, ‘একদা এক ব্যক্তি হাঁটতে হাঁটতে পিপাসার্ত হয়ে গেল। অতঃপর লোকটি একটি কূপে নেমে পানি পান করে আসতেই একটি কুকুরকে পিপাসায় কাতরাতে দেখলেন। এবং কুকুরটি তৃষ্ণায় ভিজা মাটি খাচ্ছে। তখন তিনি মনে মনে বললেন, কুকুরটির আমার মতোই পিপাসার্ত, অতঃপর তিনি আবারও কূপে নেমে জুতায় পানি ভরে পানিসহ জুতা মুখে করে উপরে এসে কুকুরটিকে পানি পান করালেন। অতঃপর আল্লাহ তার ওপর খুশি হয়ে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবিরা বললেন : হে আল্লাহর রাসুল, পশুর মধ্যেও কি আমাদের কোনো পুণ্য আছে? তিনি বললেন, প্রত্যেক প্রাণের মধ্যেই প্রতিদান রয়েছে।’ (বুখারি)

আমাদের দেশে অনেকেই এসব হাদিস সম্পর্কে কোনো জ্ঞান না থাকায় তারা সেলফি সংস্কৃতিকেই বিনোদন হিসেবে বেছে নিয়েছে। গরু হিন্দুদের দেবতা। অন্যধর্মের প্রতি সম্মান রেখেই ইসলাম অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। গরুর কাটা মাথা ও তার ওপর চড়ে বসে সেলফি তোলার বিকৃত মানসিকতার জন্যে এই সব আবালদের বিচার হওয়া উচিত। অবিলম্বে তাদের আটক করে শাস্তি না হোক সংশোধন কেন্দ্রে পাঠিয়ে তাদের আচরণ ঠিক করতে না পারলে অচিরেই এদেশ আবালে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। একদিন দেখা যাবে ঈদে ঘরে ঘরে আবালরা মৃত কুরবানির পশুর ওপর বসে সেলফি তুলছেন!

Advertisement

কমেন্টস