বঙ্গবন্ধুকন্যার নিরাপত্তা দিতে সমস্যা বা ব্যর্থতাগুলো কী বা কোথায়?

প্রকাশঃ আগস্ট ১১, ২০১৭

এম আরমান খান জয়, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিঃ 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময়ই নিরাপত্তার ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নিরাপত্তা দিতে যদি আমরা ব্যর্থ হই তাহলে সেটা হবে খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এটি আমাদের শঙ্কায় ফেলে দেয় যে, শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, আর আমরা তার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। এটা যে কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকি বিষয়টি তা নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক ঝুঁকিও মোকাবিলা করতে হয়। সেজন্য দেশের একজন নাগরিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তার বিষয়টি জোরদার করার দাবি জানাচ্ছি। নিরাপত্তার ঘটনাটি আমাদের ভাবিয়ে তুলে। আমার মনে শঙ্কা জাগে, কেন আমরা তার নিরাপত্তা দিতে পারছি না। নিরাপত্তা দিতে আমাদের সমস্যা বা ব্যর্থতাগুলো কী বা কোথায়?

বাংলাদেশে সর্বোচ্চ জীবন ঝুঁকিতে আছেন শেখ হাসিনা। এটি গালগল্প নয়, কল্প কাহিনিও নয়। উনিশ বার হত্যা চেষ্টা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা কোনো বানোয়াট তথ্য নয়। এরপরেও তিনি নিয়ম বেঁধে দৈনিক ১৮ ঘন্টা কাজ করে যাচ্ছেন। কাজে ডুবে ছিলেন বঙ্গবন্ধুও। জীবন ঝুঁকির বিষয়টি কখনো আমলে নেননি। বরং বলেছেন, আমি যাদের এত ভালোবাসি তারা আমাকে মারবে কেন? এমন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও। কিন্তু কারোরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। সবচেয়ে কাছের মানুষ খোন্দকার মোশতাক আর বেয়ন্ত সিং-ই ছিল  বঙ্গবন্ধু আর ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকারি অর্থাৎ এই দুজনই দুধ-কলায় সাপ পুষেছিলেন নিজগৃহে। সুযোগ বুঝে সে সাপই ফণা তুলে দংশন করে, নিহত হোন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী। এভাবেই বাঁধগ্রস্ত হয় স্বপ্ন, ঘুরে যায় একটি জাতির ভবিষ্যত গতিপথ।

স্বর্ণমন্দিরে হামলার ঘটনায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জীবন নাশের শংকা ছিল এবং এ বিষযয়ে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ইন্দিরা গান্ধী হেসে জবাব দিয়েছিলেন, “কোনো ঝুকি নেই। আর কোনো বিপদ এলে রক্ষে করবে ওরাই”। তখন পাশে দাঁড়ানো ছিল একজন শিখ নিরাপত্তা কর্মকর্তা যার নাম বেয়ন্ত সিং। এর কিছুদিন পরেই ইন্দিরা গান্ধী নিহত হোন এবং তাঁর বুকে প্রথম গুলি চালিয়েছিল সেই বেয়ন্ত সিং যার প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর অগাধ বিশ্বাস ছিল।

কোথাও পড়েছিলাম, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। কিন্তু অতিরিক্ত বিশ্বাসে কতোটা বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে তা কি বঙ্গবন্ধু হত্যার পরেও আমরা বুঝতে শিখেছি? আপন করে কাছে টানার, ক্ষমতার পাদ-প্রদীপে রাখার কি মর্যাদা দিয়েছে মোশতাক-জিয়া গং-রা? একটি জাতি-রাষ্ট্রের স্থপতির জন্ম প্রতিদিন না হলেও মোশতাক-জিয়ারা জন্মায় প্রতিদিনই। তাই তো আজ দেখি প্রধানমন্ত্রীর এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) সদস্য হিসাবে নিয়োগ পায় রাজাকার পুত্র নুর মোহাম্মদ। তবে এটি বলার কোনোই সুযোগ নাই যে এই নিয়োগটি ভুলবশত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা রক্ষীর পদটি মোটেও হেলাফলার বিষয় নয়। এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। একজন এসএসএফ সদস্যকে নানা পরীক্ষা ও পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। এখন চাঁদপুরের নুর মোহাম্মদের নিয়োগের ব্যাপারে কি সে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যায় বা ধাপগুলো অনুসরন করা হয়েছিল, না হলে তা কেন করা হয়নি? আর এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে কারা জড়িত সে সব ক্ষতিয়ে দেখতে হবে।

যদ্দুর জানা যায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর অফিসের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তবু ভালো যে এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর করা হলো। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত চাঁদপুরের শিবির নেতা নুর মোহাম্মদ। তার পিতা জহিরুল হক মাস্টার জেলা জামায়াতের সাবেক নেতা এবং ভাই আবদুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান জেলা জামায়াতের বর্তমান রোকন। এসব তথ্য গোপন করে সে চাকরি নিয়েছিল বলে বিভিন্ন খবরে প্রকাশ পায়। আসল তথ্য গোপন করেছিল কারা? নুর মোহাম্মদ নাকি তাকে যারা নিয়োগ দিয়েছিল তারা? চাকরি পেতে বা গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে নুর মোহাম্মদ ছল-চাতুরির আশ্রয় নিতে পারে কিন্তু নিয়োগকর্তারা কেন এটি ধরতে পারেনি? পিয়নের চাকরির ক্ষেত্রে যে পুলিশি তদন্ত হয় এখানে কি সেটি হয়েছিল? গোয়েন্দারা কি তথ্য সংগ্রহ করেছিল নুর মোহাম্মদ সম্পর্কে?  এসব প্রশ্নের জবাব জাতি জানতে চায়। কারণ শেখ হাসিনা কোন একক ব্যক্তিমাত্র নয়, তিনি এখন পুরো বাংলাদেশ।

সরকারের জনপ্রিয়তার দিকটা যাই হোক শেখ হাসিনার প্রিয়তা বেড়েছে। তার অদম্য আগ্রহ আর শক্তিতে পরাজিত জামায়াতী মানবতাবিরোধী দালালরা সমাজের সব জায়গায় ঘুণ ধরাতে পারলেও কোণঠাসা। তাদের নেতাদের অপমৃত্যু তারা সহজে ছেড়ে দেবে না। এই কারণে সাবধানতার পাল্লা আরো ভারী হওয়া প্রয়োজন। এটা মানতে হবে দেশে-বিদেশে এদের নেটওয়ার্ক আছে। শক্তিশালী ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে নিজে মেরে অন্যকে মারার অপকৌশল আছে দুনিয়ায়। এগুলো গোয়েন্দাদের না জানার কথা নয়। আছে নাশকতার বিবিধ পথ। আকাশে সাবধানতার পাশাপাশি মাটিতেও সাবধান হতে হবে। ইন্দিরাজির মতো লৌহমানবীকেও আমরা এর শিকার হতে দেখেছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা খুনের নেশায় পাগল তারা যে কি করতে পারে সেটা একুশে আগস্টেই দেখেছিলাম।

ইতালি যাওযার পথে বিমান আকাশের ওপর থেকে আবার নিচে নামানোও নাকি ছিল সামান্য ভুল। চল্লিশ হাজার ফুট ধেকে চার হাজারে নেমে আসার কোনো কারণ এখনো জানেনি জাতি। এবার তো আগুন ধরেই যেতে পারতো। এর পরেরবারও কি অজুহাতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে? শেখ হাসিনা কোন দলের বা কোন সরকারের প্রধান তারচেয়েও বড় তিনি এখন আলো ও উদারতার দিশারী। সেখানে যাদের আক্রোশ তাদের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর কাজটাও তাদের যারা এ দেশে ভালোভাবে-সুন্দরভাবে উদারনৈতিকতায় বাঁচতে চায়। তারা কেন নীরব থাকেন? যারা নানাভাবে উপকৃত, যারা তার সাহায্য-সহযোগিতার কাঙাল তাদের নীরবতাও প্রশ্নময়।

আজ তাই আমরা উদ্বিগ্নতার পাশাপাশি সতর্ক হতে চাই। আমাদের দেশের কপালে উন্নয়নের রাজটিকা পরিয়ে দেয়া শেখ হাসিনাকে যাদের টার্গেট তারা এ দেশকে মধ্যযুগে নিতে চায়। হানাহানি-মারামারি আফগান স্টাইলে বিপ্লবের নামে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার চায় এরা। এদের শিকার হলে দেশতো গোল্লায় যাবেই, জনগণের কপালে নেমে আসবে বিশাল দুর্ভোগ। শেখ হাসিনার আশপাশ থেকে জঞ্জাল হটানোর বিকল্প নেই। সত্যিকার ও খাঁটি মানুষ খাঁটি নেতা আর বিশ্বস্তরা ছাড়া বাকিদের দূরে সরাতে হবে। যে কোনো নিরাপত্তা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। প্রয়োজনে বাইরের সাহায্য নেয়াও জরুরি। ছলে বলে কৌশলের জায়গায় যারা বলে আর ছলে তার বিপদ ঘটাতে চায় তাদের জন্য ঘৃণাও রাখতে রাজি না আমরা।

তাকে বহুবার বিপদের মুখ থেকে ফিরে আসতে দেখার আনন্দ যেন আর করতে না হয়। যেন বিপদের আগেই সাবধান হতে পারে দেশ। এ দায়িত্ব যাদের তাদের অবহেলা যেমন অমার্জনীয় তেমনি শাস্তিও দরকার। যেন কখনো আর এমনটি করার সাহস না পায়।

Advertisement

কমেন্টস