আকাশে রক্তের মেঘ, বাঙালির মনে শোকের ছায়া

প্রকাশঃ আগস্ট ২, ২০১৭

মো. সবুজ খান-

‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি’। ইতিহাসের পাতা থেকে ৭১ এর লাশের গন্ধ দূর হতে না হতেই আরেক কালোরাতের সূচনা ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাঙালি জাতিকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে কিছু হায়েনার দল ঝাপিইয়ে পড়ে বাংলাদেশের জন্মদাতার উপর। হত্যা করে বাঙালি জাতিস্বত্তার বিবেককে। সেদিনের সেই নির্মমতার চিত্র আজো কাদিয়ে যায় বাঙালিকে, আজো মর্মাহত করে প্রতিটি দেশপ্রেমী ত্যাগী আত্মাকে।

সেদিনের সেই অন্ধকারে পড়ে থাকা দেহ থেকে যে রক্ত ঝরেছিল তা কখনোই রক্ত ছিল না, তা ছিল দেশের প্রতিটি বাঙালির চোখের অশ্রু। আমার যে ভাইয়ের বজ্রকণ্ঠের জোরে আমার সোনার বাংলা মুক্ত হল কতটা নিষ্ঠুর, নিকৃষ্ট হলে সেই কণ্ঠকে রুদ্ধ করা যায়? যে হাত স্বাধীনতা যুদ্ধে শত্রুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে, কতটা নির্মম হলে সে হাত ভেঙ্গে দেয়া যায়? যে বিবেক স্বাধীনতার চেতনাকে আঁকড়ে ধরে ঝাপিয়ে পড়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে, কতটা জঘন্য হলে সে বিবেকের বুকে গুলি চালানো যায়। যে মস্তিষ্ক সারাক্ষণ বাঙালির মুক্তির চিন্তা নিয়ে ভাবে, কতটা অমানবিক হলে সেই মস্তিষ্ককে বিকৃত করা যায়?

রাতের আধারে যখন চারিপাশ নির্জনতার আঁধারে ছেঁয়ে যায় ঠিক তখনি চোখ বুজলে দেখতে পাই নির্মম রক্তঝরা সেই রাতের চিত্র। আমি দেখিনি সেদিন কি ঘটেছি, তবুও রাতের অন্ধকারে সেই করুন নির্মমতা ভেসে ওঠে আমার চোখে। রাতের নির্জনতায় শুনতে পাই ৭৫ এর সেই মানুষরূপী পশুদের ভয়ংকর কণ্ঠ। শুনতে পাই বাঙালির বিবেককে গলাটিপে হত্যা করার করুন চাপা শব্দ। চমকে উঠি আচমকা সেই নির্জন রাতের নিস্তব্ধটাকে ভেঙ্গে ফেলা বুলেটেরে শব্দে। বুকের বাম পাশটায় অনুভব করি বেদনাদায়ক চিনচিনে ব্যথা।

শোকের মাস আগস্ট মাস। যুগ যুগ ধরে ১৫ আগস্টের সেই নির্মন ঘটনা আমাদের ব্যথা দিয়ে যাবে। আগস্ট শব্দটা শুনলেই মনের মধ্যে বেদনার এক কালো ছায়ায় ঢেকে যায় বাঙালির হৃদয়। প্রতি বছর আমাদের মাঝে এক অন্ধকারের ছায়া নিয়ে হাজির হয় রক্তাক্ত আগস্ট। তেমনি আবারো আমাদের মাঝে রক্তের সেই গন্ধ নিয়ে আরেক আগস্ট হাজির হলো। হাজির হলো এক নির্মমতার কালো অধ্যায়।

১৫ আগস্টে নিহতরা

আগস্ট মাসের ১৫ তারিখে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয় ধানমণ্ডি ৩২ এ তার নিজ বাসভবনে। এইদিন হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর পরিবারকেও। শহীদ হন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। এদিন বাঁচতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর নিকটাত্মীয় ছোট ভাই শেখ নাসের, বঙ্গবন্ধুর সেজ বোনের স্বামী আব্দুর রব সেরনিয়াবাদ, বঙ্গবন্ধুর মেজো বোনের বড় ছেলে শেখ ফজলুল হক মনি, শেখ ফজলুল হক মনির স্ত্রী বেগম আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের কনিষ্ঠ পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের নাতি সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত এবং আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেন আমুর খালাতো ভাই আবদুল নঈম খান রিন্টু।

আকাশে রক্তের মেঘ, বাঙালির মনে শোকের ছায়া

একসময় ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস নিয়ে তৈরি হয়েছিল বেশ দ্বন্দ্ব। হায়েনারা চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে তার নাম পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে। আর সেজন্যই অনেকটা সময় ১৫ আগস্ট দিনটি ছিল বিভিন্নভাবে অবহেলিত। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ১৫ আগস্টকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়।

এ ছাড়াও বিধি সংশোধন করে সরকারিভাবে নির্ধারিত দিন ছাড়া জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে এবং দিনটিতে সরকারি ছুটির ব্যবস্থা করেন।

পরবর্তিতে নানা দ্বন্দ্বের মাঝেও আওয়ামী লীগ দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে জাতীয়ভাবে পালন করে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সকল স্থানে দিনটি মর্যাদার সাথে পালিত হয়। আগস্ট মাসব্যাপী সারাদেশে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন কর্মসূচি।

কমেন্টস