জুডিশিয়াল লেজিসলেচার: ডেমোক্রেসি নাকি জুডিক্রেসি?

প্রকাশঃ আগস্ট ১, ২০১৭

এম এম রহমান-

সম্প্রতি ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের রায়সহ সুপ্রিমকোর্টের বেশ কিছু রায় এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রেক্ষিতে শুনানীতে রাষ্ট্র পক্ষ ও বিচার বিভাগের টানা পোড়েন নিয়ে আলোচনার প্রারম্ভে কর্নেল ড্যানের একটি কথা বেশ প্রাসঙ্গিক, তিনি তার সম্প্রতি প্রকাশিত “The Swords of American Patriots” নামক প্রবন্ধে জুডিশিয়ারির এনার্কি নিয়ে আক্ষেপ করে তিনি লিখেছিলেন-“when those that are solemnly charged with upholding the law ignore the law; then there is no law; there is only lawlessness.” বেড়ায় যখন ক্ষেতের শষ্য খেতে শুরু করে, তখন ক্ষেতের মালিকের অসহায় হয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না। রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি নিয়ে মামলাটির উদ্ভব হলেও পত্রিকা মারফত মহামান্য প্রধান বিচারপতি ও বিজ্ঞ এ্যাটর্নি জেনারেলের শুনানীকালে বক্তব্য পড়ে মনে হয় রিটটি সরকার বনাম বিচার বিভাগ সম্পর্কিত।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বাহাত্তরের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতে ফিরিয়ে নিতে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে মহান সংসদে ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিমকোর্টের বিজ্ঞ বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জনগণের প্রতিনিধি পরিষদ (মহান সংসদ) এর নিকট অর্পণ করা হয়।

উল্লেখ্য যে, ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয় একটি সামরিক ফরমানের মাধ্যমে।

এদেশের গণতন্ত্রবাদী জনগণ সামরিক সরকারের প্রণীত বিধানকে সংবিধানের মত একটি পবিত্র দলিলে রাখতে চায়নি। এটি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতেই জনগণ তাদের পছন্দের দল বেছে নেই। যেহেতু ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্তমান সরকার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েে জয়লাভ করেছে, এটা প্রমাণ করে যে, জনগণের এই প্রতিশ্রুতিতে সম্মতি ছিল। বরং আদালত জনগণের পক্ষে এটিকে বাস্তবায়ন করতে সরকারকে বাধ্য করতে পারতো, কিন্তু হয়েছে উল্টোটা।

এখন দেখা যাক কি ছিলো ঐ রায়ে: বিজ্ঞ বিচারপতি মইনুল ইসলামের লিখিত ১৬৫ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়, “বলতে দ্বিধা নেই, ষোড়শ সংশোধনী একটি কালারেবল লেজিসলেশন (কোনো কাজ সংবিধানের মধ্যে থেকে করার সুযোগ না থাকলে আইনসভা যখন ছদ্মাবরণে ভিন্ন প্রয়োজনের যুক্তি দেখিয়ে একটি আইন তৈরি করে), যা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘন।”

এটা সংবিধানের দুটি মূল কাঠামো ৯৪(৪)ও ১৪৭(২) অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন। একইসঙ্গে সংবিধানের ৭(বি) অনুচ্ছেদকেও আঘাত করে।” সংবিধানের ৭ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানী অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানী বাতিল হইবে৷ ৯৪ (৪) অনুচ্ছেদে রয়েছে- এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।
রায়ে বলা হয়, “রুল যথাযথ (অ্যবসলিউট) ঘোষণা করা হল। ষোড়শ সংশোধনী আইন-২০১৪ কালারেবল, এটি বাতিল এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হল। সংবিধান-ব্যাখ্যার বিষয়ে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত থাকায় সংবিধানের ১০৩(২)(ক) অনুসারে সনদ দেওয়া হচ্ছে।”

এই রায় কতটা যৌক্তিকতা নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই দ্বিধান্বিত, যে মহান সংসদের বিধিমোতাবেক কার্যক্রমকে যখন কোর্টে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন এ প্রশ্ন অমূলক নয় যে, কে বড়, সংসদ নাকি আদালত?

অনেকেই শংকিত যে, যখন সংবিধানের বিধি অবৈধ হতে পারে তখন সরকারের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ যখন- তখন অবৈধ করার অবকাশ থেকে যায় বৈকি। শংকিত বলেই রায় ঘোষণার পরে সংসদ সদস্যগণ ওয়াক আউট করেছিলেন। তবে, রাষ্ট্রপক্ষ বা সরকার ভিন্ন পথ অবলম্বন না করে যে আদালতের রায় মেনে নিয়ে আপিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন, এজন্য রাষ্ট্রপক্ষ ধন্যবাদ’ এর প্রাপ্য। অনেকের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, আইন প্রণয়ন ও সংশোধন প্রভৃতির কর্তৃপক্ষ কে? আদালত, নাকি সংসদ। যদি আদালত হয় তবে এর নাম “জুডিশিয়াল লেজিসলেচার’। যদি মহান সংসদের চেয়ে মহামান্য আদালতের রায় প্রাধান্য পায়, তবে সেটি জুডিক্রেচি বলা চলে। অধিকন্তু, এই রায় সরকার বা রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তির রিটের
প্রেক্ষিতে হলেও, যেহেতু বিচার বিভাগের স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান, সেহেতু এর সমাধান আদালতে নাকি সংসদে হওয়া উচিত এ নিয়েও ভাবনার অবকাশ অমূলক নয়। কেননা, বিচার বিভাগ এ পর্যায়ে রেফারি হিসেবে ৩য় পক্ষ নয়।

যায় হোক, যেটি বলছিলাম জনগণ বা তাদের প্রতিনিধি কর্তৃক দেয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতের রায় নিয়ে একটা উদাহরণ দেয়া চলে। গত বছর নাইজেরিয়ার লাগোস এর একটি উচ্চ আদালত এক গভর্নরকে বরখাস্ত করে অন্য একজনকে
বসতে আদেশ দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের অবসার্ভেশনে আক্ষেপ করে, “হাই কোর্টের রায়কে “রেপ অফ ডেমোক্রেসি” আখ্যা দেয়া হয়েছিল। ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া রায়ে মহান সংসদ এর প্রণীত অনুচ্ছেদ অবৈধ ঘোষণা করে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

বিচারের শুনানীকালে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানিতে বলেছিলেন, বিচারপতিদের অপসারণের প্রক্রিয়া আগে ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। ষোড়শ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সংসদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি এই অপসারণ করবেন। আর সংসদ তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ দেবে। ওই তদন্ত কমিটি কীভাবে গঠিত হবে সে বিষয়ে একটি বিল এখন পর্যন্ত বিবেচনাধীন জানিয়ে তিনি শুনানিতে বলেন, “এটি আইনে পরিণত হলেই কিন্তু এ বিষয়ে কারণ (কজ অব অ্যাকশন) উদ্ভব হবে। কাজেই আমার বক্তব্য হল, জনস্বার্থ মামলা হিসেবে যারা মামলাটি করেছেন- তাদের মামলা করার সময় আসেনি।”

এখন আলোচনায় আসা যাক সংবিধানের সংশোধনী অবৈধ হবার সুযোগ আছে কিনা। এছাড়া, আদালত ও সংসদের মধ্যে কোন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার কতটুকু।

উল্লেখ্য যে, অনুচ্ছেদ ১৪২ এর বিধান প্রতিপালন করত বৈধ প্রক্রিয়ায় দুই তৃতীয়াংশ ভোটের ভিত্তিতে যখন সংশোধনী হয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে গেজেট নোটিফিকেশন হয়, তখন সংশ্লিষ্ট বিধান সংবিধানের অংশ হয়ে যায়। সুতরাং, বলা চলে, সংশোধনী  নয়, বরং মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলো অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় রয়েছে, “বাংলাদেশের জনগণের অভিব্যক্তি স্বরুপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ইহার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব” এ ছাড়া,৭ (১) অনুচ্ছেদ মতে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে৷” রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের কাজের পরিধি ও সীমানার বিচারে আইনসভা, আইনপ্রণয়ন করবে।

তবে, জনগণের পক্ষে পার্লামেন্ট কর্তৃক আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে যেন স্বেচ্ছাচার না হয়ে যায়, তার জন্য ৭(২) এই কর্তৃত্বের একটি সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে”।

এখানে উল্লেখ্যে যে, “অন্য কোন আইন” এই সংবিধানের অন্য কোন অনুচ্ছেদ নয়।
প্রশ্ন থেকে যায়, সীমানা অতিক্রম করলে যতটুকু বাতিলযোগ্য তা বাতিলের কর্তৃপক্ষে কে? জনগণ বা তার প্রতিনিধি, নাকি বিচার বিভাগ। এখানে সুস্পষ্ট যে, এ প্রজাতন্ত্র ও সংবিধানের মালিক জনগণ। জনগণের অভিপ্রায় সর্বদা প্রাধান্য পাবে, আর জনগণের পক্ষে তাদের প্রতিনিধি সভা সে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। গণতন্ত্রের মূল সুর ও তাই, কেননা, রাষ্ট্রের অর্থের যোগানদাতা একমাত্র জনগণ।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তা হলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি। এই সংবিধানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের ক্ষমতাও জনগণ মহান সংসদের নিকট অর্পণ করেছে।

তা ছাড়া, উন্নত বিশ্ব যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে বিচারবিভাগের জবাবদিহিতা জনগণের প্রতিনিধিসভার নিকট ন্যস্ত।
যুক্তরাষ্ট্রে, নির্বাহী বিভাগ বিচারপতি মনোনয়ন দেয় এবং কংগ্রেস তার অনুমোদন দেয়। প্রশ্ন হলো, সংবিধানের অনুচ্ছেদ অবৈধ হতে পারে কিনা।
যেহেতু আদালতের রায়ে, প্রক্রিয়াগত ভুলের কথা বলেনি, বরং ৭(বি) এর অধীন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক বিধায় অবৈধ মর্মে উল্লেখ রয়েছে, সেহেতু প্রক্রিয়ায় ভুল ছিল না সেটি প্রমাণিত। তাহলে, বেসিক স্ট্রাকচার কি? এর ব্যখ্যা সংবিধান এ সুস্পষ্টভাবে দেয়া নেই। আর সংবিধান এ কোথাও বলা নেই, বিচার বিভাগের অপসারণ ক্ষমতা সংক্রান্ত বিধি বেসিক স্ট্রাকচারের অংশ। এটি বিজ্ঞ এমিকাস কিউরিদের মতামতের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে। যদি এটি নিয়ে অস্পষ্টতা থাকে তবে আদালত চাইলে, ১০৩ অনুচ্ছেদে উপেদেষ্টামূলক ভূমিকার আওতায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির নজরে এনে সংসদো পুনরায় উপস্থাপনোর জন্য পরামর্শ দিতে পারতেন।

তাহলে, বিচার বিভাগ ও সরকারের দ্বন্দ্ব হয়তো এতটা উত্তপ্ত নাও হতে পারতো। রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী ও আইন বিভাগ থেকে পৃথক করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ বলা রয়েছে, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। এখানে বলা নেই আইন বিভাগ থেকে পৃথক হবে। তা ছাড়া, ২২ অনুচ্ছেদ ২য় ভাগের মূল নীতির
অংশ বিধায়, ৮(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক এটি আদালত দ্বারা বলবৎ যোগ্য নয়। রায়ে, ৯৪(৪) অনুচ্ছেদের রেফারেন্স দিয়ে বলা হয়েছে, “এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন।” যতটুকু বুঝি, এটি মূলত বিজ্ঞ বিচারকগণের কর্ম সম্পাদনে স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নয়।

যদি মহামান্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের দ্বারা অপসারণের বিধান থাকে তবে, এক্ষেত্রেও বিচারকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তখন, প্রধান বিচারপতি যা চাইবেন অন্যান্য বিচারকগণ তাই করতে বাধ্য হতে পারেন। অধিকন্তু, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাত্র ৩ জন বিচারকের তদন্তের নিরপেক্ষতার চেয়ে সংসদের দুই তৃতীয়াংশ প্রতিনিধির পক্ষপাতিত্বের সুযোগ বেশ সীমিত বলেই মনে হয়। মহামান্য প্রধান বিচারপতি, আপিলের শুনানীকালে যুক্তি দেখিয়েছেন, কখনও দুুুই তৃৃৃৃতীয়াংশ সদস্য না হলে সংকটের উদ্ভব হতে পারে। হ্যাঁ
হতে পারে, তবে তার সমাধান নিশ্চয় এর অধীনে প্রণীত আইনে থাকবে। সেটি সংসদের উপর ছেড়ে দেয়ায় সমীচিন নয় কি?

অন্যদিকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে এমন সংকট ও হতে পারে, মহামান্য প্রধান বিচারপতির অসদাচরণ দায়ে অপসারণের প্রয়োজন হলে তার সমাধান কি হবে, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে।

যেহেতু সংবিধান সংসদকে এ ক্ষমতা অর্পণ করেছে, তাই বিচার বিভাগের উচিত জনগণের ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষার উপর আস্থা রাখাই প্রত্যাশিত। তা ছাড়া, বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতারক্ষার্থে যথেষ্ট আন্তরিক মনে হয়েছে।

এই সরকারই ২২ নং অনুচ্ছেদ ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে, ২০০৭ সন পরবর্তী নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগ হতে আলাদা করেছে, বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে নিয়মিত নিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিচার কাজের স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারকদের আর্থিক (বেতন ও ভাতা) বৃদ্ধি করেছে। যদিও হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে। তাহলে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে, স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবার খুব আশংকা আছে বলে আমি মনে করি না।

নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করার মূল ভিত্তি ছিল প্যারারাল বিচার ব্যবস্থা চলতে পারে না। এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা লঙ্ঘন। তবে, একথাও তো সত্য যে, আইন বিভাগের বৈধ কাজকে অবৈধ করাও প্যারালাল লেজিসলেটিভ ব্যবস্থা বা জুডিশিয়াল লেজিসলেচার। যেখানে জনগণ সংসদকে এই ক্ষমতা অর্পণ করেছে, সেই ক্ষমতাবলে গৃহীত সংশোধনী তো জনগণের ক্ষমতার প্রাধান্যকে অস্বীকার করার শামীল।

তা ছাড়া, ১৪২ এর দফা ২ এ বলা আছে, “এই অনুচ্ছেদের অধীন কোন কিছু সংশোধনীর ক্ষেত্রে ২৬ অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রযোজ্য হবে না” অর্থ্যাৎ, অনুচ্ছেদ ১০২ ধারায় মৌলিক অধিকার (৩য় ভাগ এ বর্ণিত) বঞ্চিত কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে, হাইকোর্ট আদেশ দিতে পারলেও সংশোধনী বিষয়ে আদালত কর্তৃক বিচারের সীমানা সীমিত। তা ছাড়া, ৪৭ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য এমন ক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ার কে বেধে দেয়া হয়েছে।

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মহামান্য সুপ্রিমকোর্টকে জনগণের অধিকার ও সংবিধানের গার্ডিয়ান মনে করা হয়। আইনের শাসন নিশ্চিত করা আদালতের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের একমাত্র চ্যালেঞ্জ কি শুধুই স্বাধীনতা?

সকল শ্রেণির সকল মানুষের আদালতের আশ্রয় লাভের অধিকার কি এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে? তদন্তের নিরপেক্ষতা ও সচ্চতা কি নিশ্চিত হয়েছে? এদেশের আইনীপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা বিষয়ে কি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের নিকট পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে? দ্রুত সময় বলতে কত সময়? বিচার প্রক্রিয়ার নাগরিক সনদ  তৈরী হয়নি। একজন বিচারপ্রার্থী কি পেলো তা পড়তে পারে না, (ইংরেজিতে রায়) মাতৃভাষায় কি রায়ের অধিকার নাগরিকের নেই? এমন অনেক চ্যালেঞ্জ ইতোমধ্যেই বিচার ব্যবস্থায় রয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশের মোট পেন্ডিং মামলার সংখ্যা ৩১ লক্ষ। অনেক মামলা ৫/৭ বছর এমন কি ১০ বছরেও সমাধান করা হয়নি। অধিকাংশ বিচার প্রার্থীর আক্ষেপ কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা বিচারের নিরপেক্ষতা নিয়ে নয়, বরং দীর্ঘসূত্রিতা, হয়রানী, স্পিড মানি, দুর্নীতি, অসহায়ত্ব, আদালতরর কার্যক্রম ও প্রক্রিয়া, অসচেতনতা, দুর্বোধ্যতা এবং সেবা প্রদানের ধরণ প্রভৃতি নিয়ে। স্বাধীনতা নিশ্চিত হলেও বিচারপ্রার্থীদের কোর্টে বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সহজতর ও নিশ্চিত না করতে পারলে, আদৌ কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে? বিচার প্রার্থী যদি বুঝতেই না পারে আদালত কি লিখলো,কি বললো, বা আদালত চত্বরের সীমানায় আইনী সহায়তাকারী ও আইন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিকট যদি জিম্মি হয়ে যায়, তবে কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাধীনতার কথা বলে স্বতন্ত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এ রুপ নিলেও কি খুব লাভ হবে? হয়তো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্যন্য বিভাগ থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা মিলবে, কিন্তু নিজের ঘরেই বন্দী হয়ে যাবার সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়া যায় না। কিন্তু যে দ্বন্দ্ব ৩ বিভাগের মধ্যে সৃষ্টি হবে, তার জাতাকলে পিষ্ট হবে আমজনতা।

কমেন্টস