`একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ও কিছু হতাশা’

প্রকাশঃ জুলাই ৩১, ২০১৭

মোঃ জুনায়েদ-

সেই ছোট্টবেলায় অবুঝ মনে প্রায় সবাই আমরা কোন না কোন সময় বলেছি বড় হয়ে ডাক্তার হব। স্কুলে “তোমার জীবনের লক্ষ্য” নামক রচনায় কেবলমাত্র লেখার জন্য হলেও একবার হলেও আমরা লিখেছি জীবনের লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া। ধীরে ধীরে সেই লক্ষ্য হয়তো কারো মনে সত্যিই গোপন ইচ্ছা হিসেবে স্থান পায়। আর সেই ইচ্ছা, সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য মেডিকেল প্রাঙ্গণে ভিড় করে এক ঝাঁক নবাগত তরুণ-তরুণী। চোখে-মুখে থাকে তাদের স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্খা। হোক তাদের নিজের স্বপ্ন কিংবা তাদের বাবা-মার। এই সুদীর্ঘ মেডিকেল জীবনে যেমন অনেক অভিজ্ঞতা অর্জিত হয় তেমনি মাঝে-মাঝে হতাশার গ্লানিও বয়ে বেড়াতে হয়।

শুরুতেই বলে রাখি মেডিকেল জীবন অনেকটা কষ্টের জীবন। ভয় পাওয়ানোর জন্য কিছু বলছি না। আর স্বপ্ন পূরণের জন্য একটুতো কষ্ট করায় যায়। ২০১১ সালের ১৮ই মে “গিনিস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড” এম.বি.বি.এস কোর্সকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন সিলেবাসের পড়া হিসেবে ঘোষণা করে। আসলে সব পড়াই কঠিন কিন্তু মেডিকেলের পড়া কঠিন কেবল তার সিস্টেমের জন্য, ফেল করার রিস্কের জন্য, তার সুবিশাল সিলেবাসের জন্য। এইখানে যেমন এনাটমি ব্যবচ্ছেদ রুমে মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে কাটাকাটি করতে হয়, তেমনি কেমিক্যাল ও গ্যাস নিয়ে বায়োকেমিস্ট্রিতে গবেষণা করতে হয়, আবার মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে থুতু, মলমূত্র নিয়ে পরীক্ষা করতে হয়।

আপনি যদি মনে করেন এম.বি.বি.এস এ কেবল মানুষ ও ঔষুধ নিয়ে আলোচনা করা হয় তো ভুল। কমিউনিটি মেডিসিনে আপনাকে স্ট্যাটিস্টিক্যাল সমস্যা সমাধান করতে হবে, একটা আদর্শ রুমের দরজা, জানালা, ল্যাট্টিনের গভীরতা, এমনকি মশারি ছিদ্রের দৈঘ্য-প্রস্থ সম্পর্কেও জানতে হবে। ফরেনসিক মেডিসিনে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা, বিচারকার্য পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে হবে। জানতে হবে রাইফেল এবং পিস্তলের গুলির গতি সম্পর্কে।সামান্য কিছু জীববিজ্ঞানও জানতে হবে। সহজ ভাবেবলতে গেলে মোটামোটি সব বিষয় সম্পর্কে একটা ভাল ধারণা রাখতে হবে। হয়তো এই জন্যই এম.বি.বি.এস একসাথে দুইটা আলাদা আলাদা আন্ডারগ্রেজুয়েট ডিগ্রি প্রদান করে-ব্যাচলর অফ মেডিসিন এবং ব্যাচলর অফ সার্জারি। যতটা সহজে বলে ফেলা বাস্তবে কিন্তু এতটা সহজ না। এই সুবিশাল ডিগ্রি অর্জনের জন্য একটু তো কাঠ-খড় পুড়াতে হয়। ব্যর্থতা যেমন আসবে আবার সফলতাও কিন্তু আকাশ ছুবে।অনেকেই আবার সফলতার আকাশ ছোঁয়ার আগেই ব্যর্থতায় গা এলিয়ে দেয়। ঝেঁকে বসে ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশন যার বাংলা অর্থ বিষন্নতা কিংবা হতাশা।

এক জরিপে দেখা গেছে ২৭% মেডিকেল ছাত্রছাত্রী হতাশায় ভোগে। শুধু তাই নয় প্রতিটা মেডিকেল ছাত্রছাত্রীই দেখা যায় কোন না কোন সময় হতাশায় ভোগে। আর এর প্রধান কারণ হল এই শিক্ষাব্যবস্থা। শুরুতেই বলছিলাম মেডিকেল জীবনটা একটু কষ্টের। রোজকার আইটেম রোজ ক্লিয়ার না হলে পেন্ডিং আবার রিঅ্যাপিয়ার, আইটেমের পর কার্ড ফাইনাল, কার্ড ফাইনালের পর আবার টার্ম ফাইনাল। প্রতিটা পরীক্ষা ৬০% নম্বর নিয়ে পাশ করার পর আপনি প্রফেশনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন কেবল তখনই যখন আপনার ক্লাসের উপস্থিতি সংখ্যা ৭৫% হবে। হয়ত খুব সহজ মনে হতে পারে শুধু ৬০% পাশ নম্বর কিন্তু এই নম্বর তোলাটাই অনেক কষ্ট। এইখানে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি এম.সি.কিউ, ওসপি, প্র‍্যাক্টিকেল, ভাইভা পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করতে হয়। আর এই প্রতিটা পার্টেই ৬০% নম্বর নিয়ে পাশ করতে হয়। না হয় সাপ্লি রিসাপ্লি এভাবে চলতেই থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায় এই হতাশা শেষ পর্যায়ে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়।

ডেভিডসনে বলা আছে, যারা একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে তাদের ২০% আবার চেষ্টা করবে এবং ১-২% তৃতীয় প্রচেষ্টায় মারা যাবে। এই তো কিছুদিন আগেও ঢাকার একটি স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার সংবাদ পেলাম। কিন্তু এই আত্মহত্যাই কি সব সমস্যার সমাধান? আত্মহত্যা কোন কিছুরই সমাধান নয়। আমাদের সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে যে সুখ ভাগাভাগি করলে বাড়ে আর দুঃখ ভাগাভাগি করলে কমে, তাই এই সময়টা বন্ধুর মত কেউ পাশে থেকে যদি বুঝায় যে আর একটু ধৈর্য্য ধরলে সব ঠিক হয়ে যাবে তাহলে হতাশা থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসা সম্ভব। হতাশায় ডুবে থাকা আপনার কাছের বন্ধুটিকে একটু বুঝান যে আত্মহত্যাই সব কিছুর সমাধান নয়।একটি রেজাল্ট দ্বারা কখনও সবাইকে মূল্যায়ন করা যায় না। একটু না হয় কথা শুনো, কাঁদো তারপর আবার চলা শুরু করো। লজ্জায় আত্মহত্যা না করে নির্লজ্জ হয়ে বেঁচে থাকো। একদিন দেখো সাফল্য আকাশ ছুঁবেই। আর সেদিন তুমি বুক ভরে নিশ্বাস নিতে নিতে টের পাবে জীবনটা একটু বেশিই সুন্দর। এই সুন্দর জীবনের জন্য বেঁচে থাকাটা তাই সার্থক।আপনার এরকম দুই একটি কথায়, একটু ভরসায় একটা মানুষ অনেকখানি স্বস্তি পেতে পারে, যা আপনি নিজেও জানেন না।

এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন একজন শিক্ষক। হতাশা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হল কাউন্সেলিং। প্রত্যেকটা মেডিকেল কলেজে মাসে অন্তত একবার কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করা উচিত। আপনার কাছের ছাত্র/ছাত্রীটিই হয়তো বা হতাশায় ভুগছে। তার সাথে কথা বলুন, তাকে বোঝান। তাকে কাউন্সেলিং করুন। আপনার সহায়তাই হয়তোবা সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে।

নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ।

কমেন্টস