বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের ঈদ উৎসব

প্রকাশঃ জুন ১৮, ২০১৭

এম আরমান খান জয় :

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ, জানি সবাই। আসলেই কি তাই?

তাহলে কার খুশি? কাদের জন্য আনন্দ?
বিশেষ কোনো গোত্রের ?
পয়সা অলাদের?
সাদা-কালো- বেগুনি মিলিয়ে প্রচুর টাকা আছে, তাদের?
ক্ষমতা নামের সোনার ডিম দেওয়া মুরগি আছে, তাদের?
শ্রমিকের ঘামকে সিড়ি বানিয়ে আরো উপরে উঠার কায়দ-কানুন শিখছেন, তাদের?
কার তবে??
“ঈদ সকলের” একথা বলার সুযোগ নেই। কথা ও কাজে তাহলে মিল হবে না।
কবি নজরুল তো আর এমনি এমনি বলে যান নি,
জীবনে যাদের হর রোজ রোজা
ক্ষুদায় আসেনি নিদ
আধমরা সেই গরীবের জন্য
এসেছে কি আজ ঈদ?
তাহলে চলুন খুঁজে দেখি কার ঈদ কেমন?

রাষ্ট্রপতির ঈদ-
বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান পার্সন হলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। যদিও সাবেক রাষ্টপতি বিচারপতি শাহাব উদ্দিনের ভাষায়, মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহন ও কবর জিয়ারত করা ছাড়া এদেশের রাষ্টপতিদের তেমন কোনো কাজ থাকে না। সেটা ভিন্ন কথা। ঈদের দিনে বঙ্গভবনের দরজা-জানালা খুলে দেয়া হয়। এলিট পাড়ার মানুষ লাইন ধরে প্রবেশ করতে থাকেন বঙ্গভবনে। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন মহাসমান্য রাষ্ট্রপতি, স্ব-স্ত্রী। আগত্বদের সাথে হেন্ডশেক করেন। কারো ভাগ্য প্রশস্থ হলে রাষ্ট্রপতির সাথে কোলাকুলির সুযোগ ঘটে। সম্ভবত হেভি খাওয়া- দাওয়া ও হয়। আর এই পুরো অনুষ্টানটিকে মিডিয়ার মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরা হয় রাষ্ট্রপতির ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় নামে। বরকতি এই কাজটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও করেন।

প্রধানমন্ত্রীর ঈদ-
ঈদ হলে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ ব্যস্ততা শুরু হয় যায় পহেলা রমযান থেকেই। পহেলা রমযানেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পঙ্গু বিধবা ও আলেমদের নিয়ে ইফতার করেন। পনেরো রমযানের পর থেকেই সমাজের বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ঈদ শুভেচ্ছা বা ঈদ কার্ড পৌঁছুতে থাকে। একটি কার্ড বিরধীদলীয় নেত্রীর ঠিকানায় ও যায়। অবশ্য সমাজের বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণী বলতে যাদের মেরুদন্ড শক্ত,পকেট গরম. তাদেরকে বুঝতে হবে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য মিডিয়ার মাধ্যমে ঈদ শুভেচ্ছা।
এভাবেই সারাদিনই সময় দিতে হয় দলীয় নেতাকর্মীদের, যাদের পোষাকি নাম জনগণ। উভয় ঈদেই ঈদের দিনটিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। দলীয় নেতাকর্মী, কুটনীতিকগণ, সম মনা রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। আর আমরা সাধারণ জনগণ টেলিভিশনে সেটা বসে বসে দেখি।

মন্ত্রী-এমপিদের ঈদ-
এদেশের মহা ভাগ্যবান কিছু মানুষ আছেন যারা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছেন। তারা হলেন মন্ত্রী- এমপি। ঈদের দিন তারা চেষ্টা করেন নিজ গ্রামের বাড়ি তথা নির্বাচনি এলাকায় থাকতে। যারা তাদের ভোট দিয়ে নেতা বানিয়েছে, তিনি যে তাদের ভুলে যান নি, অতি সুক্ষ্যভাবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করা। আমরা সহজ সরল জনগণ সেটা আবার বিশ্বাসও করি। আমাদের মন্ত্রী- এমপিরা যে জনগণের জন্য গভীর মমতা রাখেন, সেটা প্রমাণ করতে বছরের দুই ঈদে তারা হাজির হন সাধারণ মানুষের মাঝে।

ব্যবসায়ীদের ঈদ-
দেশের বড়বড় ব্যবসায়ী যারা, অর্থাৎ যারা দেশের সার্বিক অর্থনীতির উপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখেন, সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেন, অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে বাজার ব্যবস্থা যারা নিয়ন্ত্রন করেন, তাদের কথা আলাদা। তাদের বেশিরভাগই ঈদ করেন দেশের বাইরে। অবশ্য বাইরে যাবার আগে গরিব-দুঃখি মানুষের জন্য যে কিছুই করে যান না, সেটা বলা বে-ইনসাফি হবে। মাইকে ঘোষনা দিয়ে কয়ে হাজার গরিব মিসকিনকে এনে জড়ো করেন। বিশেষ আমন্ত্রনে ডজন খানেক মিডিয়ার ক্যামেরাও হাজির থাকে। তারপর দু’তলার বেলকনি থেকে কয়েকশ’ শাড়ি-লুঙ্গি ছুড়ে দেন কয়েক হাজার মানুষের দিকে। কাপড় কুড়াতে গিয়ে পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মারা যায় কেউ কেউ।
মধ্যম শ্রেনীর ব্যবসায়ী যারা, ঈদের রাত পর্যন্ত তাদের ব্যস্থ থাকতে হয় দোকানদারি নিয়ে। কেউ কেউ তো আবার ঈদের দিনেও দোকান খোলা রাখেন। তারা তাদের বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে মোটামুটি ভালোই কাটান ঈদের দিনটি।

ইমাম- মুয়াজ্জিনের ঈদ-
এই মানুষগুলোর অবস্থা বেশ করুণ! ইমাম মানে নেতা। এই নেতার নেতৃত্বে নামাজ আদায় করা হয়। ইমাম সাহেব সামনে থাকেন। বাকি সকল মুসল্লি, তা তিনি রাষ্ট্রপতি হোন, মন্ত্রী-এমপি হোন অথবা সাধারণ কেউ, সবাইকে পেছনেই দাঁড়াতে হয়। অথচ আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইমাম মুয়াজ্জিনকে প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয় না। বিশেষত বেয়াদব টাইপের কিছু মুসল্লি-সেক্রেটারি আছেন, যারা ইমাম মুয়াজ্জিনকে অনেকটা কর্মচারির মতো মনে করেন। তারা ভুলে যান তারা মসজিদ পরিচালনা কমিঠির সভাপতি বা সেক্রেটারি। ইমাম সাহেবের নন।
ঈদ উপলক্ষে এই মানুষগুলোর ছুটি নেই। যুক্তি সঙ্গত কারণ আছে হয়তো। মুয়াজ্জিন সাহেবকে ছুটি দিলে আযান দেবে কে? ইমাম সাহেবকে ছুটি দিলে নামাজ পড়াবে কে? সে জন্য ঈদের দিনটিতে তাদের আর বাড়ি যাওয়া হয় না। প্রিয় সন্তানকে কাছে ডেকে একটু আদর করা হয় না। আবার অনেক মসজিদে ঈদের বোনাসটা পর্যন্ত দেওয়া হয় না। সামান্য যে কয়টা টাকা বেতন পান, সেটাই পাঠিয়ে দেন বাড়িতে। তার পরেও বিস্ময়কর ব্যপার হলো, অন্যান্য পয়সাওয়ালা লোকদেরচে’ তাদের সংসারটা আবার ভালোই চলে!

ডাক্তারের ঈদ-
আমাদের দেশে ডাক্তারদের রোজগারপাতি মাশাল্লাহ খারাপ না। অন্য যেকোনো ব্যবসারচে’ ভালো ও লাভজনক। সরকারি-বেসরকারি চাকরি, ক্লিনিকের ইনকামসহ অন্যান্য উপরি ইনকাম মিলিয়ে একজন ডাক্তারের পকেটে প্রচুর টাকাপয়সা আসে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত,ডাক্তারির মতো মহান একটি পেশাকে আমি ব্যবসার সাথে তুলনা করে ফেলেছি। কী করবো, আজকাল অধিকাংশ ডাক্তারদের কাছেই ডাক্তারি আর সেবামূলক পেশা নয়, রীতিমতো ব্যবসা।
ঈদ উপলক্ষে বড়বড় ডাক্তাররা সবাই ছুটিতে চলে যান। এই সময় অসুস্থ রোগীরা হাসপাতালে বড়বেশি অসহায় অবস্থায় সময় কাটায়। ইমার্জেন্সি রোগীরা যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে কিন্তু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নাগাল পায় না। অবশ্য করারও কিছু নেই। আফটার অল ডাক্তাররাও তো সামাজিক মানুষ। তাদেরও তো একটা পার্সোনাল লাইফ আছে। সব মিলিয়ে ডাক্তারদের ঈদ বেশ ভালোই কাটে।

রোগীদের ঈদ-
রোগী দুই প্রকার। ঘরের রোগী, হাসপাতালের রোগী। অসুস্থ হয়ে বাসায় পড়ে থাকলে এক কথা। তাদের দিকে ঘরের মানুষ একটু খেয়াল দেয়। খেয়ালের পরিমাণটা নির্ভর করে রোগীর প্রভাবের উপর। কিন্তু যারা হাসপাতালের বেডে বা মেঝেতে পড়ে থাকে, তাদের অবস্থা বড় করুণ! যদিও ঈদ উপলক্ষে একটু ভালোমন্দ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু শরীরে শান্তি না থাকলে খাবার দিয়ে কী হবে? আত্মীয়-স্বজন থাকলে হাসপাতালে টিফিন যায়। যাদের কেউ নেই, তাদের জন্যে কেউ যায় না। তারা তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুধু। শারীরিক কষ্টের সাথে তখন যোগ হয় মানসিক কষ্ট।

পুলিশের ঈদ-
যদিও ঘুষ দুর্নীতি করে করে একশ্রেণীর পুলিশ গোটা পুলিশ বাহিনীর ইমেজকে একেবারে তলানিতে এনে ঠেকিয়েছে। তবে সৎ ও নিষ্টাবান পুলিশ কিন্তু এখনো আছেন। আর আছেন বলেই আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনকাঠামোটা এখনো ভেঙে পড়ে নি। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ঈদ উপলক্ষে পুলিশের ছুটি নেই। ঈদের দিনেও তাদের ডিউটি করতে হয়। আমরা বাঙালিরা যে ঈদের দিনটিতে মারামারি করবো না, তার নিশ্চয়তা তো আমরা নিজেরাই দিতে পারি না। ঈদগাহের দখল নিয়ে পর্যন্ত রক্তপাতের ঐতিহ্য আছে আমাদের। যার ফলে পুলিশের লোকগুলোকে বেতনের সময় হলে বেতন এবং বোনাসের টাকাগুলো বাড়িতে পাঠিয়ে একা একা ঈদ করতে হয়। ঈদ করা মানে ডিউটির ফাঁকে একটু সেমাই খাওয়া আর কি!

সাংবাদিকের ঈদ-
আমি নিজে সাংবাদিক হিসাবে বলছি,সাংবাদিকরা যে খুব একটা রিলাক্সড হয়ে ঈদ করতে পারেন, সেটা বলার সুযোগ নেই। ঈদের দিনের নানা ঘটনাবলি তাদেরকে পর্যবেক্ষন করতে হয়। বিশেষত ইলেকট্রনিক মিডিয়া কমরত সাংবাদিক। রাষ্ট্রপতি কোন ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করলেন,সেটার ছবি দরকার। মন্ত্রী-এমপিদের কে কোথায় ঈদ করলেন, সেটা জাতিকে না জানালে কেমন করে হবে? প্রিন্ট মিডিয়ার লোকগুলোকেও বেড়ানোর পাশাপাশি চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। সংবাদ স্টক করে রাখতে হয়। মারাতœক কোনো নিউজ কভার করতে না পারলে এবং সেটা অন্য পত্রিকায় ছাপা হলে অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদকের ধমকও হজম করতে হয়।

লেখকের ঈদ-
লেখকরা মোটামুটি ১০ রমযানের পর থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যার জন্য লেখার ফরমায়েশ থাকে। আবার প্রতিটি পত্রিকার জন্য লিখতে হয় আলাদা আলাদা ফিচার। এক্ষেত্রে সম্পাদক মহোদয়গণ আবার সেনসিটিভ। অন্য পত্রিকায়ও ছাপা হওয়া লেখা নিজ পত্রিকায় ছাপানোকে পত্রিকার স্বাতন্ত্র ও ইমেজ ভুলণ্ঠিত হবার মতো ঘটনা বলেই মনে করেন। লিখে খান-এমন লেখকের সংখ্যা সারা দেশে খুব বেশি হবে না। পয়সার বিনিময়ে লেখেন, এমন লেখকরা সাভাবিক কারণেই এক লেখা একাধিক পত্রিকাতে দেন না। দেয়া উচিতও না। কিন্তু ফ্রি লিখেন যারা, তারাতো চাইতেই পারেন অনেক কষ্ট করে লেখা তাদের ফিচারটি যত বেশি সম্ভব পাঠকের সামনে যাক।

সন্ত্রাসীদের ঈদ-
সারা বছর মাস্তানি করলেও ঈদের দিনে দামি পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে সন্ত্রসীরা গিয়ে হাজির হয় ঈদগাহে। নামাজের পরে গণ-কোলাকুলির মাহফিলে মাস্তান বাবাজিকেই বেশি ব্যস্ত দেখা যায়। সকলেই এক ধরণের তোয়াজমাখা মনোভাব নিয়ে তাদের সাথে মেশেন। সবচে’ বেশি সালাম এরাই পায়। চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ অন্যান্য সুকর্মগুলো করে করে উর্ধ্বতন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে বাট দেবার পরও তাদের কাছে যে পরিমাণ পয়সা থাকে, তাতে অনায়াশেই পরবর্তী ঈদ পর্যন্ত তারা ঘরে বসে খেতে পারে। তবে এতোটা অলস তারা নয়। ঈদের পরপর যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি তারা আবার কাজে নেমে পড়ে।

কয়েদীদের ঈদ-
জীবন্ত যারা কবরে আছে,তাদের নাম কয়েদী। কারাগার হচ্ছে জীবন্তদের কবর। সাত বছর কারাভোগ করে বেরনোর পর আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ (আ:)এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো, কারাগার ব্যপারটি কেমন? তিনি তিনটি বাক্য বললেন।
হাজা মানাযিলুল বলওয়া।
তাজ্ররিবাতুল আসিদকা।
মাক্ববারাতুল আহ্ইয়া।
অর্থাৎ জেল বড়ই কষ্টের জায়গা। বন্ধুত্বের পরীক্ষার স্থল এবং জীবিতদের কবর।
ঈদের দিনে কয়েদিদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয় বলে শুনেছি। তবে ঈদের আনন্দ তাদের স্পর্শ করে কি না, আমার জানা নেই। না করারই কথা। মা-বাবা, ভাইবোন, বউবাচ্চা ছাড়া একাকি চার দেয়ালের ভেতরে ভালো লাগার কোনো কারণ নেই। বিশেষত বিনাদোষে জেল খাটছে যারা।

ফেরারীদের ঈদ-
ফেরারীও আবার দুই প্রকার। মামলার কারণে ফেরারী, হামলার ভয়ে ফেরারী। এদের জীবন যাযাবরের মতো। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায় তারা। জানে শান্তি থাকে না। বিড়ালের পায়ের আওয়াজ শুনলেই ভয়ে আতকে উঠে তারা! ভাবে, পুলিশ এসে গেলো কি না! অপরিচিত কেউ তাকাচ্ছে দেখলে চমকে উঠে। ভাবে, প্রতিপক্ষ দলের লোক নয় তো? ঈদের আনন্দ থেকে তারা পুরোপুরি বঞ্চিত।

মহিলাদের ঈদ-
আমাদের সৌভাগ্যযে, আমাদের দেশের নারীরা একটু বেশি সহনশীল প্রকৃতির। খাওয়ার চে’ খাওয়াতেই বেশি পঁছন্দ করেন তারা। রমযান থেকে দেখুন। রমযানের দুপুর থেকেই তাদের শুরু করতে হয় ইফতারি তৈরির কাজ। রোজা রেখে সারাটা দিন কাটাতে হয় জ্বলন্ত চুলোর কাছে। তারপর আবার কাঁচাচানায় লবনটা পরিমাণমতো না হলে ধমকও খেতে হয়! ইফতার করে সকল পুরুষ মানুষ পেট টাইট করে বেরিয়ে যায়। বাসন কোসন পরিস্কার করে ঐ মহিলাগগুলো তারাবির নামাজে দাঁড়ায়। তারাবির পর আবার হালকা থেকে মাঝারি ধরনের নাস্তার আয়োজন করে দিতে হয়। ভক্কর চক্কর করতে করতে এভাবেই অর্ধেক রাত শেষ। দু”এক ঘন্টা বিছানায় গড়াগড়ি করে অথবা স্বামীর বিশেষ সেবা(!)র প্রয়োজন হলে সেখানেও সময় দিতে হয়। তারপর আবারো তাদের ব্যস্ত হয়ে উঠতে হয় সেহরী তৈরির কাজে। এভাবেই কেটে যায় পুরোটা মাস। তাও হাসিমুখে। ঈদের আগের রাতটি তাদের চলে যায় রকমারি পিঠা তেরির মহৎ কাজে।
কুরবানীর ঈদে মসলা বাটা এবং রান্নাবান্না করার পেছনেই ব্যস্ত থাকতে হয় তাদের। দেখা যায় গরু কাটাকাটির কাজ তখনো শেষ হয়নি, এরই মধ্যে কর্তা মশাই কলিজি ভূনার জন্য চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছেন! বড় ছেলের আবার মগজ পছন্দ। বাকিদের চাই গুশত ভূনা। আমার মা গুলোকে/বোন গুলোকে তখন প্রতি ঘন্টা একশ মাইল গতিতে কাজ চালাতে হয়। মেশিনের মতো। ঈদের দিন, সারাদিন তাদের কেটে যায় রান্নাবান্নার কাজে। বাকি সময় মেহমানদের আপ্যায়নে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঈদের নতুন শাড়িটি পর্যন্ত গায়ে তোলার সুযোগ হয়ে ওঠে না।

শিশুদের ঈদ-
ঈদ কাহাকে বলে, উহা কতো প্রকার ও কী কী, সেটা শিশুদেরচে’ ভালো আর কে জানবে? ঈদের প্রকৃত আনন্দ শিশুরাই উপভোগ করে থাকে। ঈদের নতুন জামা-কাপড় কেনার পর সেগুলো স্ব-যত্নে লুকিয়ে রাখে। জান দিয়ে দেবে তবুও তারা সেগুলো ঈদের আগে কাউকে দেখতে দেবে না। ঈদের দিন তারা থাকে মহাব্যস্ত। অবশ্য আমি যাদের কথা বলছি, তারা পয়সা-ওয়লা লোকের ভাগ্যবান বাচ্চা। গরীবের ছেলেমেয়ের কাছে ঈদ অন্য দশটা পাঁচটা দিনের মতোই আরো একটা দিন। 

বুড়বুড়ির ঈদ-
বয়স একটু বেশি হয়ে গেছে। এই ধরেন ৭০/৮০। দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সংসারে তাদেরকে বার্ডেন মনে করা হয়। সারা জীবন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে গায়ের ঘাম পানি করে সংসারের জন্য একটু স্বচ্ছলতা আনতে চেষ্টা করে যাওয়া অই মানুষগুলোকে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে হয় বড় অযত্বনে ,অবহেলায়। ঈদের দিন যখন বড় হয়ে যাওয়া সন্তান তাকে ঠিকমতো একবার এসে জিজ্ঞেসও করে না, তখন তারা বসে বসে ভাবতে থাকেন সেই দিনগুলোর কথা। একসময় এই ছেলে-মেয়ে গুলোর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তারা কত ক- ই-না করেছেন! ঈদের দিন নিজে না পরে সন্তানকে পরিয়েছেন। সন্তানের এক টুকরো হাসির জন্যে নিজের জানটা পর্যন্ত কুরবান করে দিতে তৈরি থেকেছেন। দিন কত তাড়াতাড়ি বদলে যায়!

টুকাইদের ঈদ-
টুকাইদের নিয়ে কেউ ভাবে না বললে ভুল হবে আমি ভাবিন আমার সাধ্য মতো আরো একজন ভাবতেন, হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। একটি বাচ্চা যে আল্লহর কতো বড় নিয়ামত, সেটা তিনি ভালো করেই জানতেন। যে কারণে মাষ্টার শাদ’র মাঝেই তিনি সুখ খুঁজে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে চেয়েছিলেন। এরশাদ সাহেব টুকাইদের জন্যে করেছিলেন পথকলি। এদেশে শেখ রাসেল স্মতি সংসদ আছে, জিয়া শিশু-কিশোর সংঘ আছে, এরশাদের পথকলিও আছে। আবার ছিন্নমূল বস্ত্রহীন টুকাইও আছে। আমি জানি না রাস্তায় পড়ে থাকা আশ্রয়হীন ওসব ছেলে-মেয়ে গুলোর জন্যে যদি কোনো পরিকল্পনাই না থাকবে, তাহলে সময় সময় সরকারকে তেল মারা ছাড়া অসব সংঘঠনের আর কাজটা কী?
টুকাইদের কাজ হচ্ছে রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা- আবর্জনার ভেতর থেকে বেচেঁ থাকার অবলম্বনটুকু খুঁজে বের করা। ঈদ তাদের কাছে আলাদা কিছু নয়। কাধে বস্তা ঝুলিয়ে এদিনও তাদের বেরুতে হয়। কারণ, তা না করলে পেটে খাবার ঝুটবে না। ঘরনাইদের জন্য আবার ঈদ!

রিক্সাওয়ালার ঈদ-

রিক্সাওয়ালাদের ইনকাম কিন্তু খারাপ না। ওরা যদি খাসলতটা ভালো করে পাঁচ বছর রিক্সা চালাতে পারতো, তাহলে নিজেই ৪/৫টি রিক্সার মালিক হয়ে যেতো। কিন্তু সেটা তারা করবে না। দিনে ৩শ টাকা রুজগার করলে রিক্সার রোজ দিয়ে ঘরের জন্য চাল-ডাল কিনবে। এবং অতি অবশ্যই সেকেন্ড ক্লাসের টিকেট কেটে সিনেমা হলে ঢুকবে।
কিছু কিছু রিক্সাওয়ালা ঈদের দিনেও রিক্সা নিয়ে বেরোয়। ঈদের দিন ভাড়া বেশি পাওয়া যায়। অবশ্য কিছু আছে বাস্ত বিকই অসহায়। শরীর মানে না। তবুও তাদের বেরুতে হয়। রিক্সা টানতে হয় সারা দিন। ঈদের সারাটা দিন। সমাজের এই অসহায় অংশটি, দু’দিনের খাবার কখনো একত্র করতে পারে নি। তাই ঈদ তাদের জন্যে আলাদা কিছু নয়। অন্য দশটি- পাঁচটি দিনের মতোই একটি দিন।

চাকরীজীবির ঈদ-
হালকা থেকে মাঝারি ধরনের চাকরিজীবি যারা, অনেক টানাটুনি করে তাদেরকে ঈদের খরচ এডজাষ্ট করতে হয়। বেতন- বোনাস মিলিয়ে কোনো রকমে চালিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। অবশ্য হাই লেভেলের চাকরিজীবি যারা, আমলা শ্রেণী, তাদের কথা ভিন্ন। এদেশে মন্ত্রীদেরচে’ আমলাদের ইনকাম ভালো। যাকে বলে মূলা থেকে মূলার ডাঁটি শক্ত! দেখাযয় যত টাকা তারা বেতন পান, তারচে’ কয়েকগুণ বেশি টাকা তাদের খরচ হয় বিলাসিতার পেছনে। এই অতিরিক্ত টাকা কোথ্যেকে আসে, আল্লাহ মাবুদ ছাড়া কেউ জানে না। যদি জানতো, তাহলে কালে-ভাদ্রে হলেও নিশ্চই খোঁজ নিতো। এই প্রজাতির মানুষ সাধারণত বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে দেশের বাইরেই ঈদ করে থাকেন।

বড়লোকের ঈদ-
ভয়াবহ পরিমাণ সম্পদের অধিকারী অনেক মানুষ আছেন এদেশে। যাদের অনেকের পক্ষে তাদের টোটাল সম্পদের হিসাব মেলানো সম্ভব হয় নি। তারা নিজেরাই জানেন না ব্যাংকে, শেয়ার মার্কেটে, লকারে, আলমিরাতে, ড্রামে, বালিশে, তোষকের ভেতরে তাদের কতো টাকা আছে? উনাদের কথা আমরাও জানতাম না যদি না ওয়ান ইলেভেন আসতো। আর কিছু করতে পারুক আর না পারুক, এই একটি কাজ কিন্তু ফখর উদ্দিন সরকার করতে পেরেছিলো। আমাদের গরিব এই দেশের টাকাগুলো কোথায় আছে, মোটামুটি একটা ফিরিস্কি তুলে ধরতে পেরেছিলো।
ফিরিস্কি শব্দটা আসতেই একজন মানুষের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে গেলো। শব্দটা তিনি এতো বেশি ব্যবহার করতেন যে, আমার কাছে মনে হতো নিরীহ গোছের এই শব্দটি যেন তাঁর জন্যেই তৈরি। তিনি সাইফুর রহমান। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা অর্থনীতিবিদ, আমাদের দেশের সর্বকালের সেরা অর্থমন্ত্রী জনাব এম সাইফুর রহমান। যিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আজকের এই পরিসরে আমরা মানুষটির  আত্মার  শান্তির জন্যে প্রার্থনা করতে পারি। করা দরকারও। আর কেউ জানুক আর না জানুক, আল্লহ পাক তো জানলেন, সিলেটবাসী অকৃতজ্ঞ নয়।
যাদের কথা বলছিলাম। অর্থাৎ যারা প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেন বিলাসিতায়। সুইজারল্যান্ড ছাড়া যাদের হলিডে উদযাপন করা হয় না। সিঙ্গাপুর ছাড়া যাদের বউ’য়ের শাড়ি পাওয়া যায় না। ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়া সন্তানকে ভর্তি করার উপযোগী কলেজ পাওয়া যায় না। এবং অতি অবশ্যই ইফাম,ডরমিকম সিডাকসিন সেডিল জাতীয় অনেকগুলো ট্যাবলেটের সাহায্য না নিলে যাদের ঘুমও হয় না। টাকার পাহাড়ের চূঁড়ার চড়েও, সুখের সাম্রাজ্য গড়াও এতটুকু শান্তির জন্যে ছটপট করছেন যারা, তাদের ঈদ তো বিশাল ব্যাপার-স্যাপার। উনারা আছেন বলেই তো ৪০/৫০ হাজার টাকা মূল্যের জুতোগুলি বিক্রি করার মানুষ পাওয়া যাচ্ছে। তারা না থাকলে, তাদের হাই ক্লাস কন্যারা না থাকলে লাখ টাকা মূল্যের জামাগুলো কে কিনতো! ব্যবসায়ীদের অবস্থা কী হতো? 
ভয়াবহ পরিমাণের সম্পদের মালিক অই সকল মালদারদের বলি, বিশ্বাস করুন, খোদার কসম, এইযে বিশাল অর্থ ভান্ডার গড়ে তুলেছেন আপনি, চোখ বন্ধ করেন এবং দেখতে চেষ্টা করেন, দেখবেন কিছুই আপনার নয়। আপনি পৃথিবীতে থাকতেই উইল জাতীয় কাগজপত্র করিয় নিতে না পারলে আপনি মারা যাবার পর, কবরে আপনার লাশটি বাশি হবার আগেই আপনার সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যাবে। আপনি না যুক্তিবাদি মানুষ! আপনি না বাস্তববাদি! তাহলে এই ব্যাপারটি বুঝেন না কেনো?
অতএব, নিজের জন্যে কিছু করেন। স্রেফ নিজের জন্যে। আর এটা হতে পারে গরিব ও অনাহারীর মুখে খাবার তুলে দেবার মাধ্যমে। এক টুকরো কাপড় কিনে দেয়ার মাধ্যমে। গরিবকে ঈদের আনন্দে একটু শেয়ার করেন।  আত্মার প্রশান্তি আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। অন্যকে খাবার দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখুন। তারপর বুকে হাত রেখে বলুন খেয়ে আরাম না খাইয়ে? একবার কাজটি করেই দেখেন না! আপনি বিস্মিত হয়ে আবিস্কার করবেন এমন আনন্দ এর আগে কখনো আর পান নি।

ফকিরের ঈদ-
ফকির আছে দুই কোয়ালিটির। এক, সত্যিকারের ফকির। যাদের ঘরে খাবার নেই। পরণে কাপড়ে নেই। যে কারণে ঈদের দিনেও তাদের বেরুতে হয় ভিক্ষের থালা নিয়ে। এতটুকু খাবারের আশায় হাজিরা দিতে হয় মানুষের দরজায়। ভিক্ষে করে জীবিকা নির্বাহ করে যারা, ঈদ তাদের সামনে আলাদা কোনো বৈশিষ্ট নিয়ে হাজির হয়ে না। প্রাত্যহিক নিয়মে এ দিনও তাদের ঘুরতে হয় মানুষের বাড়ি বাড়ি। নিজের না হোক, বাচ্চা-কাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে। ক্ষিধের অত্যাচার থেকে সাময়িক মুক্তির জন্যে হলেও তাদের বেরুতে হয় মানুষের এক টুকরো করুণার আশায়। সামান্য এই করুণা টুকুও আবার সবাই করে না।
কিছু আছে পেশাদার ফকির। ভিক্ষাভিত্তিকে যারা পেশা বানিয়ে ফেলেছে। তাদের অনেকের ঘরে টেলিভিশন পর্যন্ত আছে। মোটামুটি চলনসই ফার্নিচার আছে। মোবাইল ফোনতো আর আছেই। ঈদ উপলক্ষে এরা অনেকগুলো শাড়ি-লুঙ্গির বন্দোবস্ত করে ফেলে। টেক্স-কমিশন ও ভাড়া-টারা দিয়েও তাদের হাতে প্রচুর টাকাপয়সা জমে যায়। সে জন্যে ঈদের দিনে এরা আর বের হয় না। স্ত্রী পুত্র নিয়ে এনজয় করে কাট্যয়া।

চলুন এবারের ঈদে পশুর সাথে সাথে আমাদের ভেতরের পশুগুলোকেও কুরবানী করে ফেলি। এবারের ঈদ আমাদের জীবনের শেষ ঈদ হতে ও তো পারে!

কমেন্টস