বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা’ মানে গণতন্ত্রে’র ‘পরাধীনতা’ নয়

প্রকাশঃ জুন ১৪, ২০১৭

এম এম রহমান-

একটি দেশের বিচার ব্যবস্থা মূলত ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার মুখ্য ভূমিকায় তখন’ই অবতীর্ণ হয়, যখন ‘আদালত’ জনগণের ন্যায্য দাবি এবং সাধারণ’ অধিকার প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

জনমানুষের আইনী আশ্রয়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনমনে আস্থার জায়গা সৃষ্টি করে নাগরিকের জীবন ও সম্পদের আইনী নিরাপত্তা বিধানের কার্য তখনই সম্ভব, যখন বিচার বিভাগ সকলের প্রয়োজনে নিবেদিত প্রাণ রুপে আবির্ভূত হয়। একটি কথা আছে, “শাসন করা তার’ই সাজে সোহাগ করে যে”।

ক্ষমতার চর্চা করলে জনমনে ভীতিসঞ্চার করা যায় হয়তো,কিন্তু নাগরিকের মধ্যে  শ্রদ্ধাপরিপূর্ণ ও সম্মানের স্থান দখল করে নেয়ার কৃতিত্ব অর্জন বেশ কঠিন। অপরাধ দমন ও ন্যয় বিচার শুধু জেল ও জরিমানা দিয়ে হয়না। হয়তো, সাময়িকভাবে অপরাধীদের নিবৃত্ত করা যায় বটে, কিন্তু,যার যার প্রাপ্য টুকু বুঝিয়ে দেয়া যায় না।

আমি ন্যয় বিচার বলতে বুঝি, সামাজিক জীবনে মানুষ হিসেবে নাগরিকের প্রাপ্যতা ও অধিকার ফিরিয়ে দেয়া বা বুঝিয়ে দেয়া এবং অন্যের উপর অনধিকার চর্চা থেকে অপরকে নিবৃত্ত করা। এছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরী করা,যাতে নাগরিক আইন এর প্রতি শ্রদ্ধাযুক্ত আনুগত্য প্রকাশ করে এবং অন্যায় কর্মকাণ্ড হতে দূরে থাকে। যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা’ ও  ‘বিচারিক স্বাধীনতা’ উভয়ই  জরুরী। তবে, জণগনের স্বার্থে ও ন্যয় বিচার প্রতিষ্ঠায় ‘বিচারিক স্বাধীনতা’ বেশি জরুরি।

স্বাধীন বিচারিক ব্যবস্থায় শুধু আইনী’ কাঠামোর আওতায় শুধু আইনী পন্থায় যথাযথ ব্যবস্থা নিলেই নাগরিকের ন্যায্য দাবির সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন,যদি আইনী সুরক্ষিত কাঠামোর অভ্যন্তরে বিচার প্রার্থির জন্য প্রকৃত সুরক্ষা না থাকে। সেক্ষেত্রে, অদৃশ্য দেয়ালের মাঝে জণসাধারণ’ এর নতুন পরাধীনতার শৃঙ্খল রচিত হবার আশঙ্কা কম নয়। কেননা, বিচারের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত গোষ্ঠীর নিপীড়ন, বঞ্চনা এবং অবহেলা’র দ্বারা নবরুপে ‘ন্যয় বিচার” প্রভাবিত হতেই পারে। বিচারক যখন শুধু নিজের আমিত্বের কাছে দায়বদ্ধ হয়, সেই অসীম ক্ষমতার ভার সইতে না পেরে সেচ্ছাচারীর ভূমিকায় চলে গেলে বিচার প্রার্থীর “ঈশ্বর”কে বিচার দেয়া ব্যতীত উপায় থাকে না। আর, নাগরিক হিসেবে, এই কষ্টের বোঝা অনেক ভারী। অপরের দেয়া কষ্ট মেনে নেয়া যায়,কিন্তু সংসারের সব চেয়ে আপন মানুষের কাছে অনিরাপদ ও অরিক্ষিত হলে আশ্রয়ের আর জায়গা মেলে না, তখন মানুষ বেশ অসহায় হয়ে পড়ে।

আদালত জনমানুষের শেষ আশ্রয়,জনমানুষের সব চেয়ে আপন। কিন্তু, এদেশের আদালত’ আসলেই কি জনমানুষের মধ্যে সেই শ্রদ্ধা’র জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে?

সাম্প্রতিক “মোবাইল কোর্ট” নিয়ে মহামান্য ‘সুপ্রিম কোর্ট’ এর ‘হাইকোর্ট’এর একটি বেঞ্চ’ এর রায়ের প্রেক্ষিতে বিচার ব্যবস্থার ‘পরিধি’ও বিচারিক কাঠামোর বাস্তবতা সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় পত্রপত্রিকা এবং অনলাইন মিডিয়াগুলোতে ব্যপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। আলোচনায় বিচারিক আদালত, নির্বাহী আদালত, উভয়ের সফলতা ও ব্যর্থতার সুনির্দিষ্ট ‘পরিসংখ্যান ও চিত্র’ উঠে এসেছে।

তবে, আলোচনায় বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণ’ নিয়ে যত কথা হচ্ছে, ‘ন্যয় বিচার” প্রতিষ্ঠা তথা বিচার প্রার্থীর অধিকার নিয়ে ততটা উদ্বিগ্নতা খুব বেশি লক্ষণীয় নয়। বিচার বিভাগের ‘স্বাধীনতা’ বা ‘ক্ষমতার পৃথকীকরণ’, যাইহোক না কেন রাষ্ট্রের বিচার প্রার্থীদের অধিকার সংরক্ষণই মুখ্য বিষয়।

সামাজিক ন্যয় বিচার নিশ্চিত করা’ই সব চেয়ে প্রধান ইস্যু। কিন্তু, ‘সংবিধান’ ও প্রচলিত আইনের ‘অদৃশ্য প্রাচীর’ নির্মাণ করলেই কি ‘আইন এর শাসন’ প্রতিষ্ঠা পাবে? আইনী কাঠামোর আওতায় বিচার বিভাগের উপর অন্যান্য বিভাগের

‘নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব’ এর অবকাশ না থাকলে কি আসলেই বিচার প্রার্থীদের সকল ‘অসহয়াত্ব’ ঘুচে যাবে? সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের ‘অযাচিত প্রভাব’

থেকে রেহায় পেলেই কি “বিচার বিভাগ” সকল প্রতিকূলতা মুক্ত হয়ে যাবে?

এদেশের আপামর জনসাধারণ’এর যত দুর্ভোগ বা বিচার বিভাগের অপারগতার দায় কি শুধুই এর উপর “কালারেবল লেজিসলেশন” ও নির্বাহী’দের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা’র অপপ্রয়াস?

এখন আলোচনায় আশা যাক, আইন’এর শাসন ও ‘ন্যয় বিচার’ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকৃত নিয়ামকগুলো কি কি। অস্ট্রেলিয়া’র ‘Rule of Law Institute of Australia’ নামক প্রতিষ্ঠান আইনের শাসন নিয়ে কয়েকটি নিয়ামক উল্লেখ করেছে:-

১। আইনগুলি স্পষ্ট, প্রচারিত, স্থিতিশীল, সঠিক ও সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়; এবং মানবাধিকারসহ মৌলিক অধিকার রক্ষা, ব্যক্তি এবং সম্পত্তি নিরাপত্তা

নিশ্চিত করা;

 ২। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার পৃথকীকরণ;

৩। আইন ও প্রশাসন নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার তথা জনগণের দ্বারা উন্মুক্ত সমালোচনার সুযোগ;

৪। যথাযথ, নৈতিক, এবং স্বাধীন প্রতিনিধি এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক নিরপেক্ষ  ব্যক্তিদের দ্বারা যথাযথভাবে ‘ন্যয় বিচার’ প্রদান করা হয়;

৫। আইন সমানভাবে প্রয়োগ ও “আইনের আশ্রয়” লাভের সমান অধিকার নিশ্চিত করা;

৬। আইন সম্পর্কে জ্ঞাত হবার সুযোগ, যাতে সবাই মেনে চলতে পারে;

৭। বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ, উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ রুপে প্রতিষ্ঠা করা এবং  ন্যায্য ও দ্রুত বিচার প্রদান করা;

৮। আইনের আওতায় দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি না পাওয়া। কোন নিষ্পাপ  ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়া ; এবং

৯। আইন কেবল একটি খোলা এবং স্বচ্ছ ভাবে

জনগণের ‘প্রতিনিধি’ দ্বারা প্রণয়ন করা।

এখনো এদেশে মান্ধাতার আমলের “দুর্বোধ্য” শব্দজালে আবিষ্ট আইনের পরিভাষা। ‘সহজ ও সরল’ ভাষায় আইন পাঠের অধিকার নিশ্চিত হয়নি।

আদালতের আইনী পরিভাষাগত জটিলতা ঘুচাতে তেমন উদ্যোগও লক্ষণীয় নয়। স্বাধীনতার এত বছর চলে গেলেও, আদালতের তথাকথিত ‘শব্দমালা’র খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। উচ্চ আদালতের ভাষা অধিকাংশই ইংরেজিতে, অথচ একজন বিচার প্রার্থী তার ‘শাস্তি ও প্রাপ্যতা’ নিজে পড়ে বুঝার অধিকার রাখে।

তা ছাড়া, আইনের বিষয়ে সচেতনতা।

জনগণ যদি অপরাধ নাই বুঝে, তবে আইন প্রতিপালন করবে কিভাবে? তাইতো, আইনপেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের উপর ‘নির্ভরশীল’ হয়ে আইনী লড়ায় চালিয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে, আইনজীবীরা এই নির্ভরতাকে ‘পুজি’ করে নিজের স্বার্থেই বিচার কার্যক্রম ‘প্রলম্বিত’ করে থাকে। ‘আদালত অবমাননা'(কন্টেম্প অফ কোর্ট)’র ভয়ে

অন্যান্য বিভাগসহ সাধারণ মানুষ ‘আইন ও আদালত’ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনাও করতে সাহস করে না। কোন ব্যক্তি আদালতে’র দ্বারা হেয় বা হয়রানী হলে, তা নিয়ে ‘অভিযোগ’ তুলবার সুযোগ সীমিত।

আদালতে’র সময়ের কোন সীমা নির্ধারণ (সিটিজেন চার্টার) নেই। একটি মামলা কতদিনে নিষ্পত্তি হতে হবে, তা সুনির্দিষ্ট করা’র আইনগত ‘বাধ্যবাধকতা’ সীমিত। এমন নজীরও আছে, বিজ্ঞ বিচারক সময় মত পূর্ণাঙ্গ রায় না লিখে ‘রিটায়ারমেন্ট’এ  চলে গিয়েছেন। আইন প্রতিপালনে নাগরিক হিসেবে “দায়িত্ব ও কর্তব্য” সম্পর্কে জ্ঞান একেবারেই সীমিত। অপরাধের ধরণ ও শাস্তি বিষয়ে ন্যূনতম জ্ঞান অধিকাংশের মধ্যে নেই। আইনী পদক্ষেপ এ একজন বিচারপ্রার্থির অধিকার কি; কোন প্রক্রিয়ায়, কোন আদালতের দারস্থ হতে হয় মানুষ জানে না; তার আদৌ বিচার পাবার অধিকার আছে কিনা; থাকলে কতটুকু পাবার পাবার যোগ্য; সমাধান কোন আদালত’ এ প্রভৃতি বিষয়ে ধারণা নেই বললেই চলে।

কোন ভিক্টিম থানায় খুব আন্তরিক পরিবেশে আশ্রয়’ খুজে পায় না আজও। তাদের  ‘অসচেতনতা’কে ‘পুঁজি’ করে ব্যবসা চলে ‘হরদম’। এদেশের একজন ‘বিচার প্রার্থী’ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে, তিনি এজাহার’র যা কিছু দাবি করেছেন বা বক্তব্য’ দিয়েছেন তার প্রতিটি শব্দ সত্য। এজাহারে কিছু মনগড়া উক্তি, তথাকথিত কিছু অতিরঞ্জিত শব্দচয়নের মাঝে ‘আটকা’ পড়ে বিচারের আসল সত্য’। যে বিচার কার্যক্রম’ শুরু হয় মিথ্যে দিয়ে, সেখানে বিচারপ্রার্থীর ন্যায্য বিচার পাবার প্রত্যাশায়’ বা কতটুকু যৌক্তিক? ‘তদন্ত’ বিচার কাজের অন্যতম প্রধান ‘নিয়ামক’, সেটির নিরপেক্ষতাও কিন্তু অনেক জরুরি। তদন্তে’র জাতাকলে’ পিস্ট হয় ‘বাদী ও বিবাদী উভয়’ই।

‘এজাহার’এ যত আসামির নাম দেয়া যায়,তত’ই মঙ্গল! তখন সবার ভিড়ে ‘সত্য’কে ছাপিয়ে বেচে যায় মূল ‘অপরাধী’। বিচারের আগেই শুরু হয় ‘শাস্তি’ (হাজত  বাস)। আবার, জামিনযোগ্য অনেক মামলার ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যায় ‘প্রকৃত অপরাধী’। মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত নিরপরাধ হয়েও ‘শাস্তি’ পায় ও হয়রানী হয়। মিথ্যে মামলায় জর্জরিত অসহায় মানুষ’এর হাহাকার’ হয়তো, বিচারকের পর্যন্ত আদৌ’ পৌছায়না। ‘জুরিস্পপ্রুডেন্স’ এর ‘মূলনীতি’হল: Let the 100 culprits go free, No innocent should be wrongly  punished”। কিন্তু, এই নীতি

কি আদৌ’ মানা হয়? বিচার-এর ‘দীর্ঘসূত্রিতা’ নিয়ে অধিকাংশ বিচার প্রার্থির মধ্যে আক্ষেপ’ আছে। কিন্তু, আমরা প্রায়শই বলি,”Justice delayed is justice denied”।

বর্তমানে বাংলাদেশে সব আদালত মিলিয়ে মোট ‘পেন্ডিং’ মামলা’র সংখ্যা ৩০ লক্ষাধিক। শুধু তাই নয়, অনেক মামলার নিষ্পত্তি গত ৮/১০ বছরে হয়নি, সে সংখ্যাও খুব কম হবে না। আর এভাবে মানুষ যখন সঠিক সময়ে সঠিক বিচার পাইনা,তখন বিচার ‘পাওয়া বা না পাওয়া’ একই’  হয়ে যায়। কেননা, তত দিনে তার হয় ঘা’ শুকিয়ে যায়, নতুবা, যে সম্পত্তি’ অধিকারে ‘বছরের পর বছর’ অফিস-আদালতে ঘুরে যে পরিমান অর্থের ব্যয় হয়, তা নালিশী সম্পত্তি’র মূল্যের চেয়ে খুব কম নয়। তা ছাড়া, যে সময়ে গিয়ে তার প্রাপ্যটুকু পায়, তখন

ভোগের আকাঙ্ক্ষা ‘ফ্যাকাসে’ হয়ে যায়।

আইন এর শাসন’ এর খুব গুরুত্বপূর্ণ নিয়াময় হল, সময়মত বিচারপ্রার্থির জাস্টিস সিস্টেমে অনায়াসলভ্য ‘প্রবেশাধিকার’। কিন্তু, আদালতের ‘মান্ধাতার’ আমলের ‘আমলাতান্ত্রিক’ জটিলতায় হয়রানীর ভয়ে মানুষ নিতান্ত দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে’ আদালতের দারস্থ’ হতে চাইনা। ফলে, বিচার প্রক্রিয়া থেকে মানুষ’ দূরে সরে গিয়ে নিজেই ‘বিচার’ হাতে তুলে নিতে ‘উদ্ধত’ হচ্ছে। তাইতো, ২০০২ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ‘অপরাধে’এর মাত্রা প্রায় দিগুন’। আদালতে’এর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস হারানোর প্রবণতাও আইন এর শাসন প্রতিষ্ঠার পথে অনেক বড় বাধা’।

‘আইন’ সম্পর্কে অজ্ঞতা’র দায় জনগণের হলেও রাষ্ট্রের দায়’ কম নয়। একজন নাগরিক ‘আইন’ জানবে এমন পরিবেশ’ সৃষ্টির উদ্যোগ খুব দেখা যায় না।

শুধু বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই যে, বিচারের স্বাধীনতা নিশ্চিত’ হয়, তেমনটি বলা চলে না, ‘নির্বাহী বিভাগ’ ও ‘আইন বিভাগ’- এর নিয়ন্ত্রণ হতে স্বশাসিত রুপ পেলেও, ওই স্বাধীন আইনী কাঠামোর মধ্যে জনগণের হয়রানীর এখনো অনেক অবকাশ’ আমাদের বাস্তবতায় বিদ্যমান। “সুপ্রিম কোর্ট” এ বিজ্ঞ বিচারক নিয়োগে সংবিধান’ যে যোগ্যতার কথা বলেছে তা হল: ১০ বছরের বিচারিক বা আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতা। বর্তমানে, উচ্চ আদালতের প্রায় ৮০ ভাগ বিজ্ঞ বিচারক’ আইনপেশা (আইনজীবী) থেকে আগত। দুদিন আগে একই ল’ ফার্মে কলিগ হিসেবে যিনি কাজ করেছেন, দু’দিন পরেই একজন বিচারক’ হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছে, অপরজন ‘প্রাক্টিস’এ আছে।ঐ দু’জন এর মধ্যে যে সম্পর্ক’ এতদিনে তৈরি হয়েছে, তা কি খুব সহজে ভুলে গিয়ে নিরপেক্ষতা’র উর্ধ্বে উঠা সহজ?  এখানে কি বিচারকে’র বিচার কার্যকে প্রভাবিত করার অবকাশ থেকে যায় না?

বিচারক’ হিসেবে একজন জন সম্পৃক্ততা থেকে আলাদা থাকতে পারেন চাইলে, কিন্তু  আমাদের বাস্তবতায়, পেশকার ও সেরেস্তাদার বা অধস্তন সহকারী দ্বারা কি বিচারক প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা’ কি নাকচ করা যায়? বিচারক’ এর নিরেপেক্ষ হবার  নৈতিক ‘দায়-দায়িত্ব’ দুই’ই আছে কিন্তু, আদালতের সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কি ‘নিরেপেক্ষতা’ বজায় রাখতে বাধ্য? সকল বিচার প্রার্থী কি তাদের নিকট থেকে সমান আচরণ পায়? আদালতে আগত সকল সেবাপ্রার্থী’র ‘অধিকার’ তাদের কাছে কি সমান?

একজন বিচারক সারাজীবন যে লোভ ও লালসার উর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ হবেন, এমনটা আশা করা খুব যৌক্তিক নয়। যদি নৈতিক পরাজয় হয়,তবে সেই  বিচারিক স্বাধীনতা জনগণের সীমাহীন পরাধীনতার কারণ বৈকি।

বিচারের শুরুতে’ই বাদীর জীবনের নিরাপত্তা’র খাতিরে অনেক মিথ্যে মামলার ‘অভিযুক্ত’ আসামি হয়ে মাস’এর পর মাস জেল-হাজতে’র ‘ঘানি’ টানছে।

অথচ, শেষে গিয়ে যখন তার অপরাধ প্রমাণিত হয় না, তখন ইতোমধ্যেই হাজত বাস’ এর দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে?

তা ছাড়া, বিবাদী ও বাদীর উভয়েই আইনী পদক্ষেপ এ কোর্ট’ এর দেয়ালের সীমানায় পয়সা ঢেলে যখন কিছুই পায় না, আবার নিরপরাধ ও নিষ্পাপ বিবাদীর পকেটের পয়সা, মূল্যবান সময় বিনাকারণে নষ্ট হয়ে যায়, তখন কি তার এই বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি আদৌ থাকে?

আইনজীবীদের পেশাভিত্তিক রাজনীতি ও পক্ষপাতিত্ব, বার কাউন্সিল প্রেসার গ্রুপ, বিচারিক খরচের হার, জনবলের সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব, দুর্নীতি, দালালদের দৌরত্ম প্রভৃতি এমন অনেক দুর্বলতা ও সংকট আদালতের অভ্যন্তরে বিদ্যমান। বিচার বিভাগ’এর স্বাধীনতা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু, সত্যিকারের ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে, এর পাশাপাশি বিচার কার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট আরো অনেক বিষয়ই গুরুত্বের দাবি রাখে।

সম্প্রতি ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের রায়সহ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রেক্ষিতে শুনানীতে রাষ্ট্র পক্ষ ও বিচার বিভাগের টানা পোড়েনে আমরা শঙ্কিত। কর্নেল ড্যান এর একটি কথা বেশ প্রাসঙ্গিক, তিনি তার সম্প্রতি প্রকাশিত “The Swords of American Patriots” নামক প্রবন্ধে জুডিশিয়ারির এনার্কি নিয়ে আক্ষেপ করে তিনি লিখেছিলেন –

“when those that are solemnly charged with upholding the law ignore the law; then there is no law; there is only lawlessness.”

 এই রায় এর ফলে মহান সংসদ এর উপর বিচার বিভাগের আস্থা’র সংকট প্রকাশিত। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় “লেজিস্লেটিভ’ নাকি “জুডিশিয়াল লেজিসলেচার” বেশি প্রাধান্য পাবে সেটি যখন প্রশ্নের জন্ম দেয়,তখন সাধারণ এর মধ্যেও কিন্তু মহান সংসদ এর কার্যক্রম নিয়ে ‘অনাস্থা’ সৃষ্টি হয়। এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের কোন বিভাগ’ এর জন্যই শুভ নয়।

সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান’এর বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর, এই সংকট ও দ্বন্দ্ব দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আবশ্যক, তবে, সেটি জণগনের প্রতিনিধি সভা তথা সংসদ- এর কার্যক্রম কে পরাধীন করে নয়। এবং শুধু ক্ষমতার চর্চা ও দ্বন্দ্বের মাধ্যমে না হয়ে ‘ন্যয় বিচারের স্বার্থে ও জনগণের আদালত মহান সংসদের মাধ্যমেই নির্ধারণ হওয়া উচিত, কোন পন্থায়, কোন কর্তৃপক্ষের নিকট ‘আদালত’ জবাবদিহি করবে। তবেই, আদালত প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে এবং এদেশের সাধারণ মানুষ আদালতে’র নিকট থেকে ন্যায্য ও প্রাপ্য সুবিধা পাবে।

কমেন্টস