একটি সহানুভূতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখি

প্রকাশঃ জুন ১২, ২০১৭

উইলিয়াম নকরেক-

সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা বলছে, দেশে অনেক উন্নয়ন হচ্ছে।এইবার সংসদে অর্থমন্ত্রী ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন।প্রশ্ন হচ্ছে এ উন্নয়ন কাদের জন্য? কেউ কি রাঙামাটির লংগদুর আদিবাসীদের গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, তারা কেমন আছে। তাদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকটি ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তারমধ্যে একটি ছবি ও ভিডিওতে দেখলাম, আদিবাসীরা তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে জীবনের নিরাপত্তার জন্য পালিয়ে যাচ্ছে। আর পিছনে ফিরে হু হু করে কাঁদছিলো। সেখানে কত স্মৃতি। কত যত্নে সংসার সাজিয়ে ছিলেন কিন্তু নিমিষেই তা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

একটি সংবাদ মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলো আর কাঁদছিলো বলছিলো, আমি এখন কোথায় যাবো, সবকিছু তো পুড়ে ছাই হয়ে গেলো, মা-বাবা কেমন আছে জানি না। এ আদিবাসী মেয়েটির ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ার সাথে তার স্বপ্ন যেন পুড়ে না যায়। তার স্বপ্ন দেখার অধিকার কেউ যেন কেড়ে নিতে না পারে।কিন্তু কার উপর ভরসা করবো? যে রাষ্ট্র নিজেই অনুভূতিহীন।আরেকজন ছাত্র বললো, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় ছুটিতে আমার বন্ধুরা যখন বাড়ি যাচ্ছে, আমি তখন বাড়ি ঘর হারিয়ে নিঃস্ব, সম্বলহীন, অসহায়। আমাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার মা-বাবাসহ গ্রামের লোকজন সব হারিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। বন আলু খেয়ে প্রাণটুকু বাঁচিয়ে রেখেছে।এখন আমি কি কলম রেখে অস্ত্র হাতে তুলে নিব?’’ কলম নাকি অস্ত্র এর উত্তর কে দিবে?

কী কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ দেশ ছাড়ে তা নিশ্চয় আমরা উপলব্ধি করি। জন্মভূমিতে যখন নিজেরই ভবিষ্যৎ অন্ধকার, অনিশ্চিত, তখন কী করবে একজন সংখ্যালঘু আদিবাসী মানুষ তার সন্তানদের কথা ভেবে? আদিবাসীদের ওপর আক্রমণ বাড়ছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়ছে। শ্রীমঙ্গলের খাসিয়া পুঞ্জি আক্রমণ, রাজবাড়ীতে আদিবাসী মা ও মেয়েকে নির্যাতন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আদিবাসী ইউপি সদস্য ও নেত্রীর ওপর আক্রমণ, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে আদিবাসী হত্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামে অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘন, গাজীপুরে আদিবাসীদের ভূমি দখল, মধুপুরে ৯ হাজার একশত ৪৫.০৭ একর ভূমিকে রির্জাভ ফরেস্ট ঘোষণা, রাখাইনদের জমি দখল এসব ঘটনার প্রতিবাদ হয়েছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে খবরও প্রকাশ হয়েছে।কিন্তু এর কোনো প্রতিকার নেই। প্রতিকারের সম্ভাবনাও আমরা দেখছি না। রাষ্ট্র নির্বিকার।আদিবাসীরা কার কাছে যাবে? দেশের নাগরিকদের একটি অংশকে অপমান, অস্বীকৃতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রাখা নিশ্চয় গণতান্ত্রিক কোনো রাষ্ট্রের চরিত্র হতে পারে না।

আনন্দের সংবাদ হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে জানতে পেরেছি, কিছু সহৃদয়বান ব্যক্তি লংগদুতে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। আদিবাসী ছাত্রবন্ধুরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি বন্ধুদের নিয়ে টাকা তুলে লংগদুর মানুষদের জন্য পাঠিয়েছে। অনেক বাঙালিবন্ধু লংগদুতে আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার কিছু বাঙালি বন্ধুরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছে তারা কীভাবে লংগদুর মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পারে। আমি বলেছি, যে আদিবাসীরা সরকারের ত্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে। দেখেন তাদের জন্য কিছু করতে পারেন কিনা।আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ান।এটা সত্যিই আদিবাসী মানুষদের জন্য পরম পাওয়া। আমরা বিশ্বাস করি এদেশে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছে।যাদের হৃদয়-মন মানবতার জন্য, অসহায় মানুষদের জন্য ডুকরে কেঁদে উঠে।আমরা আশা হারাতে চাই না।নিশ্চয় একদিন প্রকৃত মানুষেরা জেগে উঠবে। সেদিন মানুষে মানুষে এতো ভেদাভেদ, বৈষম্য রেষারেষি থাকবে না। ভূপেন হাজারিকার মত গেয়েউঠবে, ‘মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য”।

পাহাড় মানেই মনোরম পরিবেশ, আর এ পাহাড়ের প্রতিটি ভাজ, প্রতিটি বৃক্ষ, ঝিরি ঝরণা, সবুজপ্রকৃতি আদিবাসীদের শোষণের সাক্ষী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আদিবাসী নারীদের সারিবদ্ধ নাচ দেখে অনেকেরই চোখ জুড়িয়ে যায়, কিস্তু আদিবাসী এ নারীদের নাচের প্রতিটি মুদ্রায়ই শাসক গোষ্ঠীর শোষণের দৃশ্য ফুটে উঠে। আমরা সেইদিনের অপেক্ষায় যেদিন কথায় নয় কাজে এ রাষ্ট্র অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ দিবে। তার সকল অত্যাচারের জন্য লজ্জিত হবে, সংখ্যালঘু আদিবাসীদের কাছে তাদের ভুলের জন্য ভুল স্বীকার করবে। এদেশের সত্যিকারের মানুষেরা আদিবাসীদের পাশে দাঁড়াবে, আদিবাসীদের হয়ে কথা বলবে। আশা রাখতে চাই, সেদিন কোনো মিথ্যে অপবাদে সংখ্যালঘু আদিবাসীদের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়বে না, আদিবাসী নারীরা মাথা উঁচু করে চলবে, ধর্ষণ নামের কোনো শব্দ থাকবে না, ভূমির জন্য অত্যাচিরত হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না, উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করা হবে না। এরকমই একটি সহানুভূতিশীল রাষ্ট্র ও সমাজের স্বপ্ন দেখি। ভূপেন হাজারিকার গানের মত যেন বাঙালি বন্ধুরা এগিয়েএ সে যেন বলতে পারে ‘শিশিরে ভেজানো রাতে সংখ্যালঘু কোনো সম্প্রদায়ের ভয়ার্ত মানুষের না ফোটা আর্তনাদ যখন গুমরে কাঁদে আমি যেন তার নিরপাত্তা হই নিরাপত্তা হই’।

লেখক: আদিবাসী ছাত্র সংগঠক

Advertisement

কমেন্টস