আমার দেখা বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ২২ বছর

প্রকাশঃ জুন ৪, ২০১৭

হাকিম মাহি-

১৯৯৬ সাল, আমার বয়স ৫ বছর, আমি তখন ন্যাংটি পরি বা মাঝে মাঝে কিছু না পরেই খালি গায়ে গ্রামের রাস্তায় ছুটাছুটি বা সমবয়সীদের সাথে খেলায় মেতে যাই। কিন্তু মনে করতে পারি ১২ জুন বাংলাদেশের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের আগের রাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনয়ন প্রাপ্তরা আমাদের বাসায় এসে নিজেদের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্যে যত রকমের উপঢৌকন আছে যে যার মতো করে দিয়ে গেলো এবং এ সমস্ত উপঢৌকন না নিতে চাইলে হুমকিও দিতে ভুলেনি তাঁরা।

সকাল হয়ে গেলো, ঈদের মতো আমেজ নিয়ে ভোট দেওয়ার জন্যে মায়ের সাথে কেন্দ্রে চলে গেলাম। নিয়মতান্ত্রিক সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে গেলো। ভোট শুরু হওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই দৌড়াদৌড়ি, ছুটাছুটি এবং ঠুসঠাস গুলির শব্দ। মা আমাকে কোলে নিয়ে কোন রকম নিরাপদ স্থানে চলে গেলেন। আমার মধ্যে তো জানার আগ্রহ কি হচ্ছে ভোট কেন্দ্রে। মাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলাম দেখার জন্যে। আমার বাড়ি যেহেতু মাদারীপুরের শিবচরে, সেহেতু আওয়ামী লীগের প্রভাব একটু বেশি।

তাই ওরা কেন্দ্রে ঢুকে সকল এজেন্ট বের করে দিয়ে এক এক জনে ২০/২৫ টি করে ভোট দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। সবাই আমার পরিচিত তাই ওদের সাথে আমি নিজেও ভোট ৫ টা দিয়ে দিলাম। আহা কি মহা আনন্দ জন্মের পরে কোন কিছু না বুঝে ওঠার আগেই ভোটার হয়ে গেলাম। প্যান্ট খুলে আনন্দ বাতাসে উড়িয়ে দিলাম।
কেন্দ্র থেকে বের হয়ে কাউকে দেখছি না, কিরে সবায় গেলো কোথায়? হঠাৎ দেখি পুলিশের পোশাক না, কিন্তু মাথায় হেলমেট এবং হাতে বড় বড় লাঠি ও বন্দুক। বুঝে নিলাম এরাই বিডিআর। কারণ, মায়ের কাছে শুনেছিলান বিডিআর এর কথা। এরা নাকি খুবই ভয়ানক। তাঁদের মধ্যে বড় বড় গোঁফ ওয়ালা একজন সৈনিক আমাকে ডেকে পাঠাল। আমি তো ভয়ে কাচুমাচু করছি। ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করল কেন্দ্রে কি হইছে? আমি সত্যি সব বলে দেয়েছি। এমনকি আমি যে ৫টা ভোট দিয়েছি তাও প্রমাণসহ হাতের কালি দেখিয়ে বিশ্বাসযোগ্য করিয়েছি। ওরা আমাকে মারবেকি হাসতে হাসতেই চিৎপটাং। ল্যাংটা যেহেতু ছিলাম কেউ কেউ আমার নুনু ধরেও টান মারতে লাগলো। দুপুরের পরে ভোট আবার শুরু হল কিন্তু ব্যালট বক্স সে পর্যন্ত ভরে টইটুম্বুর। বিকেল গড়িয়ে রাত হতে না হতেই রেডিও, টেলিভিশনে প্রচার হয়ে গেলো ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪৬ আসন পেয়ে, বাংলাদেশ জামায়েতি ইসলামির কাঁধে ভর করে আওয়ামী লীগের জয়। বিএনপি পেল ১১৬ আসন। বুঝার আর বাকি থাকল না যে এটাকেই নির্বাচন বলে।

সম্ভবত ১৯৯৯ সালের দিকে ইসলামপ্রিয় মানুষগুলোর মনে আঘাত দিতে মহাজোটের শরীক দল বামপন্থীরা কুকুরের মাথায় টুপি পড়িয়ে দেয়। যার কারণে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে ইসলাম পন্থিরা। আওয়ামী লীগের এহেন আপত্তিজনক কাজের ফল হিসেবে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জনগণের জন্যে খালকেটে কুমির আনে নির্বাচন কমিশন। আমি এখানে নির্বাচন কমিশনের কথা এ কারণেই বলেছি, দেশের জনগণের ভোটে বাংলাদেশে কোন সরকার ক্ষমতায় আসেনি। মানে, জনগণ ঠিকমত কখনো ভোটই দিতে পারেনি। এই নির্বাচনেও একইভাবে বিএনপি সমর্থিত ক্যাডার বাহিনী অবৈধ অস্ত্রের মুখে ভোট, ব্যালট বক্স ছিনিয়ে নিয়ে, আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি ন্যাক্কারজনকভাবে শান্তিপ্রিয় মানুষের লাশের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই বিরোধী দলের বাড়িঘর লুট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ভয় দেখিয়ে বাড়ি ছাড়া করেছে অগুণিত মানুষ। ৭১ এর ঘাতক মানবতা বিরোধীদের মন্ত্রীর আসনে বসিয়ে গাড়িতে তুলে দিয়েছে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন দেশের পতাকা। অবমাননা করেছে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে মারার জন্যে ঢাকায় অনুষ্ঠিত শোকসভায় গ্রেনেট হামলা করে ক্ষমতাসীন দল। তারেক ও কোকোকে দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে বেগম খালেদা জিয়া। নিজের দলের ক্যাডার বাহিনী এতটাই ভয়ানক হয়েছিল যে, তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্যে একই বছর ২০০৪ সালে র‍্যাব প্রতিষ্ঠা করে বিএনপি সরকার। ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়া যতটাই ঘনিয়ে আসতে থাকে বিএনপি ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে ততটাই ঘৃণ্য অপকর্ম করতে থাকে। ২০০৬ সালে মেয়াদ শেষ হলে নিজেদের সমর্থিত সাজানো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেটা মেনে নেয়নি এবং মানার মতো অবস্থাও ছিল না। ফলে, ২০০৭ সালে (১৯৭৫-১৯৯০) সালের মধ্যবর্তী ১৫ বছরের ন্যায় আবারও অলিখিতভাবে ক্ষমতায় আসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামী ফখরুদ্দীন, মইনুদ্দিনের সেনাশাসন।

আমি ১৯৭৫ সালের পর খন্দকার মুস্তাক, জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন দেখিনি কিন্তু ২০০৭-২০০৮ সালের ফখরুদ্দীন, মইনুদ্দিনের দুঃশাসন দেখেছি। যারা বিগত দু’বছর ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে জনগণকে ১৪ শিকবিহীন সারাদেশ নামক কারাগারে আবদ্ধ রেখেছিল। দুই প্রধানমন্ত্রীকে দেশে এবং দেশের বাহিরে অন্তরীণ রেখে বন্য হায়নাদের মতো সব কিছু লুটেপুটে খেয়েছিল। সর্বশেষ নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুছকে সেনা শাসনের খলনায়ক বানিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে দলত্যাগীদের নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে সেনা শাসনকে বৈধতা দিতে চেয়েছিল। যা বাংলার জনগণ মেনে নেয়নি। ফলে, ২০০৭ সালের ২০ ও ২১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে ছাত্র সেনা সংঘর্ষ হয়। এর পর থেকেই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ফখরুদ্দীন, মইনুদ্দিন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩০ আসনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে। প্রথমেই আজীবন ক্ষমতায় থাকতে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কথিত বিডিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে ৫৭ জন সেনাবাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে। কারা এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা তা এখনও প্রকাশ হয়নি। যা হয়েছে তা কেবলই সাজানো। তারপর একের পর এক শুরু করে জঘন্য কীর্তিকাণ্ড। এরপর ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার শুরু করে। এটি ছিল মহাজোটের সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই বিচার ছিল এক পেশে। বিরোধী দলকে ঘায়েল করাই ছিল এই বিচারের মূল লক্ষ্য। যার কারণে, নিজের দলের স্বঘোষিত মানবতাবিরোধীদের বিচার করেনি আওয়ামী লীগ সরকার।

পক্ষান্তরে, এই বিচারকে বানচাল করতে বিএনপি জামাত জোট ২০১২ সালের ৫ মে হেফাজতকে উস্কানি দিয়ে মাঠে নামিয়ে দেয় এবং ২০১৩, ১৪ এই দুই বছর হরতাল, ধর্মঘট, পেট্রোলবোমা দিয়ে কেঁড়ে নেয় শত শত মানুষের প্রাণ। অর্থনৈতিকভাবে দেশকে করে দেয় পঙ্গু।

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্রকে পরিপূর্ণভাবে নির্বাসনে দিয়ে প্রহসনের এক পাতানো নির্বাচন দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এই নির্বাচনের ধরন ছিল, ‘বিচার যাই হোক, তালগাছ আমার’। এই কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ১৫৩ টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লুফে নেয় মহাজোট। এ যেন ফাঁকা মাঠে গোল। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী দল হয়েও সরকারি মন্ত্রীসভার সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে রাজনৈতিক খেলার মাঠে ফুটবল সেজেছেন। মাঝে থেকে জনগণ নামধারী গণতান্ত্রিক রাজনীতির রোষানলে পিষ্ট হয়ে নাকানি আর চুবানি খাচ্ছে। এটাই হল আমাদের দেশের সমসাময়িক রাজনীতি ও গণতন্ত্র।

লেখক- শিক্ষার্থী: জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও কর্মী ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’।
ই-মেইল: [email protected]

Advertisement

কমেন্টস