চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক একাডেমি পদক ১৪২৪ ও একজন সিকদার আবুল বাশার

প্রকাশঃ মে ৪, ২০১৭

প্রদীপ দেওয়ানজী-

গতিধারা একটি প্রকাশনী বলে পরিচিত। কিন্তু প্রকাশনা ব্যবসার বাইরেও যে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে অনিন্দ্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে গতিধারা তার প্রমাণ। সিকদার আবুল বাশার প্রকাশনার জগতে নিজেকে অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ তাকে সব্যসাচী প্রকাশক বলে থাকে।

সিকদার আবুল বাশারের সাথে আমার পরিচয় ২০০৩ সালে আমার লেখা তিনটি ছোট নাটকের একটি বই প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁর সাথে আমার সখ্যতা হয়। তার পর তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ইতিহাস ঐতিহ্যের বইয়ের ভাণ্ডার দেশে আমি প্রতিবছর নতুনভাবে বিমোহিত হয়েছি। তিনি ৬৪ জেলার ইতিহাস ঐতিহ্যের পাশাপাশি দেশের মুক্তিযুদ্ধের জেলা ইতিহাস প্রকাশ করে চলেছেন।

চট্টগ্রামবাসী তার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবেন কথাটা আমি যুক্তি ছাড়াই বলতে পারি। চৌধূরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি প্রণীত চট্টগ্রামের ইতিহাস বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে সুন্দর একটি গল্প রয়েছে। চৌধূরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি ১৯২০ সালে নিজ অর্থায়নের চট্টগ্রামের ইতিহাস বইটি প্রকাশ করতে গিয়ে ভূমিকায় লিখেছিলেন, আজকে হয়তো এই বইয়ের মূল্য কেউ তেমন অনুধাবন করতে পারবে না তা আমি জানি। তবে আমি যে পরিশ্রম করে বইটি প্রকাশ করেছি আমার পরিশ্রম বৃথা যাবে না। আজকে থেকে শত বছর পরে হলেও বইটি নিয়ে আলোচনা হবে। মানুষ পড়বে। আমার বাই পাঠকনন্দীত হবে।

শ্রীপূর্ণচন্দ বাবুর সেই কথা সিকদার আবুল বাশারের হাত ধরে সফল হয়েছে। ১৯২০ সালে চট্টগ্রামের অজানা প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বই দশ, বিশ বছরেই হারিয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। পূর্ণ বাবুর চতুর্থ প্রজন্মের কেউ এখন আর চট্টগ্রামে বসবাস করে না। হয়তো দ্বিতীয় প্রজন্ম দেশ ছেড়ে গিয়েছিল দেশ ভাগের সময়। চট্টগ্রামের ইতিহাসের মূল্যবান গ্রন্থটি হারিয়ে গিয়েছিল ১৯৫০ এর দশকে। দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের অনুসন্ধানী প্রকাশক তার এক লেখক থেকে ২০০৬ সালে জানতে পারলেন, চট্টগ্রামের একটি পুরানো ছেড়া পাণ্ডুলিপি লেখকের এক দূঃসম্পর্কীয় নাতির কাছে আছে। তিনি রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। খবর পাওয়ার পর চৌধূরী শ্রীপূর্ণচন্দর সেই নাতীর খোঁজ নিতে নেমে গেলেন বাশার। দীর্ঘ এক বছর প্রচেষ্টার পর ২০০৭ সালে পাণ্ডুলিপি হাতে পাওয়ার এক মাসের মধ্যেই তা প্রকাশ করেন। ছেড়া মলিন পাণ্ডুলিপি চকচকে মলাটের নতুন বইয়ের রুপ পেল।

চট্টগ্রামবাসী হারানো ইতিহাস খুঁজে পেয়ে বই কিনতে কৃপণতা করেনি। দুই বছরেই প্রথম এডিশন শেষ। এখন তৃতীয় এডিশন চলছে। এভাবেই তিনি আলীউর রহমান রচিত ইতিহাস ঐতিহ্যে কর্ণফুলী বইটিও প্রকাশ করেছেন। প্রকাশ করেছেন রাঙ্গামাটির ইতিহাস ঐতিহ্য, রামুর ইতিহাস, চট্টগ্রামের ভাষা অভিধানসহ ২০টির অধিক গ্রন্থ। চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক একাডেমি এই ইতিহাসের হীরক সন্ধ্যানী সিকদার আবুল বাশারকে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক একাডেমি পদক ১৪২৪ বাংলা প্রদান করছে জেনে আমি খুবই আনন্দিত। তাঁর হাত ধরেই চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন এক স্বর্ণযুগের উত্তোরিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক: প্রবন্ধকার ও নাট্যব্যক্তিত্ব

কমেন্টস