কৃষকের কান্না কেন আমাদের স্পর্শ করে না

প্রকাশঃ এপ্রিল ২২, ২০১৭

মো. আল আমিন-

মানুষ যখন গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে তখন নিজের গ্রামটা বড় আপন মনে হয়। এরপর যখন শহরের সীমানা ছেড়ে পরবাসী হয় তখন বুঝতে পারে দেশের প্রতি দরদ। এই দরদ থেকেই কোরিয়ার একভাই মাঝখানের ছবিটি পাঠিয়েছেন। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলবিবাজারের প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান এই মুহুর্তে পানির নীচে।

কারণ-চরম অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির ফলে ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ স্রোতের প্রথম ধাক্কায় তলিয়ে গেছে। হাউর অঞ্চলের বাতাসে ভাসছে অসংখ্য মানুষের কান্না। পেটে খাবার নাই, জমিনে ধান নাই, , মাথার ওপর ছাদ নাই। তবে মাথার ওপরে আছে মহাজন, এনজিও, ব্যাংকের ঋণের বোঝা। এখন মহাজনেও মাপ দিবে না, এনজিওরা ও দিবে না, ব্যাংকেও দিবে না। মাস শেষ হলেই লোনের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। ভারতের যোগি আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ৪০ কোটি রুপি কৃষি লোন মওকুফ করে দিয়ে বলেছেন, সব অফিসে এয়ারকন্ডিশন বন্ধ। কৃষকের শরীরে আগে জীবনের বাতাস লাগুক, পরে অফিসে হাওয়া লাগবে।

প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক এই লোকের এই কাজটি খুবই ভালো লেগেছে। আর আমাদের কৃষকরা ঠিক এই সময়ে পেটে ক্ষুধা আর মাথায় কর্জের বোঝা নিয়ে হাহাকার করছে। এইসব খবর খুব কষ্ট করে যখন খুঁজে খুঁজে পত্রিকার কোনো কোণ থেকে বের করছি-তখন চতুর্দিকে খবর ভাসছে-ক্রিকেট, ওয়ানডে, মাশরাফি, পাপন, ষড়যন্ত্র, ব্রাজিলকন্যা, মানববন্ধন। এসবের ভিতর কৃষকের বাষ্পীভূত কয়েক ফোঁটা কান্না। এক কৃষক বলছেন, ধান হলো আমার বুকের শিশু। ধানের মরণ মানে নিজের পুত্রের মরণ। এখন আমাদের হবে কি, খাবো কি? দারিদ্র জাদুঘরে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু মানুষগুলো ঘর ছেড়ে ছাদের ওপর ওঠেছে।

কৃষকের কোনো ছুটি নেই। কোনো ভ্যাকেশন নেই, কোনো উইকেণ্ড নেই, কোনো মঙ্গল শোভাযাত্রা নেই, কোনো পান্তা-ইলিশ নেই। এমন কি কোনো সময় পর্যন্ত নেই। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সারাজীবন তাদের একটাই সময়, একটাই ঘড়ি। আর সেটা হলো- সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। এরা কোনোদিন কোনো অবরোধ করে না, হরতাল করে না, ভাঙ্গচুর করে না, ধর্মঘট করে না। খেলা হয় মাসে-বছরে কয়েকদিন, ডাক্তারের কাছে মানুষ যায় বছরে একবার কি দুবার, উকিল-ব্যারিস্ট্রারের কাছে মানুষ যায় সারা জীবনে কয়েকবার, অথবা কেউ জীবনেও যায় না। অথচ প্রতিদিনের প্রতিটি ভাতের দানার জন্য কৃষকের কাছেই যেতে হয়।

একটা খেলায় জিতলে টিম যদি কোটি টাকা পায়, তবে সতের কোটি মানুষের জন্য দিনে তিনবেলা আহার যুগিয়ে সারা জীবনের জন্য চ্যাম্পিয়ন হওয়া কৃষকের লোন কেন মওকুফ হয় না? এরাতো ঋণ খেলাপি না। আপনার -আমার ভাতের যোগানদাতা। বিনোদনের খেলা আমাদের যদি এতো আবেগে ভাসায় তবে ক্ষুধার অন্ন যোগান দেয়া কৃষকের কান্না কেন আমাদের স্পর্শ করে না? পরের খেলা দেখার জন্য আমার যখন তৈরি হচ্ছি তখন যারা আপনার আমার প্লেটে প্রতিদিন খাবার তোলে দেয় ওরা জানে না ওনাদের প্লেটে আজ খাবার আসবে কিনা?

Advertisement

কমেন্টস