বাঙালীর প্রাণের সংস্কৃতি বৈশাখী মেলা

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৯, ২০১৭

ছবি: সজিব

হাকিম মাহি-

১৪২৪ বাঙালীর হালখাতা ১লা বৈশাখের সকালটা শুরু হয় রমনার বটমূলে সকলের সম্মিলিত সুরের মূর্ছনায়। সকল অন্ধকার দূর করে, সবুজের বুক চিড়ে নতুন দিনের বারতা নিয়ে হাজির হয় সূর্য মামা। ক্ষণিকের জন্যে হলেও বাঙালী ভুলে যায় সকল ভেদাভেদ। দাঁড়িয়ে যায় একই কাতারে, গেয়ে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। সকল বয়সী মানুষের মুখে কি যে এক মায়াবী হাসি! যেন প্রতিটি মুখের হাসিতে গোলাপের পাপড়ি ঝড়ে। সবার মিলন মেলায় মুৃখরিত হয় কর্মব্যস্ত যান্ত্রিক জীবন ও পরিবেশ প্রকৃতি। হাতে হাত রেখে, গানের হৃদমে, কাছাকাছি, পাশাপাশি হেঁটে বেড়ায় প্রেমিক যুগল ও পরিবার-পরিজন। আবার এত সুন্দর আনন্দঘন পরিবেশটিকে বিলীন করে দেওয়ার জন্য এক দল অজ্ঞ, ধর্মান্ধ এবং সংস্কৃতি বিরোধী চক্র ওতপেতে বসে থাকে। সুযোগ পেলেই জল্লাদের মতো কেঁড়ে নেয় সবার মুখের হাসি। এ যেন মানুষরূপী হিংস্র পশু।

বিগত দিনে সমাজে একটি কথার প্রচলন ছিল, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। কিন্তু বর্তমানে এ রীতিটি আর নেই। এখন বলা হয়, ‘ধর্ম যার যার, উৎসবও তাঁর তাঁর’। এই যে একটি আমিত্ব আমিত্ব ভাব, এটি থেকে মানুষ যতদিন না বের হতে পারবে, ততদিন সমাজ থেকে বর্ণ বৈষম্য চিরতরে মুছে যাবে না। এত মত পার্থক্য কেন, সমস্যাটা কোথায় যে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ  এবং মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এত আগ্রাসন মনোভাব? যখন কাউকে প্রশ্ন করি, তুমি মানুষ নাকি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, না কোন কিছুর উপর আস্থা নেই? তখন সে বলে, আমি মুসলিম, আমি হিন্দু বা অন্য কিছু। এখানেই সকল সমস্যার মূল নিহিত।

আমার গুরু প্রফেসর রোবায়েত ফেরদৌস প্রায়ই জাতিগত, বর্ণগত বৈষম্য নিয়ে একটি উদাহরণ পেশ করেন, ‘১০ জন মানুষ এবং ১০ টি গরু কখনও যোগ হয় না। কারণ, যোগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিটি উপাদান একই মান এবং একই গুণসম্পন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। যখন কেউ বলে, আমি খ্রিস্টান, আমি মুসলিম, আমি হিন্দু, আমি বৌদ্ধ। তখন কিভাবে এই মতাদর্শিক মানুষগুলো একই ঘরে, একই সমাজে, একই দেশে থাকবে, খাবে, বসবাস করবে? ফলে, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্যের দানা চরম আকারে বাঁধে। তাহলে এর সমাধান কোথায় বা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের সম্মিলিত যোগ ফল মিলবে কিভাবে? একটিই পথ রয়েছে, সেটি হচ্ছে নিজেকে আগে শুধু একজন মানুষ হিসেবে তৈরি করা। পরে দাবি করা, আপনি কোন গোত্রের, কোন বর্ণের, কোন দেশের, কোন ধর্মের। দেখবেন, সকল সমস্যা বা বৈষম্যের এখানেই সমাধি।

আজ জাতিগত স্লোগান যদি এটা হয়, যে ‘ধর্ম যার যার, উৎসবও তাঁর তাঁর’।  আবার দেশীয় সংস্কৃতি পালন করতে গেলে এই ধর্মবাদীরাই ফতুয়া জারি করে, এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। তাহলে, জাতিগত সম্প্রীতির সহাবস্থান তৈরি হবে কি করে? হয় দেশীয় সংস্কৃতি সবাই মানেন, আর না হয় ধর্মীয় উৎসব ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত করুন। অথবা দুটিকেই যার যার মতো করে চলতে দিন। মানবতা প্রেমী মানুষগুলো অবাক হয়, যখন একজন শিক্ষিত মানুষ ধর্ম ও সংস্কৃতির মাঝে তুলনা করে। আমাদের আগে নিজেদের বুঝা প্রয়োজন, যে ধর্ম হল ব্যক্তিগত বা গোত্র ভিত্তিক পালনীয় অর্থাৎ সকল মানুষের জন্য একই পালনীয় বিধান না। অপর দিকে সংস্কৃতি হল, কোন ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকল মানুষের একই উদ্দেশ্যে সাধিত বহুদিনের লালিত প্রথা। এখানে সকলের সমানভাবে চর্চার অধিকার রয়েছে। ধর্ম ধর্মের যায়গায়, আর সংস্কৃতি সংস্কৃতির যায়গায়। দুটিকে একে অপরের সাথে তুলনা করা মূর্খতার, অজ্ঞতার পরিচায়ক।

এবারের ১লা বৈশাখে রাস্তা ঘাট, বিভিন্ন পার্ক ও গ্রাম্য মেলায় যেভাবে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে, তাতে বুঝা যায় সাধারণ মানুষ জঙ্গিবাদ ও ধর্মান্ধবাদকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে। আজ সারা পৃথিবী জুড়েই সংস্কৃতির অবমাননার কারণে মানুষের মধ্য থেকে মনুষ্যত্ববোধ উঠে যাচ্ছে। অবক্ষয় হচ্ছে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার। যে মানুষ কবিতা পড়তে জানে না, মানবতার গান গাইতে ও শুনতে জানে না, নিজের চেয়ে দেশকে এবং নিজস্ব সংস্কৃতিকে বেশি ভালোবাসতে জানে না, সে জঙ্গিবাদী মনভাব থেকে বের হতে পারে নি এবং সে জঙ্গিও হতে পারে। এই শ্বাস রুদ্ধকর অবস্থা থেকে বাঁচতে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে সংস্কৃতি বান্ধব দেশ ও সমাজ গোড়ে তুলি এবং জঙ্গিবাদ ও ধর্মান্ধবাদকে চিরতরে না বলি। আসুন সকলে মিলে সংস্কৃতির একনিষ্ঠ সেবক হই।

লেখক: শিক্ষার্থী ও কর্মী নো ভ্যাট অন এডুকেশন।

Advertisement

কমেন্টস