আ আ ম স আরেফিন সিদ্দীক স্যারের সান্নিধ্যে আমরা ক’জন

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৮, ২০১৭

ফারুক আহমাদ আরিফ-
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবনে মুক্তিযুদ্ধ’ নামক বইটি পড়ে মনে এক ধরনের হিল্লোল জাগে। কি করা যায়। লেখক জিনাত আরা পারমিজের সাক্ষাৎকার নিতে পারবো? কীভাবে নাম্বার সংগ্রহ করা যায় ইত্যাদি চিন্তা করতে করতে অনেক দিন চলে যায়। পরবর্তীতে গত ১০ মার্চে সেই সাক্ষাৎকারটি সংগ্রহ করতে সক্ষম হলাম।
তখন মাথায় চিন্তা আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দীক স্যারের একটি সাক্ষাৎকার নিতে হবে। সাথে সাথে কিছু দাবি-দাওয়া প্রশ্নের মধ্যে তুলে ধরতে হবে। সেইগুলো যেভাবে সম্ভব তার মুখ দিয়ে বের করে আনতে হবে।

১ মার্চ সকালে ফোন দিলাম বন্ধু মতিউর তানিফের দেয়া নাম্বারে। স্যার কল রিসিভ করলেন। পরিচয় দিলাম। জানতে চাইলেন কোন বিষয়ে সাক্ষাৎকার? বললাম মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান, ডাকসু নির্বাচন, শিক্ষাব্যবস্থা ইত্যাদি। তিনি বললেন ৪ মার্চ আমাদের ৫০তম কনভোকেশন। ৪ তারিখের পরে কল দিও এখন ব্যস্ত আছি বাবা।

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দীক স্যারের সান্নিধ্যে আমরা ক'জন
৮ মার্চ কল দিলাম। বললেন, শুক্রবার বিকালে কল দিও। দিলাম। বললেন কালকে সকালে দিও। দিলাম। তিনি বললেন, শুক্রবার (১৭ মার্চ) দিও, দিলাম। বললেন আরেকদিন দিও, দিলাম। সজীব স্যার, শেখ নজরুল ইসলাম স্যারকে জানালাম তারা কয়েকটি প্রশ্ন দিলেন। আমার লেখা প্রশ্নগুলো স্যারদের দেখিয়ে ছিলাম। নতুন কিছু যুক্ত হলো। ২০ মার্চ অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। রাতে কল দিলাম। বললেন ২৫মার্চ রাত ১০টায়। ভাবলাম আমার আশা পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু সেই পঁচিশ মার্চ আর সম্ভব হলো না। বললেন, শুক্রবার কল দিও (৩১ মার্চ) দিলাম। বললেন, রবিবার রাত ৯টায় আমার বাসায় আসো। বললাম আচ্ছা স্যার, ঠিক আছে। আনোয়ারকে জানালাম সে ক্যামেরাসহ থাকবে। বায়েজিদ সেও থাকবে। রাজীব বিশ্বাস ভাইকে বললাম, যাবেন আরেফিন স্যারের সাক্ষাৎকার নিব সেখানে? তিনি রাজী হলেন।
২ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টায় ভিসি ভবনের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আসলেন বায়েজিদ, আনোয়ার ও রাজীব ভাই। কিন্তু ভিসি স্যার বাসায় নেই। দারোয়ানকে বললাম আমরা আসছি, স্যার আসলে জানাবেন। নিলখেতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করলাম। সাড়ে ৯টার দিকে স্যার ফোন দিয়ে বললেন, আজ তো তোমাকে ইন্টারভিউ দিতে পারবো না। বৃহস্পতিবারে ফোন দিও, বললাম আচ্ছা স্যার।

আমিও আর ফোন দিলাম না। টানা দু’সপ্তাহ সময় কেটে গেল। ১৪ এপ্রিল কল দিলাম বললেন, শনিবারে কল দিও। দিলাম। শনিবারে কল দিয়ে বললাম স্যার সেদিন আপনার বাসার সামনে থেকে বসে থেকে ফিরে এসেছি, স্যার। বললেন, আমি জানি বাবা। তিনি বললেন কাল সকালে কল দিও, দিলাম। সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় আমার বাসায় এসো। বললাম-জী আচ্ছা। স্লামালেকুম স্যার।

আজ সকালে কল দিলাম। ধরলেন না। কিছুক্ষণ পরে কল ব্যাক করে বললেন রাতে এসো। রাতে আনোয়ারের মোটরসাইকেলে রাজীব ভাইসহ আমরা ৯টা ৫ মিনিটে ভিসির বাসভবনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ডিউটিরত পুলিশকে জিজ্ঞেস করলাম স্যার ভিতরে আছেন কিনা? তিনি বললেন, আমরা কিছুক্ষণ আগে মাত্র এসেছি। আপনি নিরাপত্তাকর্মীর কাছে জিজ্ঞেস করেন। নিরাপত্তাকর্মী জানালেন স্যার আজ বাইরে যাননি। ভিতরেই আছেন। কার্ড বের করলাম। বললাম গিয়ে এটি দেখিয়ে বলুন আমাদেরকে সাড়ে ৯টায় সময় দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, আপনারা ভিতরে চলে আসুন। গেলাম।

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দীক স্যারের সান্নিধ্যে আমরা ক'জন
পুলিশ মাইদুল আমাদের রিসিভ করলেন। ভিতরে ভিসি অফিসের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মির্জা সামসুল আলম বসতে বললেন মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে। পাশে গিয়ে বসলাম। তার হাতে কার্ড দিলাম ভিসি স্যারকে দিতে। তিনি পিয়নের মাধ্যমে কার্ডটি ভিতরে পাঠিয়ে দিলেন। স্যার বললেন সাড়ে ৯ টায় আমাদের সাথে দেখা হবে জানালেন পিয়ন। বসে আছি। বিভিন্ন ধরনের আলাপ-আলোচনা চলছে। এরি মধ্যে আমাদের ডিপার্টমেন্টের উপদেষ্টা প্রফেসর রোবায়েত ফেরদৌস স্যার আরেকজন শিক্ষকসহ ভিসি স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলেন। সালাম দিলাম আমরা। স্যার জিজ্ঞেস করায় প্রশ্নপত্রটি স্যারের হাতে দিলাম। স্যার পড়ে বললেন মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভালো। এগিয়ে যান। স্যার বেরিয়ে গেলেন। অসংখ্য মানুষ ভিসি স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। তিনি নিজ ঘর থেকে বের হয়ে বাংলোতে আসলেন। একে একে প্রায় শ খানেক মানুষের সাথে আলাপ করলেন। রোবায়েত স্যার ভিসি স্যারের কার্যালয়ে গেলেন। অনেক্ষণ কথা বললেন। মির্জা সাহেব পিয়নদের তাগাদা দিলেন। সাংবাদিকরা এসে বসে আছেন তাদের কথা বলুন। ভিতর থেকে ডাক এলো। ভিতরে গেলাম আমরা। সালাম দিলাম। রোবায়েত স্যারের চেয়ারের পিছনে দাঁড়ালাম। স্যার উঠে দাঁড়ালেন। হয়তো তিন সেকেন্ড হবে। আমাকে সেখানে বসতে বললেন ভিসি স্যার। বসলাম। হাত বাড়ালাম। তিনিও হাত বাড়ালেন হ্যান্ডশেক করলাম। রাজীব ভাই, আনোয়ার তারাও হ্যান্ডশেক করলেন। প্রশ্নপত্রটি এগিয়ে দিলাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে চোখ ভুলালেন। অবশ্য এর আগেও মেইলে প্রশ্নটি পাঠিয়ে ছিলাম। তিনি পড়েছেন বলে ফোনে জানিয়েছিলেন। আবার পড়লেন।
আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের আগে ১৭ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম মুজিবনগর সরকার দিবস পালন নিয়ে অভিনন্দন জানালাম। অবশ্য এর আগেই তিনি বিডিমর্নিং এর পরিবারের সাংবাদিক, পাঠক, শুভাকাঙ্খীসহ দেশবাসীকে বাংলা নববর্ষের অভিনন্দন বার্তা জানালেন।

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দীক স্যারের সান্নিধ্যে আমরা ক'জন
সুন্দরভাবে প্রশ্নের প্রতিটি জবাব দিলেন। বিশাল রুম। বিভিন্নস্থানে সাজানো গুছানো, পরিপাটি। খুব সুন্দর পরিবেশ। দীর্ঘক্ষণ সাক্ষাৎকার শেষে সবাইকে ফল, মিষ্টি, চা পান করালেন। কাছে ডেকে বসালেন। রাজীব ভাই ফুটেজ নিলেন। আনোয়ার ছবি তুললেন। পুরো সাক্ষাৎকারের সময়টুকু আমার শরীরে ঝরনা বয়ে যাচ্ছিল। মাত্র তিন সেকেন্ড আগে রোবায়েত স্যার এই চেয়ার থেকে উঠে গেছেন আর আমি সেই চেয়ারে বসেই সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। ভয়ে, শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে গা কেমন যেন ঢেউ দিয়ে যাচ্ছিল। শিহরণ জাগাচ্ছিল। এমন অবস্থা আমার জীবনে আর কখনো আসেনি। কখনো অাসবে কিনা জানিও না। রাত পৌনে ১১টায় তার বাসা থেকে বিদায় নিলাম।
একটি বিষয় সেখানে লক্ষ্য করলাম অসংখ্য মানুষ ভিসি স্যারের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন তিনি কাউকেই নিরাশ বা হতাশ করলেন না। সবাইকে আশান্বিত করলেন।
আমরা ছবি তুললাম। সাক্ষাৎকার শেষে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম। তিনিও পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। আমরা বিদায় নিলাম। এমন ব্যস্ততা দেখে নিজেদের খুব দৈন্য মনে হলো। আমরা কি কাজ করি? তিনি এই বয়সেও ২৭ বছরের যুবকের মতো কাজ করে চলছেন শত ব্যস্ততার মধ্যে। অসুস্থতা সত্ত্বেও থেমে থাকেননি। একের পর এক কাজ করছেন। মানুষের সমস্যা সমাধানে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছেন। রাজীব ভাই, আনোয়ার বললো এতো ব্যস্ত থাকে তাইতো সময় বের করতে পারে না। আমরা ইতিপূর্বে শুধু শুধু উনার সাক্ষাৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ছিলাম। সরি। আমি হাসলাম। এমন মহৎ ব্যক্তিরা গেছেন আরেক মহৎ ব্যক্তির সংস্পর্শে। আমি এক অধম কারো ঋণ কখনো শোধ করতে পারিনি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ দিয়ে হলেও রাজীব ভাইয়ের ঋণশোধ করতে পারবো না। আনোয়ারতো আরও কয়েকধাপ এগিয়ে। আমি এক অভাগা। হতভাগ্য ব্যক্তি। যে সব সময় চারপাশের মানুষদের স্নেহ-মমতা পাই। ভালোবাসা পাই, বিনিময়ে কিছুই দিতে পারি না। শুধু ঋণের পাল্লা ভারি করছি।

এই সাক্ষাৎকারটি নিতে গিয়ে আমাদের মনে বিশ্বাস জন্মালো কাউকে ‘সত্যিকার অর্থে ভালোবাসলে পাওয়া যায়’।

রাত ২টা ৩৫ মিনিট
১৮ মার্চ ২০১৭, ৫/৮ লালমাটিয়া ডি ব্লক, ঢাকা

 

Advertisement

কমেন্টস