বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৪, ২০১৭

মামুনুর রশিদ রাজিব-

“বাজেরে বাজে ঢোল আর ঢাক,

                   এলোরে পহেলা বৈশাখ”

হ্যাঁ বাঙালিদের প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ এসেছে। এসেছে পুরনো বছরের সব গ্লানী মুছে ফেলে নতুন বছরের হাত ধরে সেই এগিয়ে চলার বিশেষ মুহুর্ত।

কবি নজরুলের কবিতার সেই বিখ্যাত লাইনটি আমি একবার মনে করতে চাই,

            ‘ওরা হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসিবে কোন জন’।

 উল্লেখিত কবিতার লাইনটির মত বাংলার বর্ষবরণ উৎসবও একটা সার্বজনিন উৎসব। এখানে নেই কোন ধর্ম কিংবা বর্ণের ভেদাভেদ। আজকের এই দিনের সকল ব্যক্তি পরিচয়ের উর্ধ্বে সবার পরিচয় হয়ে ওঠে একটাই ‘আমরা বাঙালি’।

১৫৫৬ সালে বাংলা সনের চালু করেন মুঘল সম্রাট আকবর। প্রজাদের সুবিধার্থে খাজনা আদায়ের জন্য তিনি হিজরি এবং সৌর সনের উপর ভিত্তি করে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন আর এই কাজের দায়িত্ব পরে তার মহলের শ্রেষ্ঠ জোতির বিজ্ঞানী ফতুল্লা সিরাজীর উপর। গ্রেগরীয় পঞ্জিকার এপ্রিল এর মাঝামাঝি সময়ে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। নতুন এই পঞ্জিকার নাম ফসলী হলেও পর্যায়ক্রমে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনে রূপ নেয়।

তখনকার দিনে চৈত্রের শেষ দিনে প্রজাদের খাজনা, মাশুল এবং সকল প্রকার শুল্ক পরিশোধ করতে হত আর তার পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা মিষ্টান্ন দিয়ে স্থানীয় জনসাধারণকে আপ্যায়ন করত।

মনে করা, সেই থেকেই শুরু হয় হালখাতা এবং বাংলা বর্ষবরন। প্রথমদিকে এত আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও কালক্রমে পহেলা বৈশাখ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঙালিদের প্রাণের উৎসবে। আর সেই উৎসবের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে রাজা শশাঙ্কের সময় থেকে প্রচলিত ‘বৈশাখী মেলা’।

১৯৬৭ সাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক জোট ছায়ানট রমনার বটমূলে বাংলায় প্রথম পহেলা বৈশাখ পালন করে এবং ১৯৮৯ সালে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। পান্তা ইলিশের বিষয়টা আসে ১৯৮৩ সালে কয়েকজন সাহিত্য প্রেমী বাঙালির টিএসসি তে বসে পান্তা ইলিশ খাওয়ার মধ্যদিয়ে। যদিও বর্তমানে দেশের স্বার্থে ইলিশ মাছ নিয়ে কিছুটা প্রতিকুলতা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার সার্বজনিন এই উৎসব টাকে আরও প্রাণবন্ত করতে গত বছর থেকে সরকারি সকল কর্মচারি-কর্মকর্তাদের বৈশাখী ভাতা (মূল বেতনের ২০%) চালু করেছে এবং এবছর থেকে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করতে নির্দেশ দিয়েছে।

কিন্তু সার্বজনিন এই উৎসব আকাশের কোন এক কোনে জমে ওঠা মেঘের জন্য যখন বের হতে হয় নিরাপত্তা নামক ছাতা নিয়ে অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে নিতে হয় কঠোর নিরাপত্তা, তখন শংকা হয়, শংকা হয় সবার ভালোলাগা বৈশাখের সেই বিখ্যাত গানটি কি আজ ভুলে গেছে এই মেঘের দল?

            তোমরা একতারা বাজাইও না

                     দো-তারা বাজাইও না

            একতারা বাজাইলে মনে পইরা যায়

                     একদিন বাঙালি ছিলাম রে……

বিশিষ্টজনদের মতে, উনিশ শতকের ষাটের দশকে পাকিস্থানের সৈর-শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও বাঙালিদের পহেলা বৈশাখ যেমন উদযাপিত হয়েছিল আগামীতে সব বাধা উপেক্ষা করে সার্বজনিন এই উৎসব পালিত হবে। তবে, পহেলা বৈশাখকে শুধু উৎসব হিসেবে পালন করলেই হবে না এথেকে আমাদের ধর্ম-বর্ণ ভুলে এক-হয়ে কাজ করার শিক্ষা নেয়া সহ হৃদয়ে ধারণ করা উচিত সবার ব্যক্তিগত পরিচয়ের উর্ধ্বে আমাদের আর একটি পরিচয় “আমরা বাঙালি”।

লেখক: শিক্ষার্থী স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি

কমেন্টস