১২ই এপ্রিল সৈয়দপুর শহীদ দিবসের পটভূমি

প্রকাশঃ এপ্রিল ১২, ২০১৭

মোঃ মুজিবুল হক-

আজ ১২ই এপ্রিল। সৈয়দপুর শহরে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিন স্থানীয় শহীদ দিবস হিসাবে উৎযাপিত হচ্ছে। ১২ এপ্রিল কী? স্থানীয় শহীদ দিবসের তাৎপর্য কী তা তরুণ প্রজন্মের জানা প্রয়োজন। সেই আলোকেই লেখাটির অবতারণ।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতা ও তাদের দোসর অবাঙালিদের নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয় সৈয়দপুর শহরের বিশিষ্ট চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, রেলওয়ের কর্মচারী, হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্ঠানসহ প্রায় আট হতে দশ হাজার ব্যক্তিবর্গ। ১৯৭১ সালে ২৩শে মার্চ হতে ১৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর অবাঙালি কর্তৃক নির্মমভাবে এই সমস্ত নিরীহ হত্যাযজ্ঞের শিকার হন এখানকার নানা শ্রেণী পেশার মানুষ।

আগামী দিনে নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস অবগত করানো এবং স্বধীনতার জন্য যাঁরা নিজেদের অমূল্য জীবন উৎসর্গ করে গেছেন ঐ সমস্ত বীর শহীদ ব্যক্তিবর্গ কে নতুন প্রজন্মের নিকট আমার লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরার সমীচিন বলে মনে করি।

আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যরা যতটুকু ইতিহাস জানি, সেই খণ্ড খণ্ড বাক্যগুলি সাজিয়ে গুছিয়ে লিখলেই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মেরা জানতে পারবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনেককে ইতিহাস লেখার জন্য আহবান করেছি। কিছু লোক সহযোগিতাও করছেন, আবার অনেকে বার্ধক্যজনিত কারণ এবং সময়ের অভাব দেখিয়ে এড়িয়ে যান। আমি তাঁদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, যাঁরা দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে আমাদের একটি ভূ-খণ্ডও লাল সবুজ রচিত পতাকা উপহার দিয়ে গেছেন, সে সকল শহীদ ব্যক্তি বর্গদের প্রতি আমাদের কিছু দায় আছে। তাই শহীদদেরকে নতুন প্রজন্মের নিকট তুলে ধরার জন্য ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সন্তনেরা স্থানীয় বুদ্ধিজীবী দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালন করে আসছে!

সৈয়দপুর একটি অবাঙালি অধ্যষিত শহর। এই শহরে বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে ওয়ার্কসপ এবং বিমান বন্দর রয়েছে। এই শহরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হওয়ার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ফেব্রুয়ারি হতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের কে সরিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের এনে সৈয়দপুর সেনা-নিবাসে ঘাঁটি গড়ে তোলে। পাকিস্তানীদের অন্যতম দোসর বিভিন্ন এলাকা হতে অ-বাঙালিরা সৈয়দপুর শহরে বাঁশবাড়ী, মিস্ত্রীপাড়া, কুলি মহল্লা, গোলাহাট, নতুনবাবু পাড়া, পুরাতন বাবুপাড়াসহ বিভিন্ন মহল্লায় এসে জোড় হতে থাকে এবং পাকিস্তান রক্ষার জন্য সেনা বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলায়।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর প্রহসনমূলক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ২৫শে মার্চ কালো রাত্রিতে অপরেশন সার্চ লাইট নামে হত্যাযজ্ঞ নিধন শুরু করে পাকিস্তানী বর্বর সেনা বাহিনী। ২৫শে মার্চের পূর্বেই ২২শে ও ২৩শে মার্চ সৈয়দপুর শহরে অবাঙালিরাই বাঙালিদের বাড়ী ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুট তরাজ শুরু করে।২৩শে মার্চে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাতাব বেগ সৈয়দপুর শহরে প্রথম শহীদ হন।

২৬শে মার্চ রাত্রি ১২ টার পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অত্র শহরের বিশিষ্ট চিকিৎসক যুক্তফ্রট ও প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ সদস্য ডাঃ জিকরুল হকসহ তাঁর অন্যান্য সহকর্মীদের মধ্যে ডাঃ সামছুল হক, ডাঃ বদিউজ্জামান, ডাঃ ইয়াকুব, বাবু তুলশী রায়, আগরওয়ালা, যমুনা প্রসাদ, কেডিয়া রামেশ্বর, লাল আগরওয়ালা, সদস্যসহ প্রায় দেড়শত ব্যক্তিবর্গকে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে ১২ই এপ্রিল রংপুর নেসবতগঞ্জ বালার খাল বধ্যভূমিতে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।

১৯৭১ সালের এপ্রিল হতে জুলাই/আগস্ট মাসে সৈয়দপুর শহরে বিভিন্ন মহল্লায় মহল্লায়। অবাঙালিরা বাঙালিদের বাড়ীতে ঢুকে রেলওয়ের কর্মচারীবৃন্দ, হিন্দু, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের বাড়ীতে যেয়ে রাম দাঁ, ছুরি, তলোয়ার নিয়ে আক্রমণ করে। এমনকি অবাঙালিরা নিজ হাতে জবাই করে তাদের লাশগুলি বাড়ীর ভিতর কুয়া, ডোবার মধ্যে ফেলে দেয়। আমাদের শিক্ষিকা রেখা আপার মা ভাইদেরকে হত্যা করে কূয়ার মধ্যে ফেলে দেয়। আমার স্কুলের সহপঠী বিনোদ কুমার সিংহানিয়ার পরিবারের ৮ জন সদস্যকে (পুরা পরিবারকে) অবাঙালিরা নির্মমভাবে হত্যা করে (উক্ত বাড়ীটিতে বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়)। শুধু তাই নয়, রেলওয়ে কারখানার কর্মচারীদের ও মঞ্জুর ভাইয়ের পিতাসহ অসংখ্য কর্মচারীকে হত্যা করে জলন্ত বয়লারে অবাঙালিরা নিক্ষেপ করে। ১৩ জন হিন্দু, মারওয়ারীসহ প্রায় ৪৫০জনকে ট্রেনে উঠিয়ে ভারতে পাঠানো নাম করে গোলারহাটে নির্মম ভাবে এই অবাঙ্গালীরা জবাই করে।

শহীদ ডাঃ জিকরুল হকের ছোট ভাই মোঃ আমিনুল হক (গোলো চাচা)-কে জুন মাসে সৈয়দপুর হাই স্কুল থেকে আসার সময় পৌরসভা রোডে এক মারওয়ারীর গুদামে নিয়ে যেয়ে ছয় টুকরা করে হত্যা করে। শহীদ ডাঃ জিকরুল হকের বড় ভাই শহীদ জহুরুল হককে ১৪ই ডিসেম্বর অবাঙালিরা বাড়ী থেকে নিয়ে যেয়ে হত্যা করে। শহীদ ডাঃ জিকরুল হকের ভতিজা কুদরত-ই-এলাহীকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে নির্মমভাবে অবাঙালিরাই হত্যা করে।

এছাড়া শহীদ ডাঃ জিকরুল হকের ভগ্নি জামাই ডাঃ আব্দুল আজিজকে তাঁর গ্রামের বাড়ী বিন্না কুড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং দিনাজপুর কোতওয়ালী থানায় তাকে হত্যা করে। আর এক ভাতিজী জামাই মোবারক কে ১৮ ই ডিসেম্বর শহীদ ডাঃ জিকরুল হক সাহেবের ডিস-পেনসারীর সামনে অবাঙ্গালীরা গ্রেন্ডেড চার্জ করে সৈয়দপুরের আওয়মী লীগের নেতাদেরকে একই সঙ্গে হত্যা করতে চেয়েছিল, সেই গ্রেন্ডড হামলায় মোবারক হোসেনসহ তিন চার জন শহীদ হন।

১৯৭১ সালে সৈয়দপুর শহর একটি অবাঙালিদের ঘাঁটি ছিল। এই শহরে এত লোক শহীদ হয়েছেন তাঁর কোন পরিসংখ্যান আজ পর্যন্ত করা হয় নাই। এই ব্যর্থতা কার? স্বাধীনতার পর যাঁরা ক্ষমতায় ছিল তাঁদের নাকি রাষ্টের?

আমি মনে করি এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি প্রত্যেক থানায় থানায় জরিপ চালানো হত তাহলে স্বাধীনতাযুদ্ধে হয়তো ত্রিশ লক্ষের অধিক ব্যক্তিবের্গের নাম শহীদ হিসাবে রাষ্টীয় খাতায় লিপিবদ্ধ করা যেত। আজ শহীদের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়া ধৃষ্টতা দেখার সাহস হত না। আজ স্বধীনতার দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর পর সরকারকে সংসদে গণহত্যা দিবস ২৫শে মার্চ পালনের জন্য সংসদে যেতে হত না।

১৯৭১ সালে সৈয়দপুর শহরে অসংখ্য ব্যক্তিবর্গ শহীদ হওয়ায় এবং ১২ই এপ্রিল সৈয়দপুর শহরের বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিকিৎসক, ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, মারওয়ারী, ব্যবসায়ীসহ প্রায় দেড় শত ব্যক্তিবর্গ, যুক্তফ্রট ও প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ সদস্য শহীদ ডাঃজিকরুল হকসহ যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে স্থানীয় শহীদ দিবস হিসাবে দিনটি পালিত হয়ে থাকে।

দিবসটিতে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, শহীদ বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, শহীদদের ছবি প্রদর্শন, আলোচনা সভা, বিভিন্ন মন্দির, মসজিদ, গীর্জায় শহীদের উদ্দেশ্য দোয়া পাঠ করা হয়।

লেখক: শহীদ ডাঃ জিকরুল হকের ছেলে

প্রাক্তন সভাপতি ‘প্রজন্ম ৭১’

 

Advertisement

কমেন্টস