হালা একখান খাটি বরিশাইল্ল্যাহ!

প্রকাশঃ মার্চ ৪, ২০১৭

শব্দটা খুবই সহজ, কিন্তু‘ অনেকের পক্ষে হজম করাটা সহজ নাও হতে পারে। শব্দটা শুনা মাত্রই অনেকের মেজাজ তুঙ্গে উঠতেই পারে। হাইপ্রেসার কিংবা ষ্টোকের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। কিন্তু‘ লোকের মুখ কি চেপে রাখা যায়? আমার মতে, অঞ্চল নয়, মানুষের মূল্যায়ণ তার কর্ম ও আচরণে। কিন্তু‘ ইদানিং একটি ঘটনার পর কোন যুক্তি দিয়েই কাউকে আর বোঝাতে পারছি না।

এতক্ষণে কথাটা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পৌঁছে গেছে বিদেশের মাটিতে। আমি শুনেছি বাসে গাদাগাদি কর্মমুখি ও গন্তব্যগামী শতশত যাত্রীর মুখে আর দেখেছি ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। শিশু থেকে বুড়ো সুযোগ ফেলেই শব্দটা একবার উচ্চারণ না করলে যেন তাদের পেটের ভাত হজম হয় না।

বড়দের আড্ডা থেকে শিশুদের খেলা সবখানেই নুন থেকে চুন ব্যাবধান হলেই একজন আরেকজনকে বলছেন ‘হালা একখান খাটি বরিশাইল্ল্যাহ’! এটি চায়ের দোকান থেকে পারিবারিক খাবার টেবিলের বুলিও হয়ে গেছে অনেকের। এভাবে চলতে থাকলে মাসখানেকের মধ্যে হয়তো গ্রিনেজ বুকে শব্দটা রেকর্ডও করতে পারে। কিন্তু কেন এত রহস্য এই শব্দটার পেছনে?

আমি আঞ্চলিকতাকে বেশি একটা প্রাধান্য দিয়ে কখনো বলা বা লেখার চেষ্টা করি না। তবে সাংবাদিকতার কারনে বিভিন্ন অঞ্চলের লোকের সাথে কম বেশি মিসার সুযোগ হয়েছে। জানা হয়েছে তাদের বিভিন্ন কীষ্টি-কালচার। চীদাশের চিরন্তন বাণী ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’, কিন্তু এই সত্য উপলব্ধি এক একজনের এক এক রকম। আঞ্চলিকতা নিয়ে কেউ আমার সাথে আলোচনা করে তেমন একটা সুবিধা করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না।

প্রতিটি মানুষের ভালো ও খারাপ দুটো দিকই রয়েছে। সভ্যতার আদি থেকে শেষ পর্যন্তও তা থাকবে। কিন্তু‘ আমরা কেন মানুষের খারাপ দিকগুলো নিয়ে বেশি আলোচনায় মুখর হই? ভালো দিকগুলো নিয়ে খুব কম কেন? চাকুরি থেকে শুরু করে মসজিদে মিলাদের তবরক বিতরণেও আমরা আঞ্চলিকতা কিংবা স্বজনপ্রীতির উর্ধ্বে যেতে পারি না। আমাদের নিউরণে কেন আসে না, সব পরিচয়ের উর্ধ্বে আমরা সারিবদ্ধ এক স্বাধীন দেশের মানুষ। সবাই বাঙ্গালী সন্তান। সব জাত, বর্ণ, রক্ত দিয়েছি ভাষার জন্যে, স্বাধীনতার জন্যে। এটি ভুলে গিয়ে আমরা কেন বলি, নোয়াখাইল্লা, বরিশাইল্লা, কুমিল্লা কিংবা ময়মনসিংহা… ইত্যাদি। জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো। জন্ম বরিশাল কি আর নোয়াখালিতে হোক, কর্মের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক মূল্যায়নের রীতি চর্চা করা উচিত।

অনেকের মনেই প্রশ্নো আসতে পারে, হঠাৎ করে আমার এই লেখা কেন? অনেকে লেখাটি পড়ে মনে করতে পারেন, আমি হয়তো কারো বিদ্ধেষ প্রচার করছি। কিন্তু একাধিক মতের মাধ্যে আমার এই লেখা কোন অঞ্চল বা ব্যক্তির উপর বিশেষ প্রভাব ফেলবে বলে আমার মনে হয় না। ব্যক্তিগত জীবনে চলতে গিয়ে বরিশাল অঞ্চলের মানুষের সংস্পর্শ ও প্রভাব সমাচার করা আমার লেখার উদ্দেশ্য নয়, তবে বাস্তবিক জীবনে সত্যকে উপলব্ধি করে অকপটে বলাটা প্রত্যেক মানুষের একটা দৃঢ় মূল্যবোধের পরিচয়। তাই যেখানে অন্যায়, সেখানেই জাগ্রত করুন আপনার দৃঢ় মূল্যবোধ। জানি না ফেইসবুক থেকে চলন্ত বাসের যাত্রীরা কোন সত্যকে তুলে ধরেছেন, হতে পারে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে করে হুজুগে পড়ে বিশেষ অঞ্চলের লোকদের প্রতি নিজেদের ব্যক্তিগত বিদ্ধেষই ছিলো সেই প্রচারণার।

ভাবটা যেন এমনই হয় যদি আমরা শুনি কারো বাড়ি বরিশাল, তাহলে বোবার মুখও খুলে যায় ভেংচি মারতে। এই নামে ঢাকায় অনেক বাড়িওয়ালা বাড়ি ভাড়া দিতে গড়িমসি করেন। একটা সভ্যজাতির কাছে এটা অনাকাঙ্কিত হলেও বর্তমানে এটাই নির্মম সত্য। যারা এই পরিস্থিতির স্বীকার তাদের প্রতি ব্যক্তিগত ভাবে সহমর্মীতা প্রকাশ করছি। বরিশালের অনেকে উচুঁ লেভেলের লোকের সাথে উঠা বসার সুবাধে তাদের কাছে আমার এই প্রশ্নো ছিল, কেন মানুষ তাদের ঢাকাতে বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে একটু ভিন্নতা দেখায়? নিজেদের এমন পরিস্থিতির জন্যে বরিশালের লোকদেরকেই দায়ী করছেন তারা।

তাদের মতে, দীর্ঘদিনেও অঞ্চলিকতার উর্ধ্বে বরিশালের অধিকাংশ মানুষের নিজস্ব ভাষা, কুষ্টি-কালচার ও পরপস্পরের প্রতি আস্থা এবং ব্যক্তিগত মূল্যেবোধের জায়গাটি সেভাবে তৈরি হয়নি। এই মূল্যবোধ ও আস্থার জায়গা যে সত্যি তৈরি হয়নি, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অনেকেই জানিয়েছেন।

মূল ঘটনা হলো গত ২০ নভেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনষ্টিটিউটে ‘ফ্রিডম’ নামে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছেন নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত লিওনি মার্গারেথা কুয়েলিনারি। সেদিন সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানে ’লে মোমবাতি প্রজ্জলনের সময় তার ব্যক্তিগত হাত ব্যাগটি চুরি হয়ে যায় মঞ্চ থেকে। ব্যাগে তার ব্যাবহার করা দামি আইপ্যাড, মোবাইল ফোন, ব্যাংকের এটিএম কার্ড, বাসার চাবিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ছিল। যেগুলো হারিয়ে অনেকটা বিপাকে পড়ে যান তিঁনি।

এমন একটি ঘটনায় যখন বিভিন্ন মহলে নিন্দার ঝড় উঠতে লাগলো, তখন বরিশালের অনেককে বিভিন্ন জায়গায় বুক ফুলিয়ে বলতে দেখেছি, ‘দেখেছিস কত বড় সাহসের কাজ করেছে মোগো রুবেল, রাষ্ট্রদূতের ব্যাগ চুরি করেছে’। এটা কি কোন ছোটখাট কাজ? হতে পারে রসিকতার ছলে বলেছেন কথাটা। যদিও ঘটনার ৪ দিন পরে নিরাপত্তা বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা রাজধানীর শনিরআখড়া থেকে রুবেল (২০) ও তার দেওয়া তথ্য মতে পান্থপথের একটি ইলেক্ট্রনিক্স দোকানের কর্মচারি শাওনকে (২০) গ্রেপ্তার করেন। শাওনের কাছে রুবেল ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন চুরি করা ব্যাগটি। নিজে রক্ষা পাওয়ার জন্যে দাঁড়ি কেটে অন্য জায়গায় চাকুরিও নেন। কিন্তু‘ ধরা পড়ে যান পুলিশের হাতে। সর্বশেষ সবকিছু ছাপিয়ে যে বির্তক উঠলো সবার মুখে, সেটি হলো ‘হালা একখান খাটি বরিশাইল্ল্যাহ’!

প্রশ্নো হলো চুরির ঘটানা দেশে এই প্রথম নয়, দেশে ব্যাংক ডাকাতি, অর্থ লুট, খুন খারাবি, ধর্ষণসহ আরো ভয়ংকর বহু ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। কিন্তু কয়টা ঘটানায় একটি নিছক ব্যাগ চুরির মাত্র ৪ দিনের মাথায় ধরা পড়েছে অপরাধী? নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের ব্যাগ উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ঠ আন্তরিকতায় সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু সাগর-রুনি, মিতু, তনু, ফারহানা হত্যাকা- ও শত শত গুমের ঘটনায় অপরাধিরা কেন এখনো অধরা? রাষ্ট্রের কাছে এই প্রশ্নো হাজারো ভুক্তভোগি পরিবারের?

গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি গুম হয়ে গেলেও নিরাপত্তা বাহিনী কোন সুনিদিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে। অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ং নিরাপত্তার কাজে যারা জড়িত তারাই ঘটিয়েছে ন্যাক্কারজনক কাজ। এই সকল গুম ও হত্যাকা- রহস্য উধঘাটনে নিরাপত্তা বাহিনী তথা রাষ্ট্র হয় ব্যর্থ, না হয় আন্তরিকহীন। যদি আন্তরিক হতেন তাহলে ব্যাগচুরির ঘটনার মতো অপরাধী ধরা না পড়ে পারে না।

ভাবমূর্তি শুধু বিদেশীদের কাছে নয়, দেশের মানুষের কাছেও থাকা দরকার। নিরাপত্তার শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে রাষ্ট্র যেমন ব্যর্থ, তেমনি ব্যক্তিত্বের অটুট পরিচয় দিতে সম্পুন্ন ব্যর্থ হয়েছেন বরিশালের ২০ বছরের তরুণ রুবেল হোসেন। তাই অন্যদের কাছে রুবেল চোর হলেও নিজ অঞ্চলের অনেকের কাছে সে প্রশংসিত। এজন্যই মানুষ দোকানে, ওলিতে, গলিতে, গাড়িতে, বাড়িতে, লঞ্চে, বাসে কিংবা অন্তরমহলেও বলছেন, ‘হালা একখান খাটি বরিশাইল্ল্যাহ!’

মাস ছয়েক আগে প্রথম সারির একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম বরিশালে রাতের আঁধারে মৃত বাবার হাত কবর থেকে বের করে জমির দলিলে সই নিয়েছেন ছেলে। শিরোনামটা পড়েই গা চমকা দিয়ে উঠল। কতটা বিকৃত চিন্তার হলে সন্তান তার মৃত বাবার সাথে এমন অমানবিক আচরণ করতে পারে। আরও হতভম্ভ হলাম ফেবুতে একটা ষাটউর্ধ্বো রিকশাওয়ালার রিক্সার সামনে সাইনবোর্ডে বড় করে লিখা ‘দয়া করে বরিশালের কেউ আমার রিক্সায় উঠবেন না’,পড়ে! পুরান ঢাকায় মাঝে মাঝে এখনো সেই রিক্সাওয়ালার দেখা মেলে।

একদিন তাঁকে দেখে এগিয়ে গেলাম। চোখে হতাশ আর মুখে রোদের পোড়া দাগ। জানতে চাইলাম তার এমন সাইবোর্ড ঝুলিয়ে রাখার কারণ। অনেক বড় নিশ্বাস নিয়ে শুধু এটুকুই বললো, ‘বাবারে মুই বইল্ল্যা কাম হইবো কি, মোর দ্যাশে মুই বিচার পাইনি ক্যারো কাছে, তাই সব থুই ঢাহাতে চইল্ল্যা আইছি। মরলে এইহানেই মরমু। আর যাইমু না। বরিশাইল্ল্যাগো মনে মায়া নাই। ২০ বছর রিক্সা বাইয়া জমানো মোর কষ্টের ট্যাহা দিয়ে যে বাড়ি করমু কথা আছিল হের সবই মাইরা দিছে বরিশাইল্ল্যা বায়রা। দরকার হইলে মুই মাগনা লোক টানমু কিন্তু‘ ট্যাহা দিলেও বরিশাইল্ল্যারে নিমু না।’ নিজ অঞ্চলের লোকের প্রতি এই বৃদ্ধার এত ক্ষোভ দেখে বললাম, চাচা বরিশালে তো শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের মতো লোকও ছিলেন। অনেক সম্মানি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাড়ি বরিশালে। প্রতি উত্তর আসার আগেই তাঁর জীবনের চাকা ঘুরতে লাগলো রিক্সার প্যাডেলে পা বাড়িয়ে।

জীবন নদীর মতো চলে। জীবনের গতি কোথায় গিয়ে শেষ হয় কেউ জানে না। কিন্তু‘ বৃদ্ধ রিক্সা চালকের রিক্সার গতি শেষ হবে অন্য কোথাও অন্য কোন স্টেশনে। তার সাইবোর্ডটি পড়বে অন্য কেউ। সেও জানবে তার মুখে এই ঘটনা। বিচিত্র এই পৃথিবী। মানুষের মনের কালো দাগ নদী ভাঙার দাগের চেয়েও ভয়ংকর। এমন ভয়ংকর ঘটনার মুখোমুখি আমি অনেক বারই হয়েছি। কিন্তু‘ ষাটউর্ধ্বো রিক্সাওয়ালার আঞ্চলিকতার এমন চরম মনোভাব কাটানোর ভাষা আমার নাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাসে আমার পাশে যে ছেলেটি বসেছে তার সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল না কখনোই, জাস্ট পরিচয় হয়েছি ভর্তি পরীক্ষার সময়। পরীক্ষা শেষে ছেলেটির সাথে লাঞ্চ করলাম আমার মেসে। যাওয়ার আগে ছেলেটি ৫০০ টাকা ধার নিলো আমার কাছ থেকে। প্রথম ক্লাসে বসা নিয়ে কয়েকটি ছেলের সাথে তার মনমালিন্য দেখে আমি নিজেই উঠে গিয়ে আরেক বেঞ্চে বসলাম। ছেলেটিকে কেন জগড়ায় সহায়তা করিনি তাই সে আমার উপর বিনা কারণে ক্ষুদ্ধ হয়েছে। হয়েছে কথা কাটাকাটি।

বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি কলেজের কয়েকজন ছেলেকে সাথে নিয়ে সে আমার মেসে হাজির। অনেকটা জোরপূর্বক আমি তার সাথে যাই সেই কলেজে। বড়ভাইদের হস্তক্ষেপে সেদিন ঘটনাটি সমাধান হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪টি বছরে তার সাথে এ ঘটনার কারণে মেশেনি ক্লাসের প্রায় এক তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী। যতবারই তার মুখোমুখি হয়েছি, কেবল মনে হয়েছে সহপাঠির সাথে এতটা অমানবিক আচরণ কিভাবে করে একজন শিক্ষার্থী। বরিশাল থেকে উঠে আসা আমার সেই সহপাঠি এখন অনেক ভালো অবস্থানে চাকুরি করলেও সেদিনের সেই ঘটনার কথা এখনো আলোচনায় আসে বন্ধু মহলে।

শুনেছি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েটিং লিস্ট থেকে ডেকেও শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একথা কতটা সত্য প্রমান নাই। তবে সুযোগ পেয়েও ভর্তি না হওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে যতটুকু জানতে পারলাম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শুনে তারা ভর্তি পরীক্ষা দিলেও, যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা না থাকায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই ভর্তি হতে চান না। অনেকে আবার এ অঞ্চলের পরিবেশ আর মানুষের জীবন ধারার ব্যতিক্রমতাকে দেখিয়েছেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত নোয়াশাল নাটকের একটি দৃশ্যে নাট্য নির্মাতা বরিশাল আর নোয়াখালির মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ চরিত্র দাঁড় করিয়েছেন নেহাত বিনোদনের জন্যে। তাহলে আমজনতারই বা দোষ কিসের? অঞ্চল ভিত্তিক নাটক নির্মিত হতে পারে, কিন্তু‘ বিনোদনের নামে আঞ্চলিকতার বৈরিতা প্রদর্শন যদি নাট্যকারের মূল উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সাধারণের বলার পার্থক্য কোথায়?

নোয়াশাল নাটকে একটি ডায়লগ ছিলো এমন, বরিশালের এক লোক নোয়াখালির লোককে হুমকি দিচ্ছেন, ‘মোরে কি চিন না মনু? মোর লগে বেশি কথা কইলে মুই কিন্তু‘ তোয়ারে কামান দিয়া উড়াইয়া দিমু। এই বলে সে একটি সুপারি গাছ নিয়ে এলো ঘর থেকে। নোয়াখালির লোকটি তখন হাসতে হাসতে বলে, ও আল্লারে হেতাগো কামান অইল আংগো সুপারি গাছ!’

লোকমুখের একটি রাম্যগল্প বহুল জনপ্রিয় এখনো। একবার কুমিল্লার, নোয়াখালি এবং বরিশালের তিন চোর একটি মিষ্টির প্যাকেট চুরি করে প্রত্যেকে মনে মনে ফন্দি আঁটলো কে কত বেশি মিষ্টি খাবে অন্যকে ঠকিয়ে। প্রথমে কুমিল্লার চোরটি মিষ্টির প্যাকেটি খুলে সামনে নিয়ে বললো, জানিস আমাদের দেশে বিমান চলে কিভাবে? অন্য দুজন বললো কিভাবে? সাঁ করে। এই বলে সে চোখের পলকেই গিলে ফেললো একটি মিষ্টি। এই কাজ দেখে নোয়াখালি আর বরিশালের চোর অবাক তাকিয়ে রইল। হঠাৎ নোয়াখালির চোর মিষ্টির প্যাকেট সামনে টেনে বললো, জানিস আমাদের দেশে গরুর গাঁড়ি চলে ক্যামনে? অন্যদুজন বললো ক্যামনে? ক্যাঁতর.. কু্যঁতর..! সেও মূহুর্তে দুটি মিষ্টি গিলে ফেললো। বাকি রইলো বরিশালের চোর। দুই চোরের চোখে তাকিয়ে হঠাৎ বরিশালের চোরটি বললো, জানিস, বরিশালে ট্রেন চলে লক্কর.. জক্কর…, লক্কর.. জক্কর… লক্কর.. জক্কর… করে। এভাবে পুরো মিষ্টির প্যাকেট যখন শেষ, তখন তার ট্রেন চলাও শেষ। তার কেরামতি দেখে অট্টহাসি দিয়ে অন্য দু্ই চোর বললো, কিরে বরিশাইল্ল্যাহ? কি হুনাইলি এইডা? তোদের দেশে ট্রেন যায় কি পানির উপর দিয়ে?

উদাহরণটি বিনোদনের স্বার্থে বাস্তবতা বোঝাতে অনেকে অনেক সময় বলে থাকেন। কিন্তু‘ চোর, বাটপার, চাপাবাজ, খুনি সব জায়গায় কমবেশি সব জায়গায় আছে। ধরা পড়া রুবেলের বাড়ি বরিশালে বলে সবার এতটা সরব হওয়া বা উল্লাসের কোন কারণ নাই। তেমনি যারা রহস্য করে হোক আর গর্ব করেই হোক, নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার জন্যে বলেছেন, ‘দেখেছো আমাগো রুবেল কত বড় সাহসের কাজ করেছে? রাষ্ট্রদূতের ব্যাগ চুরি করেছে! তাদের এমন উক্তি নিজেদের র্নিবুদ্ধিতারই পরিচয়। রুবেলদের যে ব্যক্তিত্ব সংকট, সেই সংকটে স্বয়ং রাষ্ট্র নিজেও।

রাষ্ট্র যেখানে নিজের ব্যক্তিত্ত্ব বজায় রাখতে ব্যার্থ, সেখানে চুরিতে সফল বরিশালের ২০ বছরের তরুণ রুবেল হোসেন। তার দোষ সে চুরি করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র ব্যর্থ তার চুরি ঠেকাতে। তাই লজ্জা হওয়া উচিত সবার। একটা ভিনদেশের রাষ্ট্রদূত যে অনুষ্ঠানে যোগ দিবে, সে অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার প্রয়োজন বোধ করেনি রাষ্ট্র। ২০ বছরের একটি ছেলে অনুষ্ঠান থেকে ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে না গিয়ে সেই অনুষ্ঠানে সে বিষ্পোরক নিয়ে আত্মঘাতিওতো হতে পারতো। তখন জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তো। তাই আজ এই লজ্জা রুবেল বা বরিশালের একার নয়, এই লজ্জা আমরা যারা বাংলাদেশী, আমাদের। এ লজ্জা দেশের নিরাপত্তা বাহীনির।

লেখক- আরিফ চৌধুরী শুভ, সাংবাদিক ও লেখক।
উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন।

Advertisement

কমেন্টস