ভাষা আন্দোলনের মিছিল দেওয়ান আজরফের বাসা থেকেই সর্বপ্রথম বের হতো

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৭

আশিস রহমান-
আজ ৮ই ফাল্গুন। রাত বারোটার পরেই একুশে ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য ভাষাসৈনিকদের সাথে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার কৃতিসন্তান মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ জাতীয় অধ্যাপক দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ চৌধুরী স্যারকে।

ভাষা আন্দোলনে শুধু নেতৃত্বই দেননি বরং ভাষা আন্দোলনের সূচনাকে গতিশীল করেছিলেন তিনি। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অীধবেশনে কুমিল্লার প্রখ্যাত আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষারূপে গণ্য করার দাবি জানালে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী স্যার খাজা নাজিম উদ্দীন এবং গণপরিষদের স্পিকার মৌলভী তমিজ উদ্দিন খান তার বিরোধিতা করে যে বক্তব্য পেশ করেন তাতে পূর্ববাংলার সর্বত্র আগুন জ্বলে ওঠে। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়াদী উদ্যান) এক জনসভায় উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কায়েদে আজমের এ আকস্মিক ঘোষণায় কোনো প্রতিবাদ না হলেও তার দু’দিন পর (২৪ মার্চ) কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পুনরায় এ উক্তি করলে ডিগ্রি গ্রহণকারী কিছু ছাত্র তার প্রতিবাদ করেন। সেই উত্তাল সময়ে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন নওবেলাল নামক পত্রিকার সম্পাদক।

সে পত্রিকায় গণপরিষদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বক্তব্যসহ জিন্নাহ সাহেবের ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করা হয়। তার ফলে সিলেটের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী নওবেলাল তথা দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এবং মাহমুদ আলীর ওপর ক্ষেপে যায়। তারা উভয়ে মিলে তৎকালীন গোবিন্দ চরণ পার্কে যে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন, তাতে দেওয়ান অহিদুর রেজা ও মকসুদ আহমদ নামে একজন ছাত্র উপস্থিত ছিলেন। এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী হঠাৎ সেই সভাস্থলে উপস্থিত হয়ে মকসুদ আহমদকে ধরে নিয়ে ভীষণ প্রহার করে।

ট্রাক ভর্তি একদল লোক মানিকপীরের টিলাসংলগ্ন ‘নওবেলাল’ অফিসে উপস্থিত হয়ে উর্দু ভাষা সমর্থনকারীদের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ বা মাহমুদ আলীর পক্ষে সিলেটে চলাফেরা করা ভীষণ সংকটজনক ছিল। প্রায়ই সংবাদ আসতো তারা যেকোন সময় আক্রান্ত হতে পারেন। তা সত্ত্বেও তারা বাংলা ভাষার পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যান। ১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ সুনামগঞ্জ কলেজের লজিকের প্রভাষক নিযুক্ত হন। ১৯৪৯ সালে ভাইস প্রিন্সিপাল ও ৫৪ সালে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন তমুদ্দুন মজলিসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন থেকে আজীবন তমুদ্দুন মজলিসের সুদিন-দুর্দিনে সভাপতি ছিলেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মিছিল দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের বাসা থেকেই সর্বপ্রথম বের হতো এবং সমস্ত শহর প্রদক্ষিণ করে আবার তাঁর বাসাতেই ফিরে আসতো।

এই ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ১৯৫৪ সালে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফকে সুনামগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক, ভাষা আন্দোলনের মাসে আমরা এই ভাষা সৈনিককেই ভুলতে বসেছি। ক’জনইবা জানেন এই সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার এই গর্বিত সন্তানের ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস!

 

Advertisement

কমেন্টস