রাত পোহালেই শুভ জন্মদিন

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ৩০, ২০১৬

৩১ ডিসেম্বর ছাত্র-শিক্ষক দু'জনেরই জন্মদিন

ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ-
‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র/ নানা কাজে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র’- দিনরাত শিখার যেমন শেষ নেই, তেমনি চাইলেও একজন মানুষ সবার ছাত্র হতে পারে না। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হাজারো শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র হয়েছি সত্য, কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে হৃদয় মনিকোঠায় প্রিয় শিক্ষককের স্থান সবাইকে দিতে পারিনি বলে দু:খিত।

একজন ছাত্র প্রিয় শিক্ষকের স্থানে তখনই একজন শিক্ষককে বসান, যখন সবকিছুর উর্ধ্বে ছাত্রটি আবিষ্কার করেন তার শিক্ষক কারো প্রচোরণায় কখনো রুদ্ধ করেন না শিক্ষার দ্বার। ছাত্রের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে শিক্ষকের মুখে কখনো হাসি, কখনো অশ্রুর টলমল। যাঁর কাছে ছাত্রের কোন রং, জাত বা বয়স থাকে না। থাকে না কোন মান অভিমান। থাকে সোহাগ ও শাসন। মুখোমুখি হলেই পিতৃত্বসুলভ আচরণে বুকে জড়িয়ে নেন। নিজের খাওয়ারটুকু ভাগাভাগি করেন ছাত্রের সাথে। একটু আঁড়াল হলেই খবর নেন কিংবা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিবন্ধকতায় ছাত্রের জন্যে কিছু না করার আক্ষেপ ও কষ্ট মনে লালন করেন।

এমন শিক্ষকের দেখা শিক্ষাজীবনে কতজন ছাত্র পেয়েছে জানি না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হয়ে সেই জায়গায় আমি আবিষ্কার করছি প্রফেসর ড. ফিরোজ আহমেদকে। বিজ্ঞানী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে নয়, একজন সাধারণ শিক্ষক হিসাবে তাঁকে প্রথম পেয়েছি শ্রেণিকক্ষে। সাড়ে চার দশক শিক্ষকতা জীবন শেষে বিশ্রামের বদৌলতে এখনো শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষার মানউন্নয়নে। যুক্ত আছেন পদ্মা বহুমুখি সেতুর বাস্তবায়ন কাজের সাথে। সত্তোর উর্ধ্বে এসেও ক্লান্তি তাঁকে অনুভব করেনি। যাঁর মমনে, মগজে সব সময় জাতি গড়নের শুভচিন্তা, ক্লান্তি তাঁকে বস করতে পারে না। আড়াল করতে পারে না তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষাজীবনের গৌরব উজ্জল অতীতকে।

সামান্য কলমযোদ্ধা হয়ে ড. ফিরোজ আহমেদের জীবন সমাচার করার সাহস আমার নেই, কিন্তু বুক ফুলিয়ে গর্ব করছি তাঁকে প্রিয় শিক্ষকের স্থান দিতে পেরে। এক দশক আগেও যারা বাংলাদেশ বুয়েট, হারবার্ড বা যুক্তরাজ্যের স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন, তাদের অনেকের সৌভাগ্য হয়েছে সরাসরি তাঁর শিক্ষার্থী হওয়ার। সরাসরি তাঁর শিক্ষার্থী না হওয়ার আপসোস অনেকেরই এখন হতে পারে। অক্সফোর্ড, হারর্বাড কিংবা এমআইটির লাইব্রেরিতে বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে যখন দেখবেন বইটির লেখক আপনার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর ড. এম ফিরোজ আহমেদ, তখন নিশ্চিত আনন্দ অশ্রু টলমল করবে। বিশ্বের ১৫৫টি লাইব্রেরিতে তাঁর লেখা বই নিবন্ধিত। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৮টি। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর প্রায় ১৫০টির অধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

কাজের তাগিদে পৃথিবীর প্রায় ৫২ শতাংশ দেশে তিনি বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব সভা সেমিনারে। ১৯৬৮ সালে বুয়েট থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে প্রভাষক হিসাবে যোগদান শুরু করে শেষ পর্যন্ত হয়েছেন বুয়েটের ডিন। বুয়েট শিক্ষায়, গবেষণায় দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ হয়ে উঠেছে তাঁর মতো অনেকের প্রচেষ্ঠায়। বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সাথে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। ঢাকা ওয়াসা বোর্ড, বিএটিসিআই এর পূরকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন দীর্ঘদিন। ২০১২ সালে থেকে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন সততা ও নিষ্ঠার সাথে।

দক্ষিণ এশিয়ার সেনিটেশন মুভমেন্টের উদ্যোগতা হয়ে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রফেসর ফিরোজ আহমেদে সামনে থেকে। এজন্যে ২০১২ সালে অর্জন করেনে জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার। ২০০২ সালে ড. এম এ রশিদ স্বর্ণপদক, ২০০৪ সালে ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স পদক, ড. এম ও গণি স্মৃতি স্বর্ণ পদক, ২০১৫ সালে ‘প্রিন্স সুলতান বীন আবদুল আজিজ’ প্রাইজ ফর ওয়াটার লাভ করেন।

‘ওয়াল্ড এডুকেশন কংগ্রেস ও সিডিম’ ২০১৬ সালে প্রফেসর আহমেদকে একমাত্র বাংলাদেশী হিসাবে ‘এডুকেশন লিডারশিপ এওয়ার্ডে’ মনোনীত করেন। গত ১৩ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মানসূচক এই পদক। প্রিয় শিক্ষকের এতবড় অর্জন একজন ছাত্রের আনন্দ অশ্রুকে উজ্জ্বল করেছে। দেশের সেবায় সাহসী করে তুলেছে।

শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য অবর্ণণীয় অবদান রাখা আলোকিত এই মানুষটি ১৯৪৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। কাকতালীয়ভাবে শুভদিনটি আমারও। ১৯৯১ সালের ৩১ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর জেলায় আমার জন্ম। রাত পোহালেই প্রিয় স্যারের শুভজন্মদিন।

৭২ এ ধরায় আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আপনার সকল শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে শুভ জন্মদিন প্রিয় স্যার।

লেখক: সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা- নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন
৩০ ডিসেম্বর-২০১৬

Advertisement

কমেন্টস