হিরো শব্দটির বিশালতা কত!

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬

ফারজানা আক্তার-
হিরো একটি শব্দ কিন্তু এর বিশালতা কত! আমরা কেউ কি সম্পূর্ণ জানি? হয়তো জানি হয়তো জানি না, আবার সবার কাছে এর সংজ্ঞা একও হবে না। এক এক জনের কাছে এক এক রকম।
আমি যেহেতু হিরো শব্দটা নিয়ে কিছু বলবো তাই আমার কাছে হিরো শব্দটা কি সেটা আগে বলি। হিরো বা হিরোইন সেই ব্যক্তি যে তার নিজের চেষ্টাই, নিজের যোগ্যতাই এমন কিছু অর্জন করে যা পুরো বিশ্বের কাছে তার দেশ-দেশের মানুষের মুখ উজ্জ্বল করে তুলে।

যে অর্জন দেশ আর দেশের মানুষের মুখ উজ্জ্বল করে সেই অর্জন অবশ্যই ভালো কিছুই হবে। হিরো হবে তরুণদের আদর্শ, বৃদ্ধদের উদহারণ আর এরাই দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে পুরো বিশ্বের কাছে।

আমরা সাধারণত হিরো বা হিরোইন তাদেরকেই বুঝি যারা অভিনয় করে মানি হচ্ছে অভিনয়শিল্পী। আমরা মনে করি হিরো বা হিরোইন হবে সুন্দর, স্মার্ট, গুড লুকিং ইত্যাদি। আমাদের এই ধারণাটাও ভুল। কিন্ত আমরা সেই যখন থেকে বুঝতে শিখছি তখন থেকেই এটাই ভেবে আসছি। শুধু অভিনয় করে গেলেই অভিনেতা হওয়া যায় নারে অভিনয়টা বুঝতে হয়, এর ভিতর ঢুকতে হয়। অভিনয়টাকে বাস্তব প্রমাণ করার নামই হলো অভিনয়।

এই আমি, এই আমরা আমাদের কাছে হিরো কে বা করা হয়? যারা তিন থেকে চারটা মেয়ে নিয়ে মিউজিক ভিডিও করে ছেড়ে দেয় তারা নয় তো! কেউ একজন নিজেকে হিরো বা হিরোইন মনে করে কিছু ভিডিও করে একটা ফেসবুক পেজ খুলে, ইউটিউব চ্যানেলে ছেড়ে দিলেই হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা এমনটা কি হবার কথা ছিলো? তাহলে যারা আসলেই হিরো তাদের অবস্থানটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?

হিরোর অ্যাকচুয়াল সংজ্ঞা আর হিরোর বিষয়ে আমরা যা মনে করি এই দুইটার মধ্যে হিরো আলম কোনটার মধ্যে পড়ে? একটু বলবেন প্লিজ। হিরো আলম নিজেকে হিরো মনে করে সেটা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নাই।

কেউ যদি নিজেকে হিরো বা হিরোইন মনে করে সেটা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথা থাকার কথা না, তার এই মনে করাকে সে যদি বাস্তবে প্রমাণ করার চায় সেটাও আমাদের মাথা ব্যথা না। তাহলে মাথা ব্যথা কোথায়? মাথা ব্যথা হচ্ছে তখন যখন তার এই হিরো হবার ইচ্ছেটা আমাদের অ্যাকচুয়াল সংস্কৃতি, আমাদের আসল হিরো হিরোইনকে অপমান করে তখন।

কষ্ট লাগে তখন যখন এই মনে মনে হিরো হওয়া মানুষগুলোকে আমরা লাইক কমেন্ট শেয়ার দিয়ে গুগল শীর্ষ কীওয়ার্ড বানিয়ে ফেলি।
আমি একটু কনফিউসড হয়ে যাচ্ছি আমাদের সংস্কৃতির অপমান, আমাদের শিল্পীদের অপমান, আমাদের হিরোদের অপমান কি আমরা জনগণ করছি নাকি এই মনে মনে হিরো বনে যাওয়া মানুষগুলো করছে!
এই দেশে হিরো আলমের ফ্রেন্ডের অভাব নাই কিন্তু ভলান্টিয়ারের অভাব আছে। বুঝেন নাই ব্যাপারটা? আমি বুঝিয়ে বলছি।
এক টাকার আহার নামে প্রকল্প আছে। আমি প্রথম একে ফেসবুকে দেখতে পাই। কি এক প্রকল্প কল্পনা করা যায় এক টাকায় পেট পুরে খাওয়া যায়। আপনি কখনো ভাবতে পেরেছেন এই যুগে এমনটা হতে পারে? আপনি বলতে পারেন এমন অনেক গ্রুপ আছে যারা বিনা টাকায় পেট পুরে খেতে দেয়, বিনাপয়সায় খাওয়া এক কথা আর কিনে খাওয়া এক কথা রে ভাই। এক টাকা দিয়ে তারা নিজেদের খাবার কিনে খাচ্ছে। সাধ্যের মধ্যে সবটুকু সুখ।

এস এম সুজা আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তিনি এবং তার কিছু বন্ধু এই প্রকল্পের সাথে সেই প্রথম থেকেই যুক্ত আছেন। তিনি পেশায় সাংবাদিক তবে হলুদ সাংবাদিক নন। বন্যার সময় এই এক টাকার আহার গ্রুপটি খাবার নিয়ে বন্যায় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে গিয়েছিলো। রাত-দিন এক করে তারা খাবার রান্না করে ওই মানুষগুলোকে খেতে দিয়েছিলো। তারা বার বার ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলো সাহায্য লাগবে, ভলান্টিয়ার লাগবে। লাইক, শেয়ার ভলান্টিয়ার ওরা পেয়েছিলো কিন্ত হিরো আলমের ফ্যানের সংখ্যা তার থেকে খুব খুব বেশি। সাঁওতাল, রোহিঙ্গা যেখানেই যখন সাহায্য দরকার আমি এস এম সুজা ভাইয়া আর তার গ্রুপকে দেখেছি সেখানে যেতে। তারা রাত-দিন একসাথে করে কয়দিন কাজ করার পর যখন অসুস্থ হয়ে যেতেন তখন ফেসবুকে ভলান্টিয়ার চেয়ে পোস্ট করতেন, সেই পোস্টে লাইক কমেন্ট শেয়ার হিরো আলমের পোস্টের ১০ ভাগের এক ভাগও না।

আমি বলছি না এক টাকার আহার গ্রুপে অনেক লাইক শেয়ার কমেন্ট দিলেই আহামরি কিছু হয়ে যাবে। কিন্তু এটা বলছি আমরা যদি এই গ্রুপটার সাথে যুক্ত হয়ে যার যেমন সাধ্য আছে সেটা দিয়ে সাহায্য করি তাহলে অনেকগুলো মানুষ খেতে পারবে পেট পুরে। এতোগুলাে মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। তখন আপনি নিজেকে একজন হিরো ভাবতে পারেন এই ভেবে যে একজন মানুষ পেট পুরে খেতে পেরেছে আপনার জন্য।

হিরো আলমকে দিয়ে কিছু বিজ্ঞাপনে কাজ করানো হয়েছে। তাও হাসান মাসুদ, সুমন পাটোয়ারীর মতো অভিনেতাদের সাথে। কেমন করে সম্ভব এটা? কত কত গুণী অভিনেতা, অভিনেত্রী আছে যারা একটু সুযোগ পেলেই অনেক ভালো কিছু করতে পারবে। তারা যখন একটু
সুযোগের জন্য যায় তখন সবাই তাদের কাছে টাকা চায়, এই চায় সেই চায়। তারকা বনে যাওয়া অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীর গল্প শুনে দেখবেন তারা কেমন করে এতদূর এসেছে।

হিরো আলমের মধ্যে এমন কি আছে তাকে বিজ্ঞাপনে নিয়ে আসা হলো! কারণ হলো টিআরপি। শুধুমাত্র টিআরপির জন্য হিরো আলমকে এতদূর নিয়ে আসা হলো। টিআরপির জন্য নিজের দেশের শিল্পী, সংস্কৃতির
মান-সম্মান সব শেষ করা হচ্ছে।

এখন কেউ কেউ বলতে পারে হিরো আলম নিজের টাকায় চেষ্টা করছে হিরো হবার তাকে নিয়ে কেন এত সমস্যা আমাদের? নিজের টাকা পরের টাকার কথা এটা না। কথা হচ্ছে সে নিজের টাকা খরচ করছে ভালো কথা কিন্তু সে যে কাজে এই টাকা খরচ করছে সেটা যে পুরা বিশ্বের কাছে আমাদের দেশের শিল্পী সংস্কৃতিকে অপমান করছে সেটা দেখবেন না? আজ সে করছে, তাকে যখন আমরা মাথায় নিয়ে নাচানাচি করছি কাল আরো

১০০ জন ঠিক এই কাজটাই করবে। তখন পুরা বিশ্ব জানবে আমাদের শিল্পীরা এমন হাস্যকর, আমাদের সংস্কৃতি হাস্যকর। গায়ে লাগবে তখন কিছু বলেন তো?

মানতে পারবেন তো এমন অপমান? যারা বিজ্ঞাপন বানান তাদের কাছে হাত জোর করছি প্লিজ, আপনাদের মাধ্যমে আমরা ভালো একটা মেসেজ পাই, পুরা বিশ্বকে আপনারা ভালো একটা মেসেজ দেন। দয়া করে এমন কাউকে নিয়ে আসবেন না যাদের দিয়ে আপনার পুরা কাজটাই ভণ্ডামি হয়ে যাবে। ভালো কাজ হলে টিআরপি এমনিই বাড়বে বিশ্বাস করেন। হাজার হাজার মেধাবী অভিনেতা অভিনেত্রী আছে তাদের একটু সুযোগ দেন প্লিজ।
লেখক: অ্যাসিস্টেন্ট ট্রেইনার অফ বেসিস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইটিএম)।

 

Advertisement

কমেন্টস