‘সত্য কথাটি আজ না বলে আর পারলাম না’

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৬, ২০১৮

জুনাইদ আল হাবিব।।

দুরন্তপনায় কাটানো প্রতিটি মুহুর্ত। মুখেতে মায়ার হাসি আর বুকেতে অকুতভয় বল নিয়েই দিকবিদিক ছুটে চলা। প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে পাঠশালার পথ মাড়িয়ে বর্ণ শিখেছি এইতো সেদিনও। কখনও গ্রাম কখনো উপকূলের নানা বাঁধায় জীবন যেন আটকে যায় চোরাবালির গর্তে ।  আবারো সেখান থেকে ওঠে পথ চলার চেষ্টা করা। চলতে চলতে দৌঁড়াতে থাকি একসময়। বন্ধুদের আড্ডা, পাখির মতানো সুর আর প্রকৃতির মায়ায় আত্মা ও শরীর মজতো বহুমাত্রিক খেলায়। কতো নাম গ্রাম্য খেলার। চোডাণ্ডা, মুরগি নাড়াই, লাঠি লাঠিতে কোপাকুপি, চোর-ডাকাত, নদীতে জলকিলকিল, ক্রিকেট-ফুটবলসহ আরো কতো মজার মজার খেলা। বয়স বাড়ে, খেলার প্রতি আরো বাড়ে টান। পাড়া গাঁয়ের মেঠোপথেই বেড়ে ওঠা এসবের সাথে। স্মৃতিবিজড়িত সেই শৈশবের পাঠশালাটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। আমিও দাঁড়িয়ে আছি স্মৃতির পাহাড়ের পাদদেশে। স্মৃতিময় শৈশবের কথা মনে করলে নিজেই হয়ে যাই কবির কবিতা, লেখকের গল্প অার চিত্রাকারের রংতুুলির চরিত্র। কি মধুর শৈশব!

পাঠশালায় শিখেছি, ‘আঘাতই মানুষকে বদলে দেয়।’ আমিও বদলে গেছি আঘাতের কষাঘাতে। শৈশবে মুখোমুখি হওয়া নানা প্রতিকূলতা আমাকে শেখার পথ দেখিয়েছে।  তাই সহজ পথটি কখনোই সহজ ছিল না। এটাই হয়তো মেঠোপথের প্রতিটি জীবনের ইতিহাস। এটাই হয়তো বাস্তব। কিন্তু গন্তব্যের খোঁজে থেমে না গিয়ে ঠিকই পদ চলেছে সমকদমে সামনে। পদই আমাকে চারপাশের ভাঙ্গা রাস্তা, ভাঙ্গা সাঁকো, অসহায় মানুষ, আহতের আর্তনাদ, অবিচার, অন্যায়, আর সমাজের উচ্চবিত্ত বানাম মানুষের মধ্যে বহুমাত্রিক বৈষম্যের সাক্ষী করে তোলে। যার মনে স্বদেশ থাকে, সে কি এসবের মাঝে নিজেকে নিশ্চুপ রাখতে পারে? হ্যাঁ আমি পারিনি চুপ থাকতে? কলম লিখে চলছে অবিরত।

ক্লান্তি আমায় আজও পরাজিত করতে পারেনি সত্যের অন্বেষণে। সেই আমি সদা ছুটে চলেছি সত্যের খোঁজে। কিশোর বয়সে দেখা পেয়েছি অষ্টকবৃত্ত সৃজনশীলতার। এসবের কারণেই পুঁথিগত বিদ্যা বদ করতে পারেনি। কোথাও নতুনত্ব দেখলেই পত্রপত্রিকা কিংবা গল্পের বইয়ে মজে যেতাম। ছুটে যেতাম বহুমাত্রিক সৃজনশীল ব্যক্তিদের কাছে। সন্ধান করতাম তাঁরা কোথায় আছেন। উদ্দেশ্য একটাই, নিজেকে জানা। তাদের কাছে অজানাটার সত্য জানা। সেই বাল্যবেলার অভ্যাস, কৈশর তারুণ্যে এসেও ছাড়তে পারিনি।হয়তো আর কখনো হবেও না। আমি জড়িয়ে গেলাম জ্ঞানতত্ত্বের সন্ধানে পাঠ বৃক্ষের আমৃত্যু শিকড়ে। আমার কলম আমার খুঁটি। আমি শক্ত করে খুঁটি ধরে আছি শিরা উপশিরায়। কোন কালবৈশাখী ঝড় কিংবা উপকূলীয় মহাপ্রলয়ংকারী ঝড়ও মৃত্যুর আগে এই পাঠ বৃক্ষের শিকড় উপড়ে ফেলতে পারবে না। আমি প্রস্তুত।

লেখার শক্তি আমি বুঝে গেছি। লেখা  পরিবর্তন আনতে পারে আমি বিশ্বাস করি অনেক আগ থেকেই। চেষ্টা করেছি পরিবর্তনের লেখাই লেখবো যদি কখনো লেখার সুযোগ পাই। কবিতা দিয়েই শুরু করেছি। আমি মনে করি মানুষ যদি শুরুই না করে, তাহলে সে ভুল করবে কিভাবে। আমিও শুরুতে অনেক ভুল করেছি। এখনো করি। ভুলের উর্ধ্বে কেউ না। তাই আমার মতো যারা লেখালেখিতে আসতে চায় আজ, আমি তাদের বলবো শুরু করে দিন। যেমন আমি করেছিলাম।

একদিন জেনে গেলাম সংবাদ লেখার কৌশল। সংবাদের মতোই কিন্তু কিছু বিষয় লক্ষ্য রেখে লেখলে লেখাটা যে ফিচার হয়, তাও একদিন জেনে গেলাম।  আমি হয়ে উঠতে লাগলাম একজন তরুণ সংবাদকর্মী পরিচয়ে। প্রতিদিন নতুনত্ব আমাকে ভাবায়, শেখায় এবং আরো আগ্রহী করে। আমি ছুটে চলি মেঠোপথ থেকে পিচঢালা পথে। বাড়তে থাকে আমার পরিধি। আমার চেনা জানা হয় সংবাদ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে।

এতদিন পরে এসে হঠাৎ একদিন বুঝতে পারি আমি যে পথে ছুটছি সেপথে সহজ পথ নয়। এ পথে যেমন আনন্দ আছে, শিক্ষা আছে, তেমনি আছে নিন্দুকের মহাজ্ঞ সমালোচনা আর প্রতিহিংসার প্রতিযোগিতা। কিন্তু দুরন্ত এক কিশোর সংবাদকর্মী হিসাবে এসব আমি মানতে নারাজ। তবুও ভাবতে থাকি এ সব হবে কেন? পরিচিত জনদের সাথে ঘটে যাওয়া কিছু সমস্যা শেয়ার করলেও বেশির ভাগই অবমূল্যায়িত হয়েছি। ভালো পরামর্শের চেয়ে ছোট বলে খাটো হয়েছি। আমাকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতেই রাখার চেষ্টা করা হয়েছে সব সময়। আমি কি সত্যি এমন?

আক্ষেপের বিষয়গুলো নিজেকে অনেক ভাবাতো অবসরে। কখনো হতাশ আবার কখনো অশ্রুন্সিক্ত হতাম অন্যায় চেপে দেওয়া কষ্টে। একসময় ভাবলাম হয়তো সমাজটাই এমন। এ সমাজে ছোটদের মূল্যায়নটা এখনো সেভাবে দেওয়ার মানসিকতা গড়ে উঠেনি। সাংবাদিক হলেতো আরো না। সত্য এখানে যেমন অনেক গভীরে, অন্ধকার ঠিক ততই কাছে। একজন তরুণ সংবাদকর্মী হিসাবে অন্তত আমি  কাজের মূল্যায়ন খুব কমই পেয়েছি আমার জীবনে। আস্তে আস্তে দেখলাম আমার মতো আরো অনেক কিশোর সংবাদকর্মীর জীবনচিত্র আমারই মতো। তাই আজ আর আক্ষেপ করছি না, ভাবলাম আমিও একদিন বড় হব। সেদিন আমার যারা ছোট থাকবে সংবাদ পেশায়, আমি তাদের সাথে এমনটা করবো না। আমার সাথে আজ যা যা হচ্ছে, আমি তখন তাদের সেই জায়গাগুলোতে সচেতন করে শিখার সুযোগ করে দিব।

অনেক বড় বড় সাংবাদিককে দেখেছি আমার সামনেই বলতে, ‘ওহ, সেতো ছোট মানুষ। সে কি লিখলো? ছোট মাথায় অার কতটুকু লিখবে? বাদ দাওতো বাচ্চা পোলাপাইনের লেখাটেকা। তার লেখায় কি আসে আর কি যায়? পোলাপাইনের মুতে আছাড় খেতে নাই ।’

আবার অনেক সাধারণকেও বলতে দেখি, ‘এতো ছোট পোলা, কিসের আবার সাংবাদিক? বাহ! ঠাট্টা করে তিনি বেশ মজাই পেলেন। মনে হচ্ছে বিরানী পান খেলেও এত মজা পেতেন না। আবার বিভিন্ন অফিসে সংবাদ সংগ্রহকালেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি কিশোর সংবাদকর্মীরা। ছোট বলে অনেক পাঠক এবং অফিসও কিশোর সংবাদকর্মীকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনেক সময় দিতে চান না। তাদের মন থাকলেও মানসিকতা থাকেন না। হয়তো ভাবছেন আমরা কতটুকুই বা কি করতে পারবো?

ছোট বলেই কি আমাকে এভাবে দেখা হচ্ছে না? এটা আমার কাজের প্রতি অন্যায় অবমাননা নয় কি? নাকি আমাকে হিংসা করছেন আপনারা? আমি যেহেতু  একজন কিশোর সংবাদকর্মী, তাই আমার মূল্যায়ন আপনাদের কাছে দু’ভাবে আমি প্রত্যাশা করি।

প্রথমত, আমি কিশোর এবং আপনাদের স্নেহ পাবার অধিকার আমার আছে। আপনারা কি সেটি আমাকে করেন? যদি না করে থাকেন, তাহলে আপনারা অগ্রজরা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে গেলেন।

দ্বিতীয়ত, আমি এবং আপনাদের উভয়ের মিল ‘সংবাদকর্মী’ হিসাবে। তাই এই জায়গায় আমার মূল্যায়ন করা দরকার আমার লেখার বিচারে, বয়স বা সাইজ দেখে নয়। তাই আক্ষেপ লাগে, মানসিক যন্ত্রণা বাড়ে, যখন আমার মতো কিশোর সংবাদকর্মীদের অগ্রজরা এইসব বিচারে পিছিয়ে রাখেন। এটাই কি রীতি?

শুধু অগ্রজ সাংবাদিকদের কাছেই নয়, আজকাল ছোট বলে পত্রিকার সম্পাদকরাও কিশোর সংবাদকর্মীদের মূল্যায়ন করছেন না। অনেকেই বলে দেন যা লেখ তোমরা, তাতে প্রকাশ হলেই ঢের। তোমাদের লেখা কে পড়বে? অনেকে বলেন,  ছোট সাংবাদিকের লেখা আমরা ছাপাই না। আপনাদের কাছে আমার একটা প্রশ্ন,  ছোট সাংবাদিক কেন, ছোট মানুষের লেখা ছাপালে বা প্রকাশ করলে আপনার সমস্যা কোথায়? লেখার দিকে চোখ রাখলে কি লেখক ছোট না বড়, তা কি দেখা যায়? আমি জানি অনেকেই আমার এই মতের সাথে একমত হবেন না। কারণ আপনি আমার মতো বাঁধাগ্রস্ত হননি। আবার অনেকেই ভাবছেন আমি ছোটমুখে অনেক বড় বড় কথা বলছি। দুএকজন ধরেই নিলেন এতক্ষণ আমি আপনার সময় নষ্ট করে আপনাকে জ্ঞান দিচ্ছি। খুব কম সংখ্যক সাংবাদিক বা পাঠক আছেন, যারা আমার কথাগুলোকে সত্যই মনে করে কিশোর সাংবাদিকদের প্রতি একটু অনুশোচনা করবেন।আমার বিশ্বাস অনুশোচনা করবেনই।

আমি মনে করি, একজন কিশোর সাংবাদকর্মীর একটি রিপোর্টও একটি পত্রিকাকে আলোচনায় নিয়ে আসতে পারে। মান বাড়াতে পারে পত্রিকার। সমাজ, দেশ রক্ষা পেতে পারে  বিভিন্ন উপস্বর্গ থেকে। আপনাদের বুঝতে হবে আপনারা যে বয়সে হাতে খড়ি শিখেছেন, সে বয়সে এখনকার বাচ্চারাও অনেক এগিয়ে থাকে। তারা প্রযুক্তির এতটাই কাছে চলে যায়,  যেটা আপনাদের পরিণত বয়সেই অনেকের কাছে অধরাই রয়েছে এখনো।

এবার শুনুন, এত বাঁধার পরেও আমি কিভাবে লিখি। আমি এবং আমার বন্ধুরা যখন এভাবে লেখা প্রকাশে বার বার বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছি, তখন বন্ধুরা মিলেই সবার সবগুলো লেখা একত্র করে একটি ম্যাগাজিন আকারে বের করি একদিন। এখনো আমরা সেটিই করে যাচ্ছি।বাহ আমরা আমাদের কাছেই লেখক। হাহাহা। কিন্তু সেটি সর্বজন করতে হলে আমাদের বড় বড় পত্রিকায় লেখার সুযোগ দিতেই হবে। আমাদের কথাগুলোও বলার সুযোগ দিতে হবে।

আমরা যখন টেলিভিশন বা বড় পত্রিকার দিকে তাকাই, তখন আমাদেরও স্বপ্ন জাগে মনে, তাদের মতো হবো। কিন্তু সুযোগটা কোথায় কে দেয়? দেশে অসংখ্য টিভি চ্যানেল রয়েছে। কয়টা চ্যানেলে কিশোর সংবাদকর্মীদের জন্য দরজা খোলা রয়েছে? দিলেও সেটি কত শতাংশ? এটা কি বাড়ানো উচিত নয়?

জেলা পর্যায়ে যখন টিভি ও পত্রিকায় টাকার বিনিময়ে প্রতিনিধি নিয়োগ পায়, তখন দু:খ লাগে আরো বেশি। এরা সৎ সাংবাদিকতার চর্চাটা করবে কিভাবে? সত্য সংবাদের চেয়ে এদের কাছে অর্থের বিনিময়ে সংবাদ পরিবেশনই বিবেচ্য হয়ে উঠে। তাদের কারণে আমরাও অনেকাংশে কলঙ্কিত হই। নিজ পেশার প্রতি এমন ঘৃণীত অভিযোগটি দিতে আমারো খুব দুঃখ লাগছে। কিন্তু সত্য কথাটি আজ না বলে আর পারলাম না।

লেখক: কিশোর সাংবাদিক, লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় পত্রিকার প্রতিনিধি।।

কমেন্টস