প্রাইভেটকারে তুলে তরুণীকে ‘ধর্ষণচেষ্টা’ নাকি অন্যকিছু?

প্রকাশঃ জুন ১০, ২০১৮

মেরিনা মিতু।।

‘রনি হক। মোহাম্মদপুর কলেজ গেট সিগনাল। প্রাইভেটকারের ভেতরে অপরিচিত নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা। এই সম্পর্কিত একটি ভিডিও গতকাল রাতে ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ভিডিও শেয়ারকারীর তথ্য মোতাবেক যেটা দেখা যায় তা হলো, গাড়ির ভেতর ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে আশেপাশের মানুষজন গাড়ির চালককে নামিয়ে গণপিটুনি দেয়। একপর্যায়ে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় চালক পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে গাড়ি থেকে আরেক লোককে টেনে নামানো হয়, যাকে সবাই গাড়ির মালিক বলে ধারণা করে। সেই সময় তাকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে গণধোলাই দেয়া হয়। কিন্তু ভিডিওর এক অংশে দুটি মেয়েকে দেখা যায় ।যাদের একজন সেই সময় অভিযোগ করে বলেছিলেন,  তাঁর বান্ধবীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করতে চেয়েছে।

অপরদিকে গাড়ির মালিক জানান, খামারবাড়ি থেকে ১২০০ টাকা চুক্তিতে তাঁর গাড়িতে স্বেচ্ছায় উঠেন এই তরুণী। এ নিয়ে  উত্তাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ছাড়িয়ে গোটা দেশের মানুষের মধ্যে।

এই ঘটনায় সারাদেশ জুড়ে একটাই প্রশ্ন, ব্যস্ত রাস্তায় চলন্ত গাড়ির মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টা; এ কেমন দেশে আছি আমরা? আসল ঘটনা কি ছিলো সেই প্রশ্নটা প্রথম দফায় না আসলেও কিছু তথ্যের ভিত্তিতে এই মুহূর্তে সেটা গুরুত্বপূর্ণ? আর তা নিয়েই কাজ করছে বিডিমর্নিং। জানাতে চাই ঠিক কি ঘটে ছিলো গতকাল। ধর্ষণের চেষ্টা নাকি খামারবাড়ি থেকে ১২০০ টাকা দিয়ে ভাড়া করে নেয়া কোনো পেশাদার যৌনকর্মীর সাথে টাকা নিয়ে গঞ্জনা! সেটায় আসুন একটু জেনে নিই।

৯ জুন, শনিবার গভীর রাতে ঘটনার দুটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করেন রাফি আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। রাফি আহমেদ তার ফেসবুক পোস্টে জানান, তিনি অফিস থেকে ফেরার সময় মোহাম্মদপুর কলেজগেট সিগন্যালে তার সামনে থাকা গাড়িতে একজন ছেলে ও একজন মেয়েকে ধস্তাধস্তি করতে দেখেন।

গাড়ির গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় তিনি গাড়িটিকে অনুসরণ করেন। যানজটের কারণে গাড়িটি পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে বলে পোস্টে উল্লেখ করেন রাফি।

রাফির পোস্টে থেকে জানা যায়, গাড়ির মালিক হিসেবে যে ব্যক্তিকে নামিয়ে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয় তাঁর নাম রনি হক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সবাই তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল লিংক দিতে থাকেন।

রাফি আহমেদ তার পোস্টে দাবি করেন, গাড়িটি যানজটে আটকা পড়লে তিনিসহ সাধারণ মানুষ গাড়িটির সামনে গিয়ে দেখেন ছেলেটি মেয়েটিকে ধর্ষণ করছে। গাড়িটির নম্বর ‘ঢাকা মেট্রো – গ ২৯- ৫৪১৪’। রনি হক ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই প্রাইভেট কারসহ একটি ছবি পোস্ট করেন। সে ছবিতে থাকা প্রাইভেট কারের নম্বরের সঙ্গে গত কালকের ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ির নম্বর মিলে গেছে।

আজ রবিবার শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণেশ গোপাল বিশ্বাস বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘আটক রনি হক থানায় আছে। যে মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় সেই মেয়ে এবং তাঁর বান্ধবী বাদী হয়ে রনি হকের নামে মামলা করবেন। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে’। তাঁদের ছদ্মনাম স্বর্ণা (১৮)  এবং শেফালি(২১) ।

জিজ্ঞাসাবাদে দুই তরুণী পুলিশের কাছে কি অভিযোগ করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই তরুণীরা আমাদের জানান যে তারা দুই বান্ধবী বাংলাদেশ বেতারের সামনে ফার্মগেটে যাওয়ার জন্য গাড়ির অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে রনি হকের গাড়ি এসে তাদের নামিয়ে দেয়ার কথা বলে তুলে নেয়। সেই সময় শেফালিকে শিশুমেলার কাছে নামিয়ে দিয়ে স্বর্ণাকে নিয়ে সামনের দিকে চলে যায়।

তাহলে এক্ষেত্রে মোহাম্মদপুর কলেজ গেটে যখন সাধারণ মানুষেরা রনিকে মারছিলেন তখন তরুণীর বান্ধবী শেফালি যাকে  শিশুমেলায় নামিয়ে দেয়া হয় তিনি এতো দ্রুত কিভাবে আসলেন যাকে আমরা ভিডিওতে স্বর্ণার পাশেই দেখতে পাই, সেই প্রশ্নের উত্তরে ওসি জানান, ‘আমাদের কাছে যেটুকু তথ্য আছে আমরা তা দিলাম। অনুমানের ভিত্তিতে কিছু বলা সম্ভব না। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে খুব শীঘ্রই জানতে পারবেন। শুধু এইখানেই শেষ না।

অপরদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এরা দুজনেই পেশাদার যৌনকর্মী। খামারবাড়ি থেকে ১২০০ টাকায় চুক্তিতে স্বর্ণাকে গাড়িতে উঠায় রনি। স্বর্ণা বোরকা পড়া অবস্থায় ছিলো। বোরকা খুলে যখন দেখে সে দেখতে কালো তখন গাড়ি থেকে নেমে যেতে বলে। তখন স্বর্ণা টাকা চায়। গাড়ি থেকে না নেমে ধস্তাধস্তি চলে তাদের মধ্যে।

এ বিষয়ের সত্যতা জানতে চাইলে ওসি গণেশ গোপাল বিশ্বাস বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘এরকম অনেক কথায় কানে আসে। কিন্তু আমরাতো আইনের লোক তাই প্রমাণ ছাড়া কিছু বলতে পারবো না। আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। আসল ঘটনা অবশ্যই সামনে আসবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ কর্মকর্তার তথ্যের ভিত্তিতে বিডিমর্নিং টিম খোঁজখবর নেয় স্বর্ণা ও শেফালি সম্পর্কে। সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত পেশাদার এক যৌনকর্মী জানান, ‘আমি এই দুজনকে চিনি। তাদের মধ্যে একজন নতুন এসেছে এই পেশায়। জিয়া উদ্যান ও খামারবাড়ি এলাকাতে সন্ধ্যার পরে আসলেই তাদের দেখা পাবেন’।

তবে ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে বিডিমর্নিং। অতি শীঘ্রই আসল ঘটনাটি খুব স্পষ্ট করে আপনাদের কাছে তুলে ধরা হবে।

কমেন্টস