কি এমন করেছিল ছেলেটা যাতে তার ছাত্রত্বই চলে গেল?

প্রকাশঃ জুন ৪, ২০১৮

সাদিয়া ইসলাম।।

ভার্সিটিতে প্রথম যে ছেলেটির সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার, একদিন আগে তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে। কখনও ভাবিনি এমন দিন দেখবো। ভার্সিটি জীবনের প্রথম কয়েকজন বন্ধুর মধ্যে সে একজন ছিল। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে তার ছাত্রত্ব বাতিলের পেছনে আমারও সামান্য ভূমিকা আছে। ভূমিকা আছে আরো কিছু মেয়ের। যে কয়জনের অভিযোগের ভিত্তিতে তার ছাত্রত্ব বাতিল হয়েছে সে তাদের সবারই খুব কাছের একজন ছিল। কারো বন্ধু, কারো বড় ভাই, কারো ছোট ভাই, কারো আবার পরিচিত কিন্তু বেশ ভালোই সম্পর্ক। প্রশ্ন জাগতেই পারে, কি এমন করেছিল ছেলেটা যাতে তার ছাত্রত্বই চলে গেল?

গত দুইমাসে ইনবক্সে নক দিয়ে অনেকেই জিজ্ঞাসা করে আসছিল, ছেলেটা তো ভালই ছিল। খেলা-ধুলা, এক্সট্রা ক্যারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ নিয়ে পরে থাকতো দেখতাম। কি এমন হলো যে তোমরা তার ছাত্রত্ব বাতিল চাইছো? কাউকে কখনও খোলাশা করে বলতে পারিনি। কারণ সে যা করেছে সেটা কাউকে বলার মতো না। আর বলবোই বা কার নামে? ভার্সিটিতে প্রথম যে ছেলেটাকে বন্ধু ভেবেছিলাম তার নামে?

ঘটনার শুরু মার্চের ১৯ তারিখে। ইয়ার ফাইনাল চলছে, পরেরদিন লেবার ল পরীক্ষা। শুনলাম, শিশির গ্রেফতার হয়েছে। ওর বর্ণনা আগে একটু দেই। তার পুরো নাম নাজমুল চৌধুরী শিশির, বাসা কুড়িগ্রামে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়তো। ক্রিকেট, ফুটবল, হ্যান্ডবলসহ একাধিক খেলায় পারদর্শী হওয়ায় ক্যাম্পাসের অনেকেরই একটি পরিচিত মুখ। যাই হোক, পরে জানলাম ডিপার্টমেন্টের এক ছোটবোনকে নাকি ফেসবুকে উত্যক্ত করেছে। আর সবার মতো আমিও ভেবেছিলাম, কিইবা এমন বলেছে যার জন্য পুলিশে দিতে হবে? ধীরে ধীরে জানলাম হয়রানির মাত্রা কতটা সীমা ছাড়িয়ে গেলে একটা মেয়ে পুলিশের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। মেয়েটাকে সে বিগত দুইটা কোর্সের পরীক্ষার আগ থেকে জ্বালাচ্ছিল। রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল করছিল আর অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। প্রস্তাবে রাজি না হলে যেসব হুমকি দিচ্ছিল তাতে যেকোনো মেয়েরই কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার কথা। মেয়েটা তাকে বারবার নিষেধ করেছিল এমনটা না করতে। কিন্তু সে তো তখন মানুষ ছিল না। থাকলে কি আর দিনের বেলা যাকে ‘বোন’ ডাকে, রাতেরবেলা ফেসবুকে তাকেই নিজের গোপনাঙ্গের দৈর্ঘ্য আর কামনা জানায়?

শুধু তাই নয়, ওর নগ্ন ছবি ও ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করা এবং ওর পরিবারের কাছে পাঠানোর হুমকি দিচ্ছিল বারবার। তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক তথ্য নিয়েও ব্ল্যাকমেইল করছিল। একে তো পরীক্ষা চলছে, এর মধ্যে মেয়েটার বাবা আবার হৃদরোগের পেশেন্ট। বাসায় জানাতেও পারছে না বিষয়টা। আর দশটা মেয়ে হলে যা করতো, ব্লক মেরে সেখানেই ঘটনাটা হয়তো শেষ করে দিতো। কিন্তু সে বুঝতে পেরেছিল এটা অবশ্যই তার কাছের কেউ করছিল। আর এভাবে তার জীবন যে নরক বানালো তাকে সে ছেড়ে দিতে চায়নি। পড়াশোনা শিকেয় তুলে এক বন্ধু আর বড়বোনের সাহায্য নিয়ে সে প্রথমে থানায় জিডি করলো। পরবর্তী ২দিন নাওয়া-খাওয়া, ঘুম সব বাদ দিয়ে ফেক আইডিটির পেছনে তারা যাকে আবিষ্কার করলো তার জন্য প্রস্তুত ছিলনা কেউই। আরে এ তো সেই শিশির যার সাথে দুইদিন আগেও মেয়েটি একসাথে গ্রুপ স্টাডি করেছে। আগেরদিন সন্ধ্যায়ও যাকে তার অরিজিনাল আইডি থেকে ম্যাসেজ দিয়েছে, “ভাল করে পরীক্ষা দিস বোন, ফী আমানিল্লাহ”। কেমন করে বিশ্বাস করবে সে এই বড় ভাইটির ভেতরে এত কিছু ছিল?

কিন্তু ভদ্র চেহারার এই ভাইটিকে পুলিশ ঐ আইডি থেকে ম্যাসেজ দেওয়া অবস্থায় হাতে-নাতে ধরলো। ধরা পরার পর কিন্তু বড় ভাইয়ের রূপ আবার বদলে গেল। কিছুক্ষণ আগেই যে ফেক আইডি থেকে ম্যাসেজ দিয়েছিল, “পারলে খুঁজে বের করো আমি কে! দেখি কি করতে পারো তুমি আমার” সে তখন পুরোই ভেজা বেড়াল। মেয়েটির বন্ধুর চড় থাপ্পড় খেয়ে ওর পায়ে পরে ক্ষমা চাইলো সে, বললো ‘না-বুঝেই’ এমনটা করেছে। সে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুবই ডিপ্রেশনে ভুগছিল। এসব করে একটু রিলিফ পেতে চেয়েছিল! আর তার বাবা খুবই অসুস্থ! এগুলো জানলে হার্ট অ্যাটাক করেই মারা যাবে। যদিও মেয়েটার অসুস্থ বাবার কথা সে ভাবেনি, ভাবেনি তার ইয়ার ফাইনাল চলছে! আর মেয়েটা গতবার ডিপার্টমেন্ট টপারদের মধ্যে একজন ছিল। অবাক করা ব্যাপার হলো, শিশিরেরও তখন ইয়ার ফাইনাল চলছিল। অসুস্থ বাবার কথা কি তখন ভেবেছিল সে? পরীক্ষায় ফেল করলে তার বাবা বুঝি হাত-পা ছড়িয়ে নাচতো? যাই হোক, এত কিছুর পরেও সবার অনুরোধের ভিত্তিতে মেয়েটা ওকে আরেকটা সুযোগ দেওয়ার জন্য শুধুমাত্র মুচলেকা নিয়েই ছেড়ে দিল। অন্তত যাতে পরেরদিন পরীক্ষাটা দিতে পারে। অথচ ঐ সময় যে পরিমাণ আলামত আর এভিডেন্স ছিল তাতে সে মামলা করলে ওর জরিমানাসহ কমপক্ষে ৭ বছরের কারাদন্ড হয়ে যেতো।

ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু শেষ যে পরীক্ষা তাকে দয়া করে দিতে দেওয়া হয়েছিল, সেদিন সে আবার তার আগের রূপ দেখালো। মেয়েটাকে দেখে আড়চোখে হাসছিল, বান্ধবীদের কাছে গল্প করে বেড়াচ্ছিল, “আমার তো *লটাও ছিঁড়তে পারেনি” “আরে সময়মতো ম্যাসেঞ্জার থেকে লগ আউট করলে আমাকে ধরতেই পারতো না”। আর মেয়েটাকে যারা সাহায্য করেছিল তাদেরকেও ব্যঙ্গ করছিল। এটা দেখা স্বাভাবিকভাবেই মেয়েটা আরো কোণঠাসা হয়ে পরেছিল। এরই মধ্যে আমাদের এক সহপাঠী ওর ফেক আইডির লিংক দিয়ে পোস্ট করলো যে এই আইডি থেকে কারো কাছে ম্যাসেজ গেছে কি না। এরপর কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হওয়ার মতো বের হলো আরো বিভৎস দৃশ্য। খোদ আইন বিভাগেরই ২০-২৫ জন মেয়েকে সে একই ভাষায় ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। ম্যাসেজের বিষয়বস্তু মোটামুটি একই, সেই মেয়ের শরীরের কোন কোন অঙ্গ দেখে দেখে তার কেমন অনুভূতি হয়, তাকে নিয়ে সে কি কামনা করে, সেটা সে কিভাবে কোথায় পরিপূর্ণ করবে, তার গোপনাঙ্গের দৈর্ঘ্য আর সেটা দিয়ে সে কিভাবে মেয়েটাকে সন্তুষ্ট করবে। আর হ্যাঁ, কিছু কিছু মেয়েকে সে হাজার দশেক টাকাও অফার করেছিল। কাউকে কাউকে পার্সোনাল লাইফের বিভিন্ন ইনফরমেশন নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। আর কমবেশি সবাইকেই একটা ফিশিং সাইটের লিংক পাঠিয়েছে আইডি হ্যাক করার উদ্দেশ্যে। আমরা সবাই তখন বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে। আমরা সবাই-ই ওর টার্গেট ছিলাম? জাস্ট others ফোল্ডারে ওর ম্যাসেজ সীন করিনি দেখি ভাগ্যজোরে বেঁচে গেছি?

হ্যাঁ, দুই তিনজন ম্যাসেজ দেখেছিল, কেউ কেউ রিপ্লাই দিয়েছিল। কিন্তু তার বিকারগ্রস্তের মতো কথাবার্তা দেখে শেষে বিরক্ত হয়ে ব্লক মেরে দিয়েছে। একমাত্র সেই মেয়েটা দিনের পর দিন প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করে ওর পেছনে লেগে ছিল বলে ফাইনালি তাকে খুঁজে বের করা গেছে। কোন মেয়ে যদি একবার সেই ফিশিং সাইটে ঢুকতো, যদি দূর্ভাগ্যক্রমে কারো আইডি সে হ্যাক করতে পারতো, কি ঘটতো সেই মেয়েটির সাথে? তার জীবন আরো কত বিষিয়ে তুলতো সে? আর আড়ালে থেকে না জানি কিভাবে হায়েনার মতো হাসতো! যে মেয়েটার কারণে ওরা ধরা সম্ভব হয়েছে, সে এক পর্যায়ে এটাও বলেছে, “আমি তো আর এসব সহ্য করতে পারছি না। আপনি প্লিজ আমাকে মুক্তি দিন। অন্যথায় আমি সুইসাইড করে ফেলবো” তখনও সে হাসতে হাসতে বলেছে, “আমার প্রস্তাবে রাজি হও, এসব কিচ্ছু করতে হবে না”। ঐ সময় মেয়েটার পাশে তার বন্ধু ও বড়বোনটি না থাকলে কি হতো এটা চিন্তাও করতে পারছি না। আমি হলে অন্তত এত চাপ সহ্য করতে পারতাম না।

ঘটনা এখানেই শেষ না। তার ফোন জব্দ করে সেখান থেকে জানা গেল ঐ আইডি থেকে সে শতাধিক মেয়েকে ম্যাসেজ দিয়েছে। আর কমবেশি সবাই-ই তার পরিচিত এবং কাছের মানুষজন। তার আসল আইডিতে ফ্রেন্ডলিস্টে আছে সবাই, ম্যাসেজে কমবেশি কথা বলে। এমনকি এক পেশাদার যৌনকর্মীর সাথেও সে দরাদরি করছিল! ভিক্টিমদের মধ্যে আইন বিভাগেরই ৪০ জনেরও বেশি, বাকিরা কেউ বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কেউ ঢাকার, কেউ সিলেটের। ব্যাচমেট, সিনিয়র, জুনিয়র কাউকে বাদ দেয়নি। তার যে বেস্ট ফ্রেন্ড শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো, তাকেও ছাড়েনি। মেয়েটা যখন জানলো এই কাজ ও করেছে, পুরো ট্রমাটাইজড হয়ে গেছিল। মজার ব্যাপার হলো ঐ আইডি থেকে যখন ওকে ডিস্টার্ব করা হচ্ছিল সে শিশিরের সাহায্যই চেয়েছিল সবার আগে!

এবার আমরা সবাই একত্র হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম একে ছেড়ে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। ও যেটা করেছে সেটা ভুল নয়, ক্রাইম। দিনের পর দিন প্ল্যান করে এতগুলো মেয়েকে এভাবে ফাঁদে ফেলানোর চেষ্টা করেছে। একজন রিপ্লাই দেওয়ায় দেখিয়ে দিয়েছে সে কতটা নিচে নামতে পারতো অন্যদের সাথেও। দুইজন থানায় মামলা করলো। কিন্তু নানাবিধ আইনী জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতার কথা ভেবে আর সর্বোপরি বাসা থেকে তুমুল প্রতিরোধের কারণে দুইটা মামলাই উইথড্র করা হলো বাধ্য হয়ে। এরপর আমরা গেলাম ডিপার্টমেন্টে, ভার্সিটি প্রশাসনে। আর কিছু না হোক, অন্তত ওর সাথে এক ক্লাসে বসা সম্ভব না, এক ডিপার্টমেন্ট এর বারান্দায় চলাচল করা সম্ভব না। আমাদের শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান স্যারসহ ছাত্র উপদেষ্টা ম্যাম, প্রো-ভিসি স্যার এবং ভিসি স্যারও আমাদের সর্বোচ্চ সাপোর্ট দিয়েছেন। প্রথম থেকেই যার কাছেই গিয়েছি, তিনিই আশ্বাস দিয়েছেন তাঁর জায়গা থেকে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এরকম মানসিক বিকারগ্রস্ত ও বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ছেলেকে ন্যূনতম শাস্তি দিতে।

তবে হ্যাঁ, ভিক্টিমরা সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ফেস করেছে নিজের পরিবার থেকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা এতজনের কেউই বাসায় মামলা করার ব্যাপারে রাজি করাতে পারিনি। এমনকি আমার বাসা থেকে এও বলে দিয়েছিল, এগুলা নিয়ে কারো কাছেই যাওয়ার দরকার নেই। যে ছেলে বিনা কারণে এত কিছু করতে পারে, তোমাদের কারণে তার কোন ক্ষতি হলে সে তো আরো বেপরোয়া হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা ওর শাস্তির পাশাপাশি অন্যদের সামনে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছিলাম। আমরা জানতাম, এরকম হাজার হাজার নাজমুল চৌধুরী শিশির এসব ‘মৃন্ময় আয়ান’ আইডির আড়ালে লুকিয়ে এভাবে হ্যারাজমেন্ট, বুলাইয়িং, ব্ল্যাকমেইল করে যাচ্ছে। একজনের শাস্তি হলে অন্তত আরো দশজন ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে। সমাজে আরো বিশটা মেয়ে আরেকটু স্বস্তিতে বাঁচতে পারবে। সেজন্যেই পরিবারকে না জানিয়ে, পরিবারের সহায়তা ছাড়াই যতদূর যাওয়া সম্ভব আমরা গিয়েছি।

এর মধ্যে আমরা শুনলাম শিশির রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে আর আমাদের ব্যাপারে তখনও উত্তপ্ত বাক্য ছড়িয়েই যাচ্ছে। তার মধ্যে দুই একটা বাণী শোনাই, “*দে দিয়ে আসিনি তাই এত লাফাচ্ছে মা*রা”, “*লের প্রশাসন, *লের ডিপার্টমেন্ট আমার *লটাও ছিড়তে পারবে না। একবার এইগুলা মিটে যাক, সব কয়টাকে দেখে নিব” বাকিগুলো মুখে আনার মতো না। ধন্যবাদ সবাইকে সেই সময় যারা ওকে সাহায্য করেননি নিজের বিবেকের কাছে বন্দী হয়ে। আর হ্যাঁ, অন্যদিকে কিন্তু সে ও তার পরিবার (বাবা, মা, বোন, দুলাভাই) ডিপার্টমেন্ট ও ভার্সিটি প্রশাসনের কাছে এসে ধরনা দিয়েই যাচ্ছে আর অনেক ভিক্টিমের সাথেই যোগাযোগ করে ইমোশনালভাবে ব্ল্যাকমেইল করে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা তার আসল রূপটা জানায় কনভিন্স হইনি কেউই। ধরা পরার পরেও যে ছেলের মুখের ভাষা এতটুকু পরিবর্তন হয়নি, সে পরিবর্তনের অযোগ্য। আমাদের সম্মানিত ভিসি স্যার বলেছিলেন, “এ তো একদম Rotten Product। যতদূর সে গিয়েছে, একে এই রাস্তা থেকে ফিরিয়ে আনাও সম্ভব নয়।”

সবচেয়ে ভাল লাগার বিষয় হলো পুরো ঘটনাতে আমরা সবার এত বেশি সাহায্য আর সাপোর্ট পেয়েছি যে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করতে পারবো না। বিভাগের প্রতিটি শিক্ষক, বড় ভাই-বোন, প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ সবাই সহমর্মিতা জানিয়ে বলেছিল তারাও এরকম অপরাধীর শাস্তি চান। তবে অন্যান্য সবার পাশাপাশি আমাদের বিভাগের আব্দুল আলীম স্যার, চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান স্যার আর সদ্য সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা ম্যামের কথা না বললেই না। এই ৩টা মানুষ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাশে ছিল। অন্য কোন হয়রানির ক্ষেত্রে ভিক্টিমরা এত মানসিক সাপোর্ট বা সহানুভূতি পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। পেলে আজ অন্য এক দেশে বাস করতাম আমরা।

ঘটনার সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্র উপদেষ্টা ম্যাম ছিলেন, যিনি আবার এই ঘটনার তদন্ত কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন, সম্প্রতি শরীয়তপুরের ZH শিকদার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন। ম্যামের সাথে যখন বিদায়ী সাক্ষাৎ করতে গেলাম, তিনি বারবার এক কথাই বলছিলেন, “তোমরা পরিবার থেকে এত বাধা পাওয়ার পরেও এতদূর এসেছে এজন্যে আমি খুবই খুশি হয়েছি। আমি তোমাদের জন্য গর্ববোধ করি। অনেক মেয়েই তো ভয়ে মুখ খোলেনা। এজন্যে এইসব ক্রিমিনালরা পার পেয়ে যায়” আমি বলেছিলাম, “আমরা এতজন বিধায় সাহসটা পেয়েছি। একা একটা মেয়ের জন্য এই লড়াই অনেক কঠিন ম্যাম।” তিনি বলেছিলেন, “এজন্যেই তোমাদের থামা চলবে না। এসব দেখামাত্র প্রতিরোধ করবে। শুধু নিজের জন্য না, আরো দশটা মেয়ের জন্য।” উভয় পক্ষের মৌখিক ও লিখিত বক্তব্য জমা নিয়ে, থানাউয় জব্দ করা অন্যান্য প্রমাণ যাচাই সাপেক্ষে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ম্যাম যাওয়ার আগেই জমা দিয়েছিলেন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কমিটির মিটিংয়ে ওর ছাত্রত্ব বাতিলের সুপারিশ হয়।

শিশিরের এই পরিণতি শুধু ওর জন্যেই না, বরং আশে পাশে ভাল মানুষের মুখোশ পরে থাকা আরো হাজার হাজার অপরাধীর জন্যে একটাই বার্তা দেয়, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। আর চোরের দশ দিন তো সাধুর একদিনই যথেষ্ট। ফেক আইডির আড়াল থেকে যতই হম্বিতম্বি করুন, ভিক্টিম একটু সাহসী হলে আপনার চৌদ্দ গোষ্ঠী মিলে দৌড়িয়েও কুল পাবেন না। কাজেই সময় থাকতেই সাবধান হোন। ফেসবুকে কাউকে ম্যাসেজ দেওয়া অন্যায় নয়। তবে শোভনীয় হওয়া জরুরী এর কথাগুলো। কাউকে একটা প্রস্তাব দেওয়ার আগে এটুকু ভাবুন তার সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন। আর ‘না’ বললে সেখানেই থেমে যান। না মানে না। জেদ করে তাকে হ্যাঁ করানোর চেষ্টা করবেন না কখনই। অসুস্থ মজা নেওয়ার আগে একবার ভাববেন এটা বুমেরাং হয়ে আপনার দিকেই ফিরে আসতে পারে। কিছু সময়ের মজা সারাজীবনের কান্নার কারণ হতে পারে।

এতগুলো ভিক্টিমের মধ্যে সাহস করে যে ১৫জন এগিয়ে এসেছিল, পাশে থেকে যে ২ জন সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল (নিরাপত্তার কারণে কারো নামই বলছি না) সবাইকে জানাই অভিনন্দন। বাংলার প্রতিটা মেয়েই তোমাদের মতো বাঘিনী হোক।

পুনশ্চঃ এই খবর ছড়িয়ে পরার পর থেকে এক শ্রেণিকে দেখছি শিশিরের পক্ষ নিয়ে গলা ফাটাতে। কারণ প্রত্যেকটি অনলাইন পোর্টালের হেডলাইন ছিল এরকম ‘ফেসবুকে উত্যক্ত করায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হলো….”। সবার কমেন্টগুলো ছিল এরকম- “ফেসবুকে ম্যাসেজ দেওয়ার কারণে ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে?” “মানুষ আরো কত বড় অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে…..ব্লা…ব্লা…ব্লা….” “এ তো লঘু পাপে গুরুদন্ড হয়ে গেল” এবং অ্যাজ ইউজুয়াল ” মেয়েগুলা কি সব সাধু ছিল?”

কারো কাছে ক্ল্যারিফাই করার কিছু নেই আমাদের। হাসি পেল এটা দেখে যে অনেকে বলছে, হয়তো ছেলেটা মেয়েগুলোকে ভালবাসতো! প্রপোজ করা তো দোষের না! মানে সিরিয়াসলি! এত্তগুলো মেয়েকে একসাথে ভালবেসেছে ফেলেছে? আর ভালবাসলে কেউ প্রথমেই এত নোংরা ভাষায় এরকম জঘন্য ‘প্রপোজ’ করে জানা ছিল না। সে যা করেছে এটা যৌন হয়রানি ছাড়া অন্য কোন ক্যাটাগরিতে পরেই না। এতগুলো মেয়ে একজোট হয়ে একজনের শাস্তির দাবীতে এমনি এমনি নামেনি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করে দিলে তার জরিমানাসহ কমপক্ষে ৭বছরের জেল হতো, এরপরেও কি কারো মনে হয় শাস্তি বেশি হয়ে গেছে? মেয়েগুলো আসলেই খারাপ। এত সাক্ষ্য প্রমাণ থাকার পরেও তাকে আদালতের চৌকাঠ দেখালো না। আর দশজনের বিচার হচ্ছে না বলে কোন বিচারই হবে না দেশে? এ কেমন যুক্তি! নিজের রুচিবোধের কারণে তার কোন ম্যাসেজের স্ক্রিনশট দিতে পারছি না। নাহলে যারা তাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে ডিফেন্ড করে এসেছেন তাদের মুখের উপর একটা ভাল জবাব দেওয়া যেতো। যদিও এদের আদৌ কখনও শরম হতো কিনা আমি জানি না। তখন হয়তো এরা কমেন্ট করতো, রেপ তো আর করেনি..

কমেন্টস